কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করলে অবিচারই করা হবে যে, আমার বন্ধু অগাস্টাসের জীবন রক্ষার ব্যাপারে ডার্ক পিটার্সের কোনো অবদানই নেই। বরং সত্য গোপন না করলে বলতেই হয়, তারই জন্য আমার বন্ধু নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেছে। এ-কথা আমৃত্যু আমার স্মৃতির পাতায় গাঁথা হয়ে থাকতে বাধ্য।
আর একটি কথা, ডার্ক পিটার্স প্রায়ই অগাস্টাসকে নিজের কেরানী বলে সম্বোধন করে রসিকতা করে। যে কোনো কারণই থাক না কেন, দীর্ঘ কথা কাটাকাটি ও ঝগড়াঝাটির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আমার বন্ধুটি ছাড়া বাকি সব কয়জন বন্দিকেই সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। আর তা করা হবে তিমি শিকারের ক্ষুদ্রতম নৌকাটায় চাপিয়ে। তারা উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুকে ভাসতে ভাসতে যেদিকে যায়। যাক। যদি হিংস্র জলজ প্রাণীর পেটে আশ্রয় নেয় নিক গে।
ক্যাপ্টেন বার্নাড এখন জীবিত আছেন, নাকি ইতিমধ্যেই পরপারের যাত্রী হয়েছেন তা দেখার জন্য প্রথম মেট সিঁড়ি-বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেলেন।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই ক্যাপ্টেন ও প্রথম মেট উভয়েই ধীরপায়ে ওপরের উঠে এলেন। ক্যাপ্টেনের মুখ চকের মতো সাদা, ফ্যাকাশে বিবর্ণ। তবে আঘাতে তার মুখে যে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছিল তা এখন অনেকাংশে মিলিয়ে গেছে।
ক্যাপ্টেন কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে একটু দম নিয়ে বিদ্রোহী নাবিকদের কাছে করজোড়ে কাঁপাকাপা গলায় জানালেন, তাকে যেন সমুদ্রে নিক্ষেপ করে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেয়। আর তাদের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তারা যেখানেই তাদের নামিয়ে দিতে বলবে তিনি সেখানেই জাহাজ ভেড়াবেন। সব শেষে এ প্রতিশ্রুতিও দিতে ভুললেন না, তাদের এ কাজের জন্য আইন-আদালতের শরণাপন্ন হবেন না।
কিন্তু হিংস্র পশু প্রবৃত্তির মানুষগুলোর কাছে তার কাতর মিনতি ও প্রতিশ্রুতি কোনো মূল্যই পেল না। তারা ক্রোধান্মত্ত নেকড়ের মতো ক্যাপ্টেনকে জাপ্টে ধরল। তীব্র আক্রোশে তাকে উত্তাল সমুদ্রের বুকে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
ক্যাপ্টেনের নিকেশ করার পর উন্মাদপ্রায় বিদ্রোহীরা এবার বাকি চার বন্দির দিকে নজর দিল। তাদের হাত পায়ের বাধন আলগা করে দেওয়া হল। এবার একজন। শয়তানের মতো খেঁকিয়ে নির্দেশ দিল-সবাই ঝটপট নিচে নেমে যাও।
কোনোরকম ফোঁ-ফাঁ না করে মুখে কলুপ এঁটে বিদ্রোহীদের পিছন পিছন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
তারা সবাই নৌকায় উঠল। এক পাত্র পানি আর কিছু বিস্কুট তাদের নৌকায় দিয়ে দেওয়া হল। কম্পাস, মাস্তুল, পাল বা বৈঠা কিছুই দেওয়া হলো না।
নৌকার বাঁধন কেটে সেটাকে উত্তাল-উদ্দাম অকূল সমুদ্রে নামিয়ে দেওয়া হল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার রাত নেমে এলো সমুদ্রের বুকে। চাঁদ বা তারা কিছুই নেই। যেদিকে তাকানো যায় চারদিক ঢেকে রেখেছে কেবলই অন্ধকার–ঘুটঘুঁটে অন্ধকার।
দেখতে দেখতে ছোট্ট নৌকাটা চোখের আড়ালে, অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল। নৌকারোহীদের বেঁচে থাকার তিলমাত্র আশাও নেই।
অবিশ্বাস্য, ঘটনাটা ঘটেছিল ৩৫.৩০০ উত্তর আর ৬১.২০০ দক্ষিণ অক্ষাংশে! হিসাব মতো দেখাচ্ছে উল্লিখিত স্থানটা বারমুডা দ্বীপপুঞ্জের অদূরে অবস্থিত। তাই অগাস্টাসের মনে দৃঢ় বিশ্বাস, ছোট্ট হলেও নৌকাটা হয়তো কোনো-না-কোনো সময় মাটি স্পর্শ করতে পারবে। তা যদি নাও হয় তবে উপকূলের নিকটবর্তী কোনো জাহাজের নাবিকদের নজরে পড়বে। অতএব আশা ক্ষীণ হলেও তাদের জীবন রক্ষা পাওয়া একেবারে অসম্ভব নয়।
তিমি শিকারের ছোট্ট নৌকাটা চোখের আড়ালে চলে গেলে জাহাজটাকে দক্ষিণ পশ্চিমদিকে চালিয়ে দেওয়া হল।
অগাস্টাসের কি ব্যবস্থা করা হবে তা নিয়ে জাহাজের কারো মাথা ব্যথা নেই।
এক সময় অগাস্টাসের হাত-পায়ের বাধন কেটে দিয়ে তাকে জাহাজের ভেতর যথেচ্ছভাবে ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা করে দেওয়া হল। এত অঘটনের মধ্যেও তার মন থেকে কিন্তু আমার কথা মুছে যায়নি।
অগাস্টাস জাহাজের সবার নজর এড়িয়ে আমার সঙ্গে মিলিত হবার মওকা খুঁজতে লাগল। সর্বক্ষণ তার একটা মাত্রই ধান্দা, কোন ফন্দি-ফিকিরে আমার সঙ্গে মিলিত হবে।
নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্যে আর দুদুটো দিন আর দুটো রাত কেটে গেল।
শেষপর্যন্ত এলো তৃতীয় দিনের রাত। পূর্ব দিক থেকে প্রলয়ংকর বাতাস ধেয়ে আসতে লাগল। জাহাজের ক্যাপ্টেন আর প্রতিটা নাবিকের মধ্যে দারুণ ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। সবাই পড়ি কি মরি করে পালের দড়ির কাছে ছুটে গিয়ে তাতে হাত লাগাল।
অগাস্টাস বুঝল এমন মওকা আর পাওয়া যাবে না। সে সবার চোখের আড়ালে লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে তাদের ঘরে ঢুকে গেল। অত্যাবশ্যক জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সেখানে দড়িদাঁড়া আর ইয়া মোটাসোটা শেকল দিয়ে ঘরটা বোঝাই করা হয়েছে বুঝতে পারল, এসব টানাটানি করে সময় কাটালে নাবিকদের হাতে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
উপায়ান্তর না দেখে নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অগাস্টাস যেমন দ্রুত এসেছিল তার চেয়ে অনেক দ্রুত পায়ে কামরাটা ছেড়ে বেরিয়ে এলো।
কয়েকপা এগিয়ে যেতে না যেতেই অগাস্টাসকে আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। মেট দুম করে তার গলা টিপে ধরে ক্রোধান্মত্ত বাঘের মতো গর্জে উঠল–‘কী ব্যাপার? এতক্ষণ কেবিনে কী করছিলি, সত্যি করে বল?’।
