আমার অসহায় অবস্থাটা ডাক্তার টেম্পলটনের নজর এড়াল না। তিনি আমার বিস্ময় মাখানো মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই মুচকি হেসে বললেন–ভালোভাবে লক্ষ্য করুন, দেখতে পাবেন, প্রতিকৃতিটার এক কোণে অস্পষ্ট হলেও লেখাটা বোঝা যাচ্ছে, সময়টা উল্লেখ করা হয়েছে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ।
আমি তার কথা মতো প্রতিকৃতিটার বিশেষ কোণটার ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম।
ডাক্তার টেম্পলটন বলে চলল–‘হ্যাঁ, প্রতিকৃতিটা সে বছরই আঁকা হয়েছিল। আমার এক পরলোকগত বন্ধুর প্রতিকৃতি।
‘আপনার মৃত বন্ধুর প্রতিকৃতি?
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। মি. ওন্ডের নামে এক বন্ধু।
‘মি. ওন্ডের?’
‘হ্যাঁ। তাঁর সঙ্গে আমার হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কলকাতায়। তখন ওয়ারেন হেস্টিংস ছিলেন সেখানকার শাসক। আমি তখন যুবক। বয়স মাত্র ত্রিশ বছর।
‘সে বহুদিনের কথা ভাই।
‘সে তো নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, যে কথা বলতে চাইছি–মি. বেডলো; আপনার সঙ্গে তো আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল সারাটোগাতে, তাই না?
‘হ্যাঁ। আপনাকে প্রথমবার দেখেই প্রতিকৃতিটা আর আপনার সঙ্গে অলৌকিক সাদৃশ্য লক্ষ্য করেই আমি আপনার ব্যাপারে উৎসাহি হয়ে পড়ি। আমিই এগিয়ে গিয়ে গায়ে পড়ে আপনার সঙ্গে পরিচয় করেছিলাম, মনে পড়ছে?
‘অবশ্যই। অবশ্যই।
প্রথম আলাপ পরিচয়ের মুহূর্তেই আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের প্রস্তাব দেই।
মি. বেডলো নীরবে মুচকি হাসলেন।
ডা. টেম্পলটন বলে চললেন–‘আমি তখন এমন সব ব্যবস্থা করলাম যাতে আমি আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গি হয়ে উঠতে পারি–অভিন্ন হৃদয় বন্ধু যাকে বলে। কিন্তু কেন আমি আপনার ব্যাপারে এতখানি উৎসাহি হয়ে পড়ি, হয়তো আপনি মনে মনে ভেবেও ছিলেন, ঠিক কি না?
মি. বেডলোর দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ডাক্তার টেম্পলটনই আবার মুখ খুললেন, ব্যাপারটা আরও খোলসা করে দেবার জন্য বলতে শুরু করলেন–‘দেখুন মি. বেডলো, আমার এ কাজটার পিছনে দুটো উদ্দেশ্য, মানে কারণ ছিল–প্রথমত মৃত ব্যক্তির অনুশোচনাবিহীন স্মৃতি, আর দ্বিতীয়ত আপনার সম্পর্কে অস্বস্তিকর ও অল্প বিস্তর ভীতিপ্রদ কৌতূহলের শিকার হয়ে পড়া।
আপনি পর্বতের ভিতরে প্রবেশ করে শহরের যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা-কিছু চাক্ষুষ করেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ আমাদের কাছে ব্যক্ত করেছেন। আপনার বর্ণনায় যে পবিত্র নদীর উল্লেখ করেছেন, তা ভারতীয় নদী গঙ্গা ছাড়া কিছুই নয়। আর নদী তীরবর্তী যে শহরের উল্লেখ করেছেন তা নদী তীরবর্তী বেনারস শহরেরই অবিকল বর্ণনা, কার্বন কপি মনে করা যেতে পারে।
আপনি যে দাঙ্গা হাঙ্গামার উল্লেখ করেছেন সেই দাঙ্গা, সেই লড়াই আর সেই হত্যালীলা সত্যি সত্যি সংঘটিত হয়েছিল চৈৎসিংহের বিদ্রোহের সময়–১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে। যখন ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রাণ পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। তখনকার ঘটনা।
আপনি বর্ণনার মধ্যে পাগড়ির দড়ি বেয়ে একজনের নেমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন, ঠিক কি না? যিনি এভাবে পালিয়ে গিয়ে ছিলেন তিনি আসলে কে, বলুন তো? তিনি চৈৎসিং নিজে।
আর চালাঘরে যাদের আশ্রয় নেবার কথা বলেছিলেন, তারা আসলে হেস্টিংসের অধীনস্ত একদল সিপাহী আর এক ইংরেজ অফিসার। আমি নিজের যে দলে ছিলাম, তাদের হয়ে লড়াই করেছিলাম। আর বিষমাখা তীরটার কথা বলেছিলেন না? সে কোনো এক বাঙালি নিক্ষেপ করেছিল। তার আঘাতে সে অফিসারটি মারা গিয়েছিল তাকে ওই ভয়ঙ্কর অভিযান থেকে বিরত করার জন্য আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। কিন্তু ফয়দা কিছুই হলো না। সে অফিসারটি ছিলেন আর কেউ নয়, আমার এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। ওন্ডেব তার নাম।
ডাক্তার টেম্পলটন কথা বলতে বলতে একটা নোটবই আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। তার কয়েকটি পৃষ্ঠা সদ্য লেখা হয়েছে বলেই মনে হল। নোটবইটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি এবার বললেন–এ পাণ্ডুলিপিটা পড়ে দেখুন, তবেই বুঝতে অসুবিধা হবে না–পাহাড়ের ভেতর থেকে আপনি কল্পনার মাধ্যমে যে সময়ের এসব দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলেন, ঠিক সে সময়ে আমি আমার নিজের বাড়ির পড়ার ঘরে বসে সে বিবরণটা লিখতে ব্যস্ত ছিলাম। কেবল ব্যস্ত বললে ঠিক বলা হবে না, লেখার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিলাম।
এ আলোচনার প্রায় সপ্তাহখানেক বাদে নিচে বর্ণিত বিবরণটা চালোটিসভিল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। বিবরণটি হুবহু নিচে উল্লেখ করলাম।
বড়ই দুঃখের সঙ্গে আমরা মি. অগাস্টাস বেডলোর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করছি। খোলামেলা মনের মানুষটি মিষ্টি মধুর ব্যবহার এবং বহুরকম গুণের জন্য বহুদিন পর্যন্ত চার্লোটেসংভিল অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে বড়ই প্রয়োজন হিসেবে গণ্য ছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি, নাগরিকদের কাছে তিনি ছিলেন চোখের মণি।
মি. বি গত বছর কয়েক ধরে স্নায়রোগে ভুগছিলেন। কষ্টও পাচ্ছিলেন খুবই। আর প্রায়ই আশঙ্কা হত সে এ রোগেই তাঁর ভবলীলা সাঙ্গ হবে। ক্রমে এ ধারণাটা তাঁর কাছে প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে পড়তে লাগল। তবে একটা তার মৃত্যুর পরোক্ষ কারণ হলেও প্রত্যক্ষ কারণটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
দিন কয়েক আগে। বন্ধুর পর্বতশ্রেণিতে অভিযান চালাতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সর্দি-জ্বরের কবলে পড়ে যান। পরিস্থিতি ক্রমে সঙ্গীণ হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই তার মস্তিষ্কে প্রচুর পরিমাণে রক্ত-সঞ্চালিত হয়ে পড়ে।
