প্রথম মেট গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন–নিচে যারা রয়েছ তাদের কানে কি আমার কথা যাচ্ছে। কোনোরকম হট্টগোল না করে সবাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওপরে উঠে এসো।
কয়েক মুহূর্ত কারো দেখা মিলল না। এক সময় এক ইংরেজ পা টিপে টিপে সতর্কতার সঙ্গে ওপরে উঠে এলো।
হতভাগা ইংরেজটা সবে জাহাজে পা দিয়েছে। কাতর স্বরে কান্নাকাটি করে সে বার বার প্রাণভিক্ষা চাইতে লাগল।
কাতর প্রার্থনার জবাবে কপালের ওপর কুড়ালের ওপর কুড়ালের এক কোপ পেল। বেচারা একটা কথাও বলার সুযোগ পেল না। তার রক্তাপুত দেহটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। ক্ষতস্থানটা থেকে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল।
আলকাতরার মতো কালোনিগ্রো পাচকটা ইয়া গাট্টাগোট্টা নিগ্রোটা রক্তাপ্লুত ইংরেজটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
কুড়ালের আঘাতের রক্ত এবং মৃতদেহটা সমুদ্রে আছড়ে পড়ার শব্দটা শোনামাত্র অন্যান্য যারা নিচে অবস্থান করছে তার সক্রোধে সমস্বরে গর্জে উঠল।
তারা কোনোরকম ফো-ফা করার আগেই বাজখাই গলায় সতর্ক করে দেওয়া হল–‘যারা শীঘ্র ওপরে উঠে না আসবে তাদের তোপ মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে।
কথাটা কানে যেতেই সবাই প্রাণের মায়ায় পড়ি কি মরি করে সিঁড়ি-বেয়ে ওপরে উঠে এলো।
সে মুহূর্তে অন্তত মনে হলো জাহাজটা বুঝি অচিরেই বিদ্রোহীদের কজা থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু এ ধারণা মুহূর্তে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়ে গেল। মাত্র ছয়জন হুড়মুড় করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠামাত্ৰ ওপর থেকে সিঁড়ির দরজাটা দুম্ করে বন্ধ হয়ে গেল।
নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই সে ছয়জন আত্মসমর্পন করল।
অন্য যারা নিচে ছিল তারাও মেটের ডাকাডাকির কথা ভুলে গিয়ে ওপরে উঠে এলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই সবাই বেয়নেটের ঘায়ে রক্তাপুত অবস্থায় আবার নিচে পড়ে যেতে বাধ্য হল।
আগেই যে ছয়জন হুড়মুড় করে ওপরে উঠে এসেছিল তাদেরও বেয়নেট বুকে নিয়ে দুমদুম নিচেই পড়ে যেতে হল।
যে সব নাবিক বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলায়নি, বিদ্রোহ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল তারা সংখ্যায় সাতাশজন। বিদ্রোহীরা তাদের কিছুতেই কজায় আনতে পারেনি।
এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল। দেখতে দেখতে নৃশংস হত্যালীলা শুরু হয়ে গেল। নিগ্রো পাচকটা পিঠমোড়া করে বাঁধা নাবিকগুলোর মাথায় কুড়াল দিয়ে একটা করে ঘা মারতে লাগল আর বাকিরা রক্তাপ্লুত দেহগুলোর ঠ্যাং ধরে সজোরে ছুঁড়ে সমুদ্রে ফেলতে লাগল।
একের পর এক লোক ঘায়েল করতে করতে বাইশজনকে কমানো হল।
এবার আমার বন্ধু অগাস্টাসকে পরপারে পাঠাতে বাকি। কিন্তু তার প্রতি বিদ্রোহীদের কেমন যেন একটু উদাসীনই দেখলাম। এমনও হতে পারে, তার দশা খুবই খারাপ, মৃতপ্রায় জ্ঞান করে বা দীর্ঘসময় নৃশংস হত্যালীলা চালিয়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নাবিকরা তাদের অমানবিক কাজ থেকে ক্ষান্ত হয়েছে।
যা-ই হোক, অগাস্টাসসহ চারজন নাবিক ভাগ্যগুণে তখনকার মতো প্রাণে বেঁচে গেল।
প্রথম মেট, এবার শুকিয়ে-আসা গলাটাকে ভিজিয়ে নেওয়ার জন্য সিঁড়ি-বেয়ে নিচে নেমে গেল। আর ঘাতক-বিদ্রোহীর দল লাফালাফি দাপাদাপিতে দিনের বাকি সময়টুকু মেতে রইল।
দিনের শেষে তাদের মধ্যে জল্পনা কল্পনা আর শেষমেশ জোর তর্কবিতর্ক শুরু করে দিল। বাকি পাঁচ বন্দির গতি কি করা হবে।
এখন গলা পর্যন্ত মদ গেলায়, মদের মধ্যে জনাকয়েকের প্রভাবে তাদের মন একটু-আধটু দুর্বল হয়ে গেল। তারা টেবিল চাপড়ে প্রস্তাব করল, বন্দিরাই বিদ্রোহে। অংশগ্রহণ করে লুটের মালের বখরা দাবি করবেন–এ শর্তে তাদের খালাস করে দেওয়া হোক।
গাট্টাগোট্টা কালোনিগ্রো পাচকটা মহানচ্ছার! যাকে বলে একেবারে শয়তানের শিরোমণি। আর দলের ওপর তার জোর মেটের চেয়ে কোনো অংশে কম তো নয়ই, বরং বেশিও মনে করলেও ভুল করা হবে না। শয়তানটা গলা ছেড়ে গর্জে উঠল–‘না’, কিছুতেই না, ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং যত শীঘ্র সম্ভব বাকিগুলোকেওনিকেশ করে দেওয়া হোক।
ভাগ্য ভালো যে, মদের নেশায় শয়তানটাও ঝুঁদ হয়ে রয়েছে। একমাত্র এজন্যই প্রথম দলের ইচ্ছাই কার্যকরী হল।
জাহাজের যুবক লাইন-ম্যানেজারও তাদের দলভুক্ত। ডার্ক পিটার্স তার নাম। সে আপসারোকা উপজাতিরনিগ্রো। মিসৌরী নদীর উৎসস্থল কৃষ্ণ পর্বতমালার গায়ে তাদের বসতি। তার বাবা নাকি পশুলোমের কারবার বা লিধস নদীর তীরবর্তী কোনো এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারবারে লিপ্ত।
আমার মতে জীবনে যে সব হিংস্র প্রকৃতির মানুষকে দেখেছি তাদের মধ্যে ডার্ক পিটার্সের তুল্য আর কাউকেই চোখে পড়েনি। ছোটখাট মানুষটার পাগুলো হারকিউলিসের মতো দৃঢ় ও শক্তিসম্পন্ন। কিন্তু একেবারেই অদ্ভুত। এমনভাবে বেঁকে গেছে যে শত চেষ্টা করে কিছুতেই সোজা করাই সম্ভব নয়। আর মাথাটা অস্বাভাবিক বড়। অধিকাংশ নিগ্রোর মাথার কেন্দ্রস্থলে যেমন একটা করে গর্ত থাকে তার মাথায়ও ঠিক সেরকমই একটা গর্ত লক্ষ্য করা যায়। তার ওপর মাথায় এত বড় টাক সে হন্যে হয়ে খুঁজলেও একটা চুল পাওয়া যাবে না। হয় ভালুকের, না হয় স্প্যানিশ কুকুরের লোমের একটা পরচুলা দিয়ে সব সময় ইয়া বড় টাকটাকে ঢেকে রাখে। এতে তার চোখ মুখের হিংস্রতা যেন অনেকাংশে বেড়ে যায়। আর অস্বাভাবিক লম্বা, মুখে মূলার মতো লম্বা দাঁতগুলো কিছুতেই ঠোঁট দিয়ে ঢেকেঢুকে রাখতে পারে না। ফলে সর্বদাই মনে হয় তার মুখে বিকট হাসি লেগেই রয়েছে। তবে এও সত্য যে, একে যদি হাসি আখ্যা দিতেই হয় তবে দৈত্যদানবের হাসি ছাড়া আর কিছুই ভাবা যাবে না।
