আশা! আমার ভেতর থেকে হতাশার জমাটবাঁধা মেঘ কেটে যাওয়ায় অতর্কিতে তার স্থান দখল করে বসল আশা, আকাঙ্খ। আমি হৃত কণ্ঠস্বর ফিরে পেলাম। তা ছাড়া জাহাজের আর কারো পক্ষে তো আমার উপস্থিতি জেনে ফেলা সম্ভব হলেও নামটা তো কিছুতেই জানা সম্ভব নয়। তা ছাড়া যেদিন আমি জাহাজটায় প্রথম পা দিয়েছিলাম সেদিন তো অগাস্টাস ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির চিহ্নই নজরে পড়েনি। তাই সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হলাম, অগাস্টাসই আমার নাম ধরে ডাকছে।
আমি বাশক্তি ফিরে পেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় হলেও সাধ্যমত গলা চড়িয়ে সাড়া দিলাম–‘অগাস্টাস’! অগাস্টাস!
বিপরীত দিক থেকে চাপা গলায় জবাব এলো–‘চুপ! চুপ! ঈশ্বরের দোহাই! চুপ কর। আমি এখনই যাচ্ছি।
আমি তার কথামত চুপ করে গেলাম।
পর মুহূর্তেই তার পায়ের শব্দ আমার কানে এলো। আমি ঘাড় ঘোরাতে না ঘোরাতেই তার একটা হাত আলতো করে আমার কাঁধের ওপর পড়ল।
আমি কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই একটা পানির বোতল সে আমার ঠোঁটে ধরল। কী যে পরম তৃপ্তিতে পানিটুকু পান করলাম তা আমার মতো কবরের অন্ধকার গহ্বর ছেড়ে তার জীবনের আলোর জগতে যে উঠে এসেছে সে ছাড়া কারোরই বোঝার কথা নয়। আঃ! পানিটুকু কী যে তৃপ্তিদান করল তা কি করে বুঝিয়ে বলব, ভেবে পাচ্ছি না।
আমি যেন নতুন করে জীবনের স্বাদ উপলব্ধি করলাম। মরুভূমির তৃষ্ণা মুহূর্তের মধ্যেই মিটে গেল। আমার ঠোঁট থেকে পানির বোতলটা সরিয়ে নিয়ে অগাস্টাস তিন চারটি ঠাণ্ডা আলু এক এক করে আমার মুখে গুঁজে দিল। হাজার বছরের বুভুক্ষার মতো। আমি আলুগুলো উদরস্থ করলাম।
আমি যেন এবার ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম। এবার বাস্তব জগৎ সম্বন্ধে ভাববার মতো মানসিকতা ফিরে পেলাম। তাকে বললাম–‘অগাস্টাস, তুমি এতদিন কোথায় বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিলে, বল তো?
সে কেবল নীরবে ম্লান হাসল।
আমি ছাড়বার পাত্র নই। আবার কথাটা পাড়লাম–‘তোমার দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণ কি সবকিছু খোলসা করে বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত কর।’
সে এবার এক এক করে বলতে লাগল, আমার বিপদের দিনগুলোতে জাহাজে কি কি ঘটেছে। কোনোকিছু গোপন না করে সবকিছু সবিস্তারেই আমার কাছে ব্যক্ত করল।
.
০৪. ॥ চতুর্থ অধ্যায় ॥
অগাস্টাস আমাকে সঙ্গে নিয়ে একটা নির্জন-নিরালা অথচ আলো-বাতাসযুক্ত স্থানে গেল। আমাকে তার মুখোমুখি বসাল। আমি ফুসফুস ভরে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করলাম।
অগাস্টাস আমার কৌতূহলনিবৃত্ত করতে গিয়ে বলতে লাগল–নির্ধারিত দিনে ও সময়েই দুই মাস্তুলের জাহাজটা বন্দর ছাড়ার ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যেই সমুদ্রে পড়ল। আমার প্রিয় পাঠকদের স্মরণ থাকার কথা অন্ধকার খুপরিটার ভেতরে আমি তিনদিন তিনরাত বন্দি ছিলাম।
তখন জাহাজের কর্মীরা এত ছুটোছুটি আর হৈ হট্টগোল করছিল যার ফলে অগাস্টাস আমার সঙ্গে দেখা করার ঝুঁকি নেয়নি। পাছে আমার উপস্থিতির কথা তারা জেনে ফেলে, সে জন্যই সে নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমার সংস্রব এড়িয়ে চলেছে।
একইরকমভাবে আর দুতিনটি দিন কাটার পর অগাস্টাস আমার সঙ্গে দেখা করতে উৎসাহি হল। সবার নজর এড়িয়ে, চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সে আমার সঙ্গে মিলিত হবার জন্য গুটিগুটি নিচে নেমে এলো।
বন্ধু যখন আমার কুঠুরির দরজায় আসে আমি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। সে গলা নামিয়ে আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করল।
আমার দিক থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে অগাস্টাস কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। গলা ছেড়ে ডাকাডাকিও করতে ভরসা পাচ্ছে না, কেউ শুনে ফেলতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় অদর্শনে ক্যাপ্টেন বার্নাড খোঁজাখুঁজি করতে পারেন।
এমন সময় আচমকা কেবিনের দিক থেকে অস্বাভাবিক গোলমাল ভেসে এলো। সে একলাফে খুপরিটা থেকে বেরিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে নিজের ঘরের দরজায় হাজির হল। এক ধাক্কায় দরজাটা খুলে ফেলতেই হঠাৎ একটা পিস্তল ঝলমল করে উঠল। ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই অতর্কিতে পিছন থেকে একটা লোহার রড তার মাথায় পড়ল।
বিকট আর্তনাদ করে সে জাহাজের পাটাতনের ওপর লুটিয়ে পড়ল। মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো।
কাঠের মতো শক্ত এক জোড়া হাত সজোরে তার গলাটা চেপে ধরল। আচমকা ঘাড় ঘোরাতেই তার নজরে পড়ল, তার বাবা পিঠমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় অদূরে, পাটাতনের ওপরে পড়ে রয়েছে। কপালে একটা গভীর ক্ষত। সেটা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। মেঝের রক্ত দেখে বুঝল, একটু আগেও প্রচুর ঝরেছে।
তার বাবা নির্বাক নিস্তব্ধ–হাত পা ছড়িয়ে এলিয়ে পড়ে রয়েছে। সে বুঝে নিল, অচিরেই তার বাবার মৃত্যু ঘটবে।
ঘাঢ় ফেরাতেই তার নজরে পড়ল, জাহাজের প্রথম মেট চোখে মুখে চরম ঘৃণার ছাপ এঁকে তার দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
মিনিট খানেক নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর লোকটি কোটের পকেটে হাতটা চালান করে দিয়ে একটা ক্ৰণোমিটার আর একটা বেশ বড়সড় টাকার থলে বের করে আনল।
একজননিগ্রো পাচকসহ জাহাজের সাতজন নাবিক কেবিন থেকে খুঁজে অনেকগুলো গাদাবন্দুক আর প্রচুর পরিমাণ বারুদ বের করে আনল।
তারপর তারা আমার বন্ধু অগাস্টাসকে ঝটপট আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। কাঁধে তুলে নিয়ে জনা তিনচার চলে গেল ডেকের উপরে। আর বাকীরা লম্বা লম্বা পায়ে গলুইয়ের দিকে এগিয়ে গেল। চার বিদ্রোহী নাবিক ঝকঝকে কুড়াল হাতে অপেক্ষা করছে।
