আমি তখন মৃতপ্রায় অবস্থায় কম্বল আর ওভারকোটটা জড়িয়ে একান্ত অসহায়ভাবে পড়ে কাঁপতে লাগলাম।
আমি এও বুঝতে পারলাম, ওভারকোট আর কম্বলটা আমাকে আর বেশিক্ষণ ক্রোধোন্মত্ত কুকুরটার হিংস্র দাঁত আর নখের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। অল্প সময়ের মধ্যেই সে আমাকে বে-কায়দায় ফেলে দেবে।
আমি যারপরনাই হতাশ হয়ে পড়লাম। নিদারুণ হতাশার জন্যই আমার মধ্যে নতুন অসুরের শক্তি আর আত্মরক্ষার প্রেরণা জোগাল। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে এক ধাক্কা মেরে বাঘাকে হাত কয়েক দূরে ফেলে দিলাম।
বাঘার কবল থেকে নিজেকে কোনোরকমে মুক্ত করে তার গায়ে মোটা কম্বলটা চাপা দিয়ে দিলাম। এক লাফে দরজার কাছে চলে গেলাম।
বাঘা কম্বলের বাধা থেকে নিজেকে মুক্ত করার আগেই আমি ঝট করে দরজাটা খুলে বাইরে চলে গেলাম। সেটাকে আবার বন্ধ করে দিলাম।
শেষ সম্বল মাংসটুকু ফেলে আসতে হলেও ক্রোধোন্মত্ত কুকুরটার কামড়ের হাত থেকে কোনোরকমে নিজেকে বাঁচাতে পারলাম।
এখন খাবার মতো বস্তু বলতে সম্বল কেবলমাত্র বোতলের মদটুকুই রইল।
পেটের জ্বালা সইতে না পেরে বোতলটার শেষ ফোঁটাটা পর্যন্ত গলায় ঢেলে দিলাম।
হাতের খালি বোতলটা বিতৃষ্ণার সঙ্গে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ামাত্র সশব্দে বোতলটা ভেঙে গেল। ভাঙা টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বোতল ভাঙার শব্দ মেলাতে না মেলাতেই হঠাৎ শুনতে পেলাম, কে যেন চাপা গলায় আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করছে।
উকর্ণ হয়ে ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, আমার নাম ধরেই ডাকছে বটে। কিন্তু কণ্ঠস্বরটায় অভাবনীয় কাণ্ড ঘটায় আমি এতই অভিভূত হয়ে পড়লাম যে, সে ডাকের জবাবটাও দেওয়া সম্ভব হলো না। হয়তো বা এমনও হতে পারে সে মুহূর্তে আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম।
তবে কি বন্ধু অগাস্টাসই আমাকে ডাকাডাকি করছে? তা যদি না হয়, তবে? কিন্তু জাহাজের অন্য কারো পক্ষে তো আমার নাম জানার কথা নয়। বিরাট ধান্দায় পড়ে গেলাম।
ব্যাপারটা আমাকে বড়ই ভাবিয়ে তুলল। আমার দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে অগাস্টাস যদি ভাবে আমি মরে হেঁজে গেছি–তবে? তবে সে যদি আমার কাছে আসার চেষ্টা না করে, আমার খোঁজ না করে যদি ফিরে যায় তবে যে সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এ আশঙ্কার বশবর্তী হয়ে আমি শরীরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষে নিঙড়ে একটামাত্র শব্দ উচ্চারণ করার জন্য আমি প্রাণান্ত প্রয়াস চালাতে লাগলাম।
হায়! আমার চেষ্টাই সার হল। কার্যত ফল কিছুই হলো না। আমার গলা দিয়ে কোনো স্বরই বেরিয়ে এলো না।
হঠাৎ সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কান খাড়া করে ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, কার যেন পায়ের শব্দ হচ্ছে। আশায় বুক বেঁধে কান খাড়া করেই রইলাম।
পায়ের শব্দটা ক্রমে কাছে–আরও কাছে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে আবার পরমুহূর্তেই দূরে সরে গিয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল। সে মুহূর্তে আমার মনের অবস্থা সে কেমন হয়ে পড়েছিল তা কারো কাছে ব্যক্ত করা কিছুতেই সম্ভব নয় আর তা জীবনে কোনোদিন মন থেকে মুছে ফেলাও সম্ভব নয়।
হ্যাঁ, আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। আমার বন্ধু, আমার একমাত্র আশা ভরসা বন্ধু অগাস্টাস আমাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে চলে যাচ্ছে। যার কাছ থেকে অনেক, অনেক কিছু পাবার প্রত্যাশা আমি করেছিলাম সে আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে।
বন্ধু অগাস্টাসের চলে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে আমার অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু। একটু একটু করে নির্মম-নিষ্ঠুর মৃত্যুর হাতে নিজেকে তুলে দেওয়া। উফ! কী মর্মান্তিক পরিস্থিতি আমার জন্য নীরবে অপেক্ষা করছে!
হায় ঈশ্বর! একটামাত্র শব্দ আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারে। বহু চেষ্টা করেও আমি কিছুতেই সে শব্দটা গলা থেকে বের করতে পারছি না। আমার জীভটা যেন অবিশ্বাস্য উপায়ে আড়ষ্ট হয়ে গিয়ে আমার কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করে দিয়েছে।
এ যে কী শোচনীয়–কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তা মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়েও দশ হাজার গুণ তীব্র যন্ত্রণা যা আমার বুকটা খান খান করে দিতে লাগল। আমার দুর্বল শরীর অমন বেশিক্ষণ পরিস্থিতিটাকে বরদাস্ত করতে পারল না। আমি হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেলাম। যমদুত বুঝি শিয়রে হাজির। মাথার ভিতর ঝিম ঝিম করতে লাগল।
মাথা ঘুরে পড়ে যাবার সময় অসর্তকতার জন্য আমার কোমর থেকে অগাস্টাসের দেওয়া বাঁকানো ছুরিটা মেঝেতে পড়ে গেল। আমি পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাটা ঘটে। ছুরিটা মেঝেতে পড়ে যাওয়ামাত্র সেটা খট করে আওয়াজ হওয়ামাত্র আমি উকীর্ণ হয়ে থাকি যদি সেটা অগাস্টাসের কানে কোনোক্রমে পৌঁছে গিয়ে থাকে।
ঈশ্বর মুখ তুলে তাকিয়েছেন। আকস্মিক খুশিতে আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হতে লাগল।
আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে–‘আর্থার আর্থার।
প্রথমটায় ভাবলাম, আমার শোনার ভুল। দীর্ঘ আতঙ্কের জন্যই আমি এরকম বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছি।
উৎকর্ণ হয়ে রইলাম। আবার–আবারও সে ডাক শুনতে পেলাম–‘আর্থার! আর্থার!’ এবার নিঃসন্দেহ হলাম। এটা কিছুতেই শোনার ভুল হতে পারে না। এ তো বন্ধুবর অগাস্টাসেরই কণ্ঠস্বর! তার কণ্ঠস্বর যে আমি পরিষ্কার শুনতে পেয়েছি। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কেউ যখন ডাকাডাকি করে ঠিক তেমনই শুনেছি।
