আমি ছত্র কয়টার মধ্য থেকে যেটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি তা হচ্ছে–‘রক্ত। কাছাকাছি কোথাও শুয়ে থাকার ওপর তোমার বেঁচে থাকা নির্ভর করছে।’ ব্যস, এর বেশি একটা বর্ণও পড়া সম্ভব হয়নি।
না, বন্ধুবর অগাস্টাসের সতর্কবাণীটার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না। অবশ্য সম্পূর্ণ লেখাটা পড়তে পারলে হয়তো তার বক্তব্য বুঝতে পারতাম। কিন্তু তা-তো হলই না বরং অজ্ঞাত বিপদাশঙ্কায় মন-প্রাণ অস্থির হয়ে উঠল। আমাকে সবচেয়ে বেশি করে ভাবিয়ে তুলল ওই ‘রক্ত’ শব্দটা।
রক্ত! রক্ত শব্দটার সঙ্গে রহস্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর এটা চিরকালই মানুষকে আতঙ্কের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে। আমিও ভেতরে ভেতরে কম অন্তহীন অস্থিরতা আর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়লাম না।
এমন একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কি যে করণীয় কিছুতে ভেবে উঠতে পারলাম না। সম্ভাব্য ও অজ্ঞাত হাজারো বিপদের আশঙ্কা আমার মাথায় চক্কর মারতে লাগল। আর আকস্মিক ভয়-ভীতিতে শরীর ও মন অবশ হয়ে পড়ল। অভাবনীয় অবসাদ আমাকে পেয়ে বসল। মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে না পেরে, উপায়ান্তর না দেখে শেষপর্যন্ত মাদুরটার ওপর শুয়েই পড়লাম। চোখ দুটো খুলে রাখতেও যেন ভরসা পাচ্ছি না। চোখের পাতা দুটো আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে এলো।
কতক্ষণ যে আমি চোখ বুজে পড়েছিলাম, সঠিক বলতে পারব না। হঠাৎ কানের কাছে কীসের যেন কুৎ কুৎ শব্দ শুনতে পেলাম। সচকিত হয়ে চোখ মেলোম।
চোখ মেলতেই বাঘাকে দেখতে পেলাম। আমার শিয়রে, একেবারে মাথা ঘেঁষে সে দাঁড়িয়ে। অবর্ণনীয় একটা অস্থিরতা যেন তার মধ্যে ভর করেছে। তীব্র উত্তেজনা। উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে অস্বাভাবিক ছটফট করছে আর ইয়া লম্বা জিভটা বের করে অনবরত হাঁপাচ্ছে। অন্ধকারে তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
বাঘাকে কাছে টেনে নিয়ে আদর সোহাগ করার জন্য হাত বাড়ালাম। কিন্তু সে গলা দিয়ে কেমন একটা বিশ্রি ঘ ঘগ শব্দ করেই চুপ করে একেবারে নির্বাক নিস্পন্দভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
ব্যস, তারপর সে কি ঘটল তা আর আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আসলে কখন যে আমি আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম বলতে পারব না। আর কতক্ষণই বা আমি সে অবস্থায় কাটিয়েছি তাও আমার জানা নেই।
আগের মতোই বাঘার সেই বিশ্রিরকম ঘোৎ ঘোৎ আওয়াজে আমার তন্দ্রা কেটে গেল।
বাঘার মুখ থেকে বার বার একই রকম গোঙানি শোনার পর আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। আতঙ্কে বুকের ভেতরে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল।
একবার ভাবলাম, এই অন্ধকার ছোট্ট ঘরটায় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা এবং পানীয় জলের অভাবে হয়তো তার মাথার দোষ দেখা দিয়েছে। নইলে এমনটা তো করার কথা নয়। আবার এও হতে পারে দম বন্ধ-হওয়া পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে তার মনে এমন আকস্মিক এক ভীতির সঞ্চার হয়েছে যা সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না।
ব্যাপার যা-ই হোক, না কেন পরিস্থিতিটাকে কি করে যে আমি সামলে উঠব কিছুতেই ভেবে পেলাম না। কি যে আমার করণীয়, কে বলে দেবে?
বাঘাকে যে আমি মেরে ফেলব, এরকম চিন্তাও তো মাথায় আনতে পারছি না। কিন্তু নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবলে আমার এটাই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
কিন্তু আমি নিঃসন্দেহ যে, আমার দিকে সে যে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তাতে ভয়ঙ্কর একটা হিংস্র শুক্রতার আক্রোশ প্রকাশ পাচ্ছে। চরমতম শত্রুতা। যে কোনো মুহূর্তে তার ঝকঝকে ধারালো দাঁত আর থাবা নিয়ে তীব্র আক্রোশে আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
বেশিক্ষণ এমন ভয়ঙ্কর একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করা আমার পক্ষে সম্ভব হলো না।
অবর্ণনীয় মানসিক অস্থিরতার মধ্যেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, যত কষ্ট স্বীকারই করতে হোক, যে কোনোভাবেই হোক খাঁচার মতো অন্ধকার খুপড়িটা থেকে আমাকে বেরোতেই হবে। প্রাণ যায় আর থাক আমি বাইরে বেরোবই বেরোব। একাজ করতে গিয়ে যদি বাঘাকে হত্যা করতেও হয় তাতেও দ্বিধা করব না।
এবার বেরোবার প্রস্তুতি নিতে লেগে গেলাম। নিরাপত্তার জন্য অগাস্টাস যে বাঁকানো তীক্ষ্ণ ছুরিটা দিয়ে গিয়েছিল সেটাকে কোমরে, প্যান্টের সঙ্গে গুঁজে নিলাম। আর কিছু শুয়োরের মাংস আর অবশিষ্ট মদটুকু সমেত বোতলটাকেও সঙ্গে নিতে ভুললাম না।
এবার তৎপরতার সঙ্গে ওভারকোটটা গায়ে জড়িয়ে নিজেকে যথাসম্ভব ঢেকে নিয়ে খাঁচার মতো খুপড়িটায় দরজার দিকে গুটিগুটি এগোতে লাগলাম।
আমি দুপা এগোতেই হতচ্ছাড়া কুকুরটা তীব্র আক্রোশে গর্জে উঠে আমার গলজা লক্ষ্য করে সজোরে এক লাফ দিল। আমাকে কর্তব্য স্থির করার সুযোগ না দিয়েই আচমকা এক লাফে আমার ডান কাঁধটায় চেপে বসল। আমি বে-সামাল হয়ে বাঁ দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। ক্রোধান্মত্ত কুকুরটা ফুঁসতে ফুঁসতে আমার উপর শুয়ে পড়ল। তার তর্জন গর্জন কিন্তু এতটুকুও কমল না।
ভাগ্য ভালো যে, আমার মাথাটা বিছানার ওপর এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা কম্বলের ভেতরে ঢুকে গেল। নইলে কি যে হত তা আর বলার নয়।
ভাগ্যের জোরেই হোক আর যে কোনো কারণেই সে যাত্রায় পিতৃদত্ত প্রাণটা কোনোক্রমে রক্ষা পেল।
প্রচণ্ড ক্রোধটিকে সামলাতে না পেরে বাঘা মুখের সামনে কম্বলটাকে সম্বল করে ঝকঝকে দাঁতগুলো দিয়ে কম্বলটাকে কামড়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিতে লাগল। মোটা ওভারকোট আর কম্বলের ভাজ ভেদ করে তার দাঁত আমার চামড়ার স্পর্শ করতে পারল না।
