ব্যাপারটা আমাকে খুবই ভাবিয়ে তুলল। বহু ভাবনা চিন্তার দিয়েও আমি সেটার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম না। ব্যাপারটা হচ্ছে, উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্র পেরিয়ে, জাহাজের কর্মীদের চোখে ধূলো দিয়ে বাঘা আমার অন্ধকার খুপড়িটায় কি করে এলো!
আরে ধৎ! কী সব আবোল তাবোল ভেবে আমি অস্থির হচ্ছি। চুলোয় যাক সে ভাবনা চিন্তা। আমার প্রাণের দোসর বাঘাকে যে কাছে পেয়েছি এটাই তো যথেষ্ট। শুধু কি এই? আর সে সঙ্গে তার যে আন্তরিকতা-সেবাযত্নের আশ্বাস পেয়েছি এটাই কি উপরি এ অসহায় পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে পাওয়া নয়? কুকুর তো অনেকেই পোষে; কুকুরকে ভালোবাসে কম নয়। কিন্তু বাঘার ওপর আমার আকর্ষণ অন্য দশজন কুকুরের মালিকের তুলনায় অনেক, অনেক বেশি। তবে এও অস্বীকার করতে পারব না, বাঘা তার যোগ্যতা অনুযায়ীই প্রাপ্য স্নেহ ভালোবাসা পাচ্ছে। অর্থাৎ আমি মোটেই অপাত্রে ভালোবাসা দান করছি না।
বাঘা সাত-সাতটা বছর ধরে আমার কাছে রয়েছে–মাঝে আমরা উভয়ে কাছাকাছি পাশাপাশি অবস্থান করেছি।
অস্বীকার করতে পারব না, একটা কুকুরের মধ্যে যে যে গুণ থাকা দরকার বাঘার মধ্যে তাদের কোনোটারই ঘাটতি নেই। আর তার বহু প্রমাণ বাঘার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। সত্যিকারের প্রভুভক্ত বলতে যা বোঝায় বাঘাকে ঠিক অনায়াসেই সেই দলে ফেলা চলে।
ন্যান্টাকেটের এক নচ্ছারের কাছ থেকে আমি কৌশলে বাঘাকে বাগিয়ে নিয়েছিলাম।
আমার কাছে আসার পর তিনটা বছর পেরোতে না পেরোতেই বাঘা আমাকে দুর্ধর্ষ এক ডাকাতের লাঠির আঘাত থেকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নইলে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আমার ছিল না। আর এভাবেই বাঘা নিজেকে ঋণমুক্ত করেছিল, কোনো ভুল নেই।
আমিনিস্পলক চোখে, সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে প্রিয় কুকুর বাঘার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ছোট্ট কামরাটার মৃদু আলোয় অসময়ের হিতাকাঙ্খীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। সেও-ও আমার দিকে বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল। আমরা কেউ, কাউকে চিনতে এতটুকুও ভুল করিনি।
তার সর্বাঙ্গে মমতা-মাখানো দৃষ্টি বুলোতে বুলোতে একসময় আচমকা থমকে গেলাম। তার পেটের কাছে আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল। দেখলাম, তার পেটের লোমের সঙ্গে সুতো দিয়ে একটা ছোট্ট বস্তু জড়িয়ে রাখা হয়েছে। কাৎ হয়ে, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে সে দিকে তাকানোমাত্র বুঝতে পারলাম মুড়িয়ে বেঁধে দেওয়া একটা কাগজের টুকরো। কিন্তু কীসের কাগজ ওটা? কিছু লেখা আছে কি? অহেতুক তো ওটাকে এত যত্ন করে ওখানে বেঁধে দেয়নি। কাগজটার গায়ে কিছু না কিছু লেখা তো অবশ্যই আছে। কিন্তু কি লেখা? কে-ই বা কাজটা করেছে?
.
০৩. ॥ তৃতীয় অধ্যায় ॥
বাঘার পেটের সঙ্গে বেঁধে-দেওয়া কাগজটা আমাকে বড়ই ভাবনায় ফেলে দিল। তবে? তবে কি এটা আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু অগাস্টাসের কাজ? সে-ই কোনো-না-কোনো নির্দেশ লিখে বাঘা মারফৎ আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে?
কাজটা যদি অগাস্টাসের দ্বারাই হয়ে থাকে তবে সে নিজে না এসে এ পথ ধরল কেন? সে নিজে আমার কাছে এসে যা-কিছু বক্তব্য খোলসা করে আমাকে বলবে,
এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তা না করে সে এ পথ বেছে নিতে গেল কেন?
না, ব্যাপারটা নিয়ে আমাকে বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে হলো না। নিজেই একটা সম্ভাব্য যুক্তি বের করে ফেললাম, হয়তো অজ্ঞাত কোনো দুর্ঘটনার জন্য তার পক্ষে আমার কাছে আসা সম্ভব হয়নি। অথচ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা একান্ত দরকার হয়ে পড়ে। তাই অনন্যেপায় হয়েই তাকে বাঘার সাহায্য নিতেই হয়েছে। আমাকে। অন্ধকার এ কারাগার থেকে বের কওে নিয়ে যেতে না পেরে প্রকৃত ঘটনাটার প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অগাস্টাস বাঘা মারফৎ সে বার্তাই আমার কাছে পাঠাক না কেন তা কি করে পড়া সম্ভব? ঘরটা এতই অন্ধকার যে, নিজের খাতাটাকেও ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। আলোর ব্যবস্থা একটা বাতি অবশ্য আছে। কিন্তু সেটাকে। ধরানোর ঝামেলা অনেক।
তবে কামরাটার ওপরের দিককার ফাঁক ফোকর দিয়ে একটু-আধটু আলো আসছে বটে। ব্যস, আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে বাঘার পেটের কাছ থেকে কাগজের চিলতেটা হেঁচকাটান মেরে হাতে নিয়ে নিলাম।
এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে কাগজের চিলতেটাকে উঁচু করে আলোর রেখাটার সামনে মেলে ধরলাম। প্রথম দিকটায় কেবলমাত্র এটুকুই বুঝতে পারলাম, কাগজটার রঙ সাদা। ব্যস, এটুকুই। তার গায়ে কি লেখা আছে কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না। সত্যি কথা বলতে কি, আদৌ কিছু লেখা আছে কিনা সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে পারলাম না।
আমি রীতিমতো হকচকিয়ে গেলাম। কাগজটা হাতে রেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে বার-কয়েক ঘষাঘষি করতেই সাদা কাগজের ওপর লম্বা কালি দিয়ে বড় বড় হরফে লেখা কয়েকটা ছত্র আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল।
কিন্তু কি লেখা আছে তা উদ্ধার করার আগেই ক্ষীণ আলোর রেখাটা আচমকা সরে গেল। ভাবলাম, একী ভৌতিক কাণ্ডরে বাবা! হায়! একী সমস্যায় পড়া গেল। এমন অত্যুগ্র আগ্রহ আর ব্যস্ততাতেও চিঠিটা ভালো করে পড়া সম্ভব হলো না। তবে ভাগ্য ভালো যে, শেষের কয়েকটা ছত্র কোনোরকমে পড়তে পেরেছি।
