মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যান্তর ঘটে গেল। আমি যেন সাহারার প্রজ্বলিত মরুভূমির কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছি। একা–একদম একা আর সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। অতিকায় একটা হিংস্র সিংহ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমার পায়ের কাছে শুয়ে রয়েছে। আচমকা ইয়া বড় বড় চোখ মেলে ক্রোধপূর্ণ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকাল। বিশ্রি স্বরে খেঁকিয়ে উঠল। সে ভয়ঙ্কর হুঙ্কার দিয়ে ঝট্ করে উঠে দাঁড়ানো মাত্র ভয়ে আমি আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম।
জমাটবাধা আতঙ্কটুকু কেটে যাওয়ামাত্র আমি নিঃসন্দেহ হলাম, আমি জেগে উঠেছি। এ বিষয়ে আর সন্দেহ রইল না, এতক্ষণ স্বপ্নের ঘোরে যা দেখেছি, যা ভেবেছি, শতকরা একশো ভাগই স্বপ্ন নয়–কিছু না কিছুতেই বাস্তবের ছোঁয়া তো আছেই আছে। ভয়ঙ্কর একটা সত্যিকারের থাবা আমার বুকটাকে সজোরে চেপে ধরেছে। আর ক্রমেই আমার ওপর বল প্রয়োগ করে চলেছে। আর আমার কানে আগুনের মতো গরম নিশ্বাস স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি। আমার সর্বাঙ্গে থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল। সেই সঙ্গে আবছা অন্ধকারে দুধের মতো সাদা দাঁতগুলো অস্বাভাবিক চকচক করছে। আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে উঠার উপক্রম। স্নায়ুগুলো যেন ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়তে লাগল। আমি যে কী দুঃসহ মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে অসহায়ভাবে কাত্রাতে লাগলাম তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।
সে মুহূর্তে এক-আধজন নয়, হাজার মানুষের জীবনীশক্তি যদি আমার হাত-পা আর জিভে আশ্রয়নিত তবুও আমার পক্ষে সামান্যতম নড়াচড়া করাও সম্ভব হত না। আমি নিতান্তই অসহায়।
আসলে কিন্তু সিংহটা যেমন ছিল ঠিক তেমনিভাবেই আমার পায়ের কাছে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে। আমাকে খতম করে দেবার মতো কোনো মতলবই তার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এটা বুঝেও আমি আত্মরক্ষা–পালাবার চেষ্টা না করেই অসহায়ভাবে এলিয়ে পড়েই রয়েছি। নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রতিটা মুহূর্ত কাটাচ্ছি।
আমার কেবলই মনে হতে লাগল, আমি মরতে চলেছি। মৃত্যু অবধারিত। শরীর ও মন থেকে শক্তি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। অচিরেই আমি সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন হয়ে পড়ব। ব্যস, তখনই আমার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।
হ্যাঁ, মৃত্যু আমার শিয়রে মোতায়েন। কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা। নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে আমাকে কেউ অব্যাহতি দিতে পারবে না। কে-ই আমাকে মৃত্যুর কবল থেকে ছিনিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করবে? ধারে কাছে এমন কেউ নেই যে–
হায় ঈশ্বর! আমি আর ভাবতে পারছি না। একী সর্বনাশা কাণ্ড ঘটতে চলেছে! এমন অসহায় অবস্থায় পড়ে আমাকে কাত্রাতে হবে আমি মুহূর্তের জন্য স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।
মাথার ভেতরে কেমন যেন অবর্ণনীয় একটা যন্ত্রণা আমি অনুভব করতে লাগলাম। ঠিক সে মুহূর্তেই আচমকা মাথাটা পাক মেরে উঠল, দৃষ্টি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। চোখের মণি দুটোও ঘোলাটে–বিবর্ণ হয়ে আসছে। শরীরের সর্বশক্তি নিয়োগ করে শেষ বারের মতো পরমপিতাকে ডাকলাম। মোদ্দা ব্যাপার হচ্ছে, আমি পৌনে। মরা হয়ে নিতান্ত অসহায়ভাবে হাত-পা ছড়িয়ে আগের মতো এলিয়ে পড়ে রইলাম।
আমার প্রায় অস্ফুট কণ্ঠস্বর–গোঙানি যেন পায়ের কাছে শুয়ে-থাকা হিংস্র পশুটার জিঘাংসাকে অকস্মাৎ চাঙা করে তুলল। সে গা-ঝাড়া দিল। তারপর পা চারটি ছড়িয়ে দিয়ে আমার ওপর শুয়ে পড়ল।
অবাক কাণ্ড! একের পর এক অবাক কাণ্ড ঘটে চলেছে। অবিশ্বাস্য কাণ্ডটা দেখে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল। বুকের ভেতরে রীতিমত ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। হিংস্র জানোয়ারটা কেমন বিশি বুক-কাঁপানো করুণ স্বরে ঘোঁৎ-ঘোৎ করতে করতে ইয়া লম্বা লকলকে জিভ বের করে আমার মুখ আর হাত দুটো অনবরত চাটতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে আমার বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা আতঙ্কটুকু একটু একটু করে উবে যেতে লাগল। মনে হলো জানোয়ারটা যেন জিভ দিয়ে চেটে চেটে আমাকে সোহাগ করছে–বুকের স্নেহনিঙড়ে দিচ্ছে। অনাস্বাদিত এক আনন্দানুভূতিতে আমার মন-প্রাণ ভরে উঠল।
আমি বিস্মৃত, বিমূঢ় আর কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়লাম। বুদ্ধি বিবেচনা হারিয়ে বসলে মানুষের যে দশা হয় আমিও যেন ঠিক তেমনটিই হয়ে গেলাম। তবে এও তো সত্য যে, আমার প্রিয় কুকুর বাঘার ঘোঘোৎ শব্দটা যে আমার কানে লেগে রয়েছে, ভুলতে পারি না, পারিও নি কোনোদিন। আর সে যেমন আহ্লাদ গদগদ হয়ে আমার কাছ থেকে আদর পাবার জন্য চঞ্চল হয়ে পড়ে তখন কিভাবে আদর সোহাগ দিয়ে তাকে তুষ্ট করতে হয় তা তো আমার ভালোই জানা আছে।
হ্যাঁ, আমার অনুমান অভ্রান্ত। এ তো সিংহ বা বাঘ কিছুই নয়, আমার প্রিয় বাঘাই তো বটে।
আচমকা আমার মাথায় যেন খুন চেপে গেল। আমি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। মুক্তি আর পুনরুজ্জীবনের অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে যারপরনাই অস্থির করে তুলল। আমি পুরোপুরি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো ঝট করে উঠে বসে পড়লাম। আমার পরম বিশ্বস্ত এবং অভিন্ন হৃদয় বন্ধু বাঘার গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম। আবেগ উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বুকের সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে দিলাম। অভাবনীয় অসহনীয় যন্ত্রণাটাকে চোখের জলে নিঃশেষে ধুয়ে মুছে ফেললাম। বুকটা যেন শোলার মতো হালকা হয়ে গেল। কী যে অব্যক্ত এক শান্তি-স্বস্তি আমার মধ্যে ভর করল তা ভাষায় ব্যাখ্যা করার সাধ্য আমার নেই।
