আমি সংক্ষিপ্ত জবাব দিলাম–‘হুম!’
‘এখানে তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?
‘অসুবিধা, আরে ধুৎ! অসুবিধা কীসের? দিব্যি–একেবারে তোফা আছি।
সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
আমি আগের মতোই ফিসফিসিয়ে বললাম–জাহাজটা কখন ছাড়বে, বল তো?
‘আধ ঘণ্টার মধ্যেই।
‘শোন, আরও তিন-চারদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না। ভেব না। মিছে ভেবে অস্থির হয়ো না। ওপরের যা-কিছু কাজকর্ম সবই ঠিক আছে, পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছে। শুনে রাখ, আজ বিশে জুন। মাত্র তিন দিন তুমি এ কামরাটায় কাটিয়েছে।
‘হ্যাঁ, আমার হিসেবের সঙ্গে তোমার বক্তব্য মিলে যাচ্ছে।’
‘তবে এখন বিদায় নিচ্ছি, কি বল? আমি মুচকি হেসে ঘাড় কাৎ করে তার কথার জবাব দিলাম।
আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে সন্তর্পনে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অগাস্টাস আমার কামরা থেকে বেরিয়ে যাবার প্রায় ঘণ্টখানেক বাদে লক্ষ্য করলাম জাহাজটা আচমকা দোল খেতে শুরু করেছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না। আমাদের সাধের জলযানটা বন্দর ছেড়ে চলতে শুরু করেছে।
শেষপর্যন্ত বহু আকাঙ্ক্ষিত সমুদ্রযাত্রা শুরু হওয়াতে আমার মন-প্রাণ চনম নিয়ে উঠল। সে যে কী আনন্দ তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।
আপন মনে বলে উঠলাম–‘যতদিন একটা সুসজ্জিত ও আরামদায়ক কেবিনে জায়গা না পাই ততদিন এখানে, এ ছোট্ট কামরাটাতেই কাটিয়ে দেব,
ক্লার্ক আর লুইস-এর লেখা কলম্বিয়ার মোহনা অভিযান বিষয়ক বইটা বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলাম। বেশি দূর এগোতে পারলাম না। মাত্র কয়েক পাতা পড়তে না পড়তেই ঘুমে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। বইটা বন্ধ করে শিয়রে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙতেই হুড়মুড় করে উঠে বিছানায় ওপর বসে পড়লাম। আমার যেন মনে সবকিছু কেমন এলোমেলো, গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
অস্বীকার করব না, বন্ধু অগাস্টাসের উপর খুব রাগ হতে লাগল। তবে অচিরেই একটু একটু করে মনের বিষণ্ণতা কেটে যেতে লাগল।
হাতে-পায়ে কেমন যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলাম। আসলে এতটুকু একটা খাঁচার মতো ঘরে দিনের পর দিন অলসভাবে কাটাতে হচ্ছে। ভালোভাবে আয়েস করে শুয়ে বসে কাটানোর মতো যথেষ্ট জায়গা নেই।
আড়মোড়া ভেঙে শরীরটাকে একটু চাঙা করে নিলাম। পেটে ঠিক জ্বালা না করলেও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। বুঝতে অসুবিধা হলো না, ক্ষিদে পেয়েছে। মাংসের বাটিটা টেনে কাছে নিয়ে এলাম। প্রায় বরফের মতো ঠাণ্ডা মাংস।
সে বাটিটাকে নাকের কাছে ধরতেই নিঃসন্দেহ হলাম, পচে গেছে। কী আশ্চর্য ব্যাপার! আমি তবে কতক্ষণ ঘুমিয়ে কাটিয়েছি! এত বেশি সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছি যে বাটির মাংস পর্যন্ত পচে গেছে!
মাথাটা কেমন ভারী-ভারী মনে হতে লাগল। চিনচিন ব্যথা করছে। উপায়ান্তর না দেখে আবার শুয়েই পড়লাম। চোখ দুটো আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে এলো।
এক-দুই-তিন করে আরও চব্বিশটা ঘণ্টা কেটে গেল। কারো টিকির দেখাও পেলাম না। অগাস্টাসের ওপর খুবই রাগ হতে লাগল। আর যা-ই হোক, না কেন, তার তো অবশ্যই একটিবার আমার খোঁজ-খবর নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
গোদের ওপর বিষফোঁড়া। বিপদ কখনও একা আসে না। পাত্রের পানিও ফুরিয়ে গেছে। তেষ্টায় ছাতি ফাটলেও এক ফোঁটা পানি পাওয়া যাবে না পিতৃদত্ত জীবনটাকে রাখার জন্য।
সত্যি, খুবই তৃষ্ণা পেয়েছে। খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। এত ঘুমানো সত্ত্বেও কেমন ঘুম ঘুম পেতে লাগল। কিন্তু এ গুমোট কামরাটায় আর ঘুমোতেও ভরসা হলো না। দম বন্ধ হয়ে পরপারের যাত্রী হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।
এক সময় লক্ষ্য করলাম, জাহাজ অস্বাভাবিক দুলতে শুরু করেছে, বুঝতে অসুবিধা হলো না, জাহাজটা সমুদ্রের অনেক ভেতরে চলে এসেছে।
দূর থেকে অস্পষ্ট গর্জন ভেসে আসতে লাগল। বুঝলাম, প্রবল ঝড় আসছে। মুহূর্তের মধ্যে জাহাজটা অস্বাভাবিক দুলতে শুরু করেছে নির্ঘাৎ ঝড়ের দাপট শুরু হয়েছে।
তবে তো অন্ধকার খুপড়িটা থেকে বেরিয়ে এসে ডেকে যাবার সময় হয়ে এসেছে। ঢেউ আর ঝড়ের কবলে জাহাজটা কেমন করে বে-সামাল পরিস্থিতির মোকাবিলা করে চলেছে তা দেখার অপূর্ব সুযোগ থেকে আমি বঞ্চিত হচ্ছি। ডেকে দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর এ পরিস্থিতিটা চাক্ষুষ করতে পারলে কী যে মজা পেতাম তা ভেবেই আমার মন চঞ্চল হয়ে পড়ল।
কিন্তু কী সমস্যায় পড়া গেল! অগাস্টাসের তো দেখাই পাচ্ছি না। তবে? তবে কি বন্ধু কোনো বিপদে পড়েছে? কোনো আকস্মিক কারণে তার মৃত্যু ঘটেনি তো? কোনোক্রমে পা হড়কে জাহাজ থেকে পড়ে যায়নি তো!
বিপদের কাঁধে চেপে বিপদ এসে আমার সামনে দাঁড়াচ্ছে। ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন দেখায় আমার মন প্রাণ যারপরনাই বিষিয়ে উঠল। ভয়ঙ্কর হিংস্র দৈত্যরা অতিকায় সব বালিশ দিয়ে আমাকে জোর করে ঠেসে ধরেছে। আমাকে শেষ করে দেবার ধান্দায় আছে।
অতিকায় সব সাপ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে দম বন্ধ করে খতম করে দিতে চাইছে। তারা রক্তচক্ষু আর হিংস্র দৃষ্টি মেলে আমার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে। সামনে দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমির মধ্যে আমি একা অবস্থান করছি। যতদূর নজর চলে দেখা যাচ্ছে ডালাপালা আর পাতাহীন মৃতপ্রায় গাছগুলো মানুষের কঙ্কালের মতো অস্থিসর্বস্ব দুর্বল হাত দুটো বাড়িয়ে আমার কাছে পানি ভিক্ষা করছে। পানি! শুধুমাত্র একটু পানি।
