ঠাকুরদা কিন্তু থেমে নেই। বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে আমায় আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে পূর্বস্বর অনুসরণ করেই এবার বললেন ‘বলিহারী তোমার রুচি গর্ডন! নইলে এমন বস্তাপচা একটা ওভারকোট কেউ যে গায়ে চাপাতে পারে, বিশ্বাসই করা যায় না। ছিঃ। ছিঃ। বলিহারী তোমার রুচি, গর্ডন।
আমি দেখলাম, আর নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাৎ ফেঁসে যেতে হবে। তাই ভেবে চিন্তে বেশ যুতসই একটা জবাব দিলাম–
‘গর্ডন? কাকে আপনার গর্ডন বলছেন ভাই।’
‘তুমি বলছ, তোমার নাম গর্ডন নয়?
‘না, অবশ্যই না। এমনকি গর্ডন নামে কাউকে আমি চিনি না, কোনোদিন চিনতাম বলেও মনে পড়ছে না।
‘তুমি–তুমি
তাঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি আবার বলতে শুরু করলাম–‘ তা ছাড়া আমিও আপনাকে চিনি না, কোনোদিন তো দেখিওনি।
ঠাকুরদা ধবধবে সাদা গোঁফের ফাঁক দিয়ে ফিক ফিক করে হেসে উঠলেন।
আমি বলেই চললাম–আপনার সৌজন্যবোধের তারিফ না করে পারছি না ভাই। যাকে আপনি চেনেন না, তার পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে কথা বলা সমালোচনা করা কোনদেশি ভদ্রতা ভেবে পাচ্ছি না।’
আমার মুখে মধুর অকাট্য, যুক্তিটা শোনামাত্র ঠাকুরদা হঠাৎ আরও ভড়কে গেলেন।
তাঁর মুখের আকস্মিক পরিবর্তনটুকু আমার নজর এড়াল না। সে দিকে চোখ পড়তেই আমি হাসি সামলাতে না পেরে হো-হো রবে হেসে উঠলাম।
পরিস্থিতি খারাপ বুঝে ঠাকুরদা পিছনের দিকে দুচার-পা চলে গেলেন।
প্রথমটায় তার মুখের রক্ত যেন নিঃশেষে উধাও হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই সম্পূর্ণ মুখটা একেবারে অবিশ্বাস্য রকম লাল হয়ে উঠল। পুরু কাঁচের চাঁদির চশমাটা চোখ থেকে খুলে বার কয়েক মুছে আবার যথাস্থানে রাখলেন। এবার আগের মতোই অন্যমনষ্কভাবে ছাতাটা খুলে মাথার উপর ধরে প্রায় ছুটতে আরম্ভ করলেন।
সামান্য এগিয়েই কি ভেবে তিনি আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুহূর্তের জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। অনুচ্চকণ্ঠে প্রায় বিড় বিড় করতে করতে আবার হাঁটা জুড়লেন।
কথাগুলো অনুচ্চকণ্ঠে বললেও তার কথার মমার্থ উদ্ধার করতে আমার তেমন অসুবিধাই হলো না।
রীতিমত রাগতস্বরেই তিনি বলতে লাগলেন–‘আরে ধৎ। আর চালানো যাবে না। এবার চশমাটাকে বাতিল না করলে আর চলছে না। ছেলেটাকে গর্ডন ভেবেছিলাম। কী বে-ইজ্জত কাজ রে বাবা! না, আর চলবে না। এ চশমাটা বাতিল করে নতুন একটা না নিলে কিছুতেই চলবে না দেখছি।
আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাবলাম যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। ঠাকুরদার সাঁড়াশী আক্রমণের কবল থেকে কোনোরকমে ফস্কে যেতে পেরে আবার গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে হাঁটা জুড়লাম।
না, পথে আর নতুন করে কোনো হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়তে হলো না। আমি নির্বিঘ্নেই জায়গামত পৌঁছে গেলাম।
জাহাজে দু-একজন ছিল বটে তবে তারা সামনের দিকে কাজে মেতে ছিল।
ক্যাপ্টেন বানার্ডও জাহাজে অনুপস্থিত। লয়েড অ্যান্ড ভ্রেডেনবার্গ গেছেন। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। অতএব জাহাজ ফাঁকাই আছে। তাই অগাস্টাস আর আমি নিশ্চিন্তেই জাহাজে ঢুকে গেলাম। আমরা হাঁটতে হাঁটতে কেবিনে হাজির হলাম। কেবিনও ফাঁকা।
আমি গুটি গুটি কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেলাম। অনুসন্ধিৎসু নজরে চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে সোল্লাসে বলে উঠলাম–‘বাঃ চমৎকার, ব্যবস্থা! সব দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে কেবিনটাকে যাবতীয় ব্যবস্থাদিসহ সাজিয়ে তোলা হয়েছে–
সত্যি বলতে কি তিমি শিকারের জাহাজের কেবিনে সাধারণত এমন আরামদায়ক ব্যবস্থাদি থাকে না। থাকলেও আমার অন্তত জানা নেই। কারো নজরে পড়ে যেতে পারি এরকম আশঙ্কায় কেবিনের ভেতরে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হলো না। ইচ্ছে করেই থাকলাম না।
কেবিনের অদূরবর্তী অগাস্টাসের ঘরের ভিতর দিয়ে গুপ্ত একটা দরজা দিয়ে গলিঘুপচি দিয়ে বারবার ডানদিক-বাঁদিকে বাঁক নিতে নিতে এমন একটা জায়গায় হাজির হলাম যেখান থেকে হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি না করে কারো হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। সেখানেই আমাকে আত্মগোপন করে থাকতে হবে।
জাহাজের ভেতরটা যতটুকু দেখার সুযোগ আমি পেয়েছি তাতে তো ভালোই মনে হল। আমার ছোট্ট ঘরটার মেঝেতে একটা মাদুর পেতে অত্যাবশ্যক বহু ছোট বড় সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বই ও কাগজপত্র থেকে শুরু করে মদের বোতল পর্যন্ত সবই সেখানে দেখতে পেলাম।
ব্যস, আর চিন্তা-ভাবনা করতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে আমি কেবিনটার দখল নিয়ে নিলাম। খুশিতে মন-প্রাণ কানায় কানায় ভরপুর। হয়তো বা কোনো রাজা বাদশা প্রথম তার প্রাসাদে ঢুকে আমার মতো খুশিতে এমন উচ্ছ্বসিত হয়নি।
অগাস্টাস কেবিনটা, আমাকে ছেড়ে যাবার সময় কথা দিয়ে গেল, মাঝে মাঝে এসে আমাকে দেখে যাবে। এ পর্যন্ত যা-কিছু ঘটল সেটা ছিল সতেরই জুন।
সেদিনের স্মৃতি যা-কিছু আজও আমার মনে আছে তার ওপর নির্ভর করে বলছি, ওই গুপ্ত স্থানে, ছোট্ট ঘরটায় আমাকে তিন দিন তিন রাত বন্দিদশার মধ্যে কাটাতে হয়েছিল।
উপরোক্ত তিন তিনটি দিন আমি অগাস্টাসের হদিস পাইনি। চতুর্থদিন সকালে কিছুটা মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সময় কাটাচ্ছি। এমন সময় হঠাৎ দরজার বাইরে
অগাস্টাসের গলা শুনতে পেলাম।
অগাস্টাস পা টিপে টিপে ধীর-মন্থর গতিতে আমার ঘরে ঢুকল।
সে সাধ্যমত আমার কানের কাছাকাছি মুখ নিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বলল–সব ঠিক আছে তো?
