আমার বাবা-মা ছাড়া আরও একজন আমার সমুদ্র-অভিযানের পথে বড় রকমের বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি হচ্ছেন আমার অতি বৃদ্ধ দাদা। তার কাছ থেকে আমার। প্রত্যাশা অনেক-অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে পাব বলে আমি আশা রাখি।
আমার দাদা আমার মুখ থেকে সমুদ্র-অভিযানের প্রস্তাবটা শোনামাত্র রেগে মেগে একেবারে আগুন হয়ে গেলেন। কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন আমার সাফ কথা, শুনে রাখ, ভবিষ্যতে আর কোনোদিন যদি এমন কথা তোমার মুখে শুনি তবে একটিমাত্র শিলিং তোমার হাতে গুঁজে দিয়ে বাড়ির দরজার বাইরে দিয়ে আসব। কথাটা বলেই তিনি গুম হয়ে বসে রইলেন।
চারদিক থেকে এমন সব আপত্তিকর ঘটনা ও কঠিন-কঠোর কথা আমাকে আমার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও সরাতে পারল না। বরং আমার আগ্রহ আর জেদ হাজারগুণ বেড়েই গেল। আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, বাধা যত কঠিন রূপ নিয়ে আমার আগলে দাঁড়াক না কেন, তোয়াক্কা না করে আমি সমুদ্র অভিযানে যাবই যাব। পৃথিবীতে এখন কোনো শক্তি নেই যা আমাকে এ-পথ থেকে ফেরাতে পারে।
আমার চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা অগাস্টাসকে জানালাম। আমার দিক থেকে সম্মতি পেয়েই সে জোর কদমে যাত্রার প্রস্তুতি নিতে মেতে গেল।
আমি ব্যাপারটা নিয়ে মাতামাতি না করে নিজেকে সাধ্যমত সংযত রাখলাম। আমার পরিকল্পনার কথা আত্মীয়-পরিজনের কাছে গোপন রেখে আমি আগের মতোই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলাম। পড়াশোনায় আমার আগ্রহ অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে সবাই যাতে মনে করে সমুদ্র-অভিযানের ব্যাপারটাকে আমি মন থেকে মুছে ফেলেছি, এতে আমার আর কোনো ইচ্ছাই নেই।
এদিকে, বন্ধুবর অগাস্টাস, গ্রামপাস’ জাহাজেই সারাটা দিন পড়ে রইল।
অগাস্টাস সারাটা দিন ধরে জাহাজে থেকে কেবিন ও তার লাগোয়া খোলে আমার আর তার নিজের থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থাদি সেরে ফেলে।
তবে সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও প্রতি রাতে অগাস্টাস আর আমি মিলিত হয়ে আমাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ কাজটার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করি।
প্রস্তুতিপর্ব সারতে দেখতে দেখতে একটা মাস আমরা কাটিয়ে দিলাম। তবু কার্যকরী করার মতো কোনোরকম ফন্দি ফিকিরই আমাদের মাথায় এলো না।
মি. রস নামে আমার এক আত্মীয়নিউ ফোর্ডে বাস করেন। আমি একটু সময় সুযোগ পেলেই তাঁর কাছে চলে যাই। মাঝে-মধ্যে দু-তিন সপ্তাহও আমি তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে আসি।
১৮২৭ খ্রিস্টাব্দের জুনের মাঝামাঝি আমাদের জাহাজটা নোঙর তুলবে বলে করা হল।
আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা ছিল, জাহাজটা নোঙর তোলার দু-একদিন আগে মি. রস আমার বাবাকে একটি চিঠি দেবেন। তিনি চিঠিতে বাবাকে অনুরোধ জানাবেন, যে পক্ষ কালের জন্য তিনি যেন আমাকে তার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেন। আমি উক্ত দিনগুলো তার বাড়িতে কাটিয়ে এলে তিনি যারপরনাই খুশি হবেন। কারণ, তার-ই ছেলে এমেট আর রবার্টের বহুদিনের ইচ্ছা আমাকে নিয়ে কিছুদিন আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে থাকে। মতলবটা চমৎকারই বটে।
আর আলোচনার মাধ্যমে এও স্থির হয়ে গেল, চিঠিটা লেখা আর সেটা আমার বাবার হাতে পৌঁছে দেবে বন্ধুবর অগাস্টাস। সে স্বেচ্ছায়ই এ গুরুদায়িত্ব মাথায় নিয়েছে।
অগাস্টাসের সঙ্গে এ-কথাও পাকা হয়ে গেল।নিউ বেডফোর্ডে যাবার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েই আমি তাকে খবর দেব। সে আগেভাগেই গ্রাসপাস-এই আমার আত্মগোপন করে থাকার উপযোগি একটা ভালো জায়গা ঠিক করে রাখবে।
জাহাজটা নোঙর তুলে গভীর সমুদ্রের দিকে বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দেবার পর সেখানে থেকে আমাকে তো আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তারপর পাড়ি দেবার সময় পথে এমন বহু জাহাজের দেখা মিলবে যাদের মারফৎ আমার বাবাকে অভিযানটির কথা জানিয়ে দিলেই চলবে।
শেষপর্যন্ত জুনের মাঝামাঝি আমাদের নির্ধারিত সেই বিশেষ দিনটা চলে এলো। এদিকে আমাদের পরিকল্পনামাফিক যাবতীয় কাজকর্মও সেরে ফেলা হয়েছে। বাবার কাছে চিঠি লেখার কাজ ও পৌঁছে দেবার ব্যবস্থাদিও মিটিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এক সোমবার সকালে আমি পূর্ব নির্ধারিত নিউ বেডফোর্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। তবে জাহাজঘাটা বা অন্য কোনোখানে না গিয়ে আমি সরাসরি বন্ধু অগাস্টাসের বাড়ির পথ ধরে হাঁটা শুরু করলাম। এ রকমই কথা ছিল। তার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হলো না। পথের মোড়েই তার দেখা পেয়ে গেলাম। আমার অপেক্ষায়ই। সে দাঁড়িয়ে ছিল।
অগাস্টাস আমাকে নিয়ে জাহাজঘাটার উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগল। আমার আপাদমস্তক আলখাল্লা দিয়ে ঢেকে নিয়েছি যাতে পথচারী কেউ আমাকে চিনে না ফেলে।
প্রথম মোড়টানির্বিঘ্নে পেরিয়ে দ্বিতীয় মোড়টায় পৌঁছাতেই আমাকে থমকে যেতে হল। দেখলাম, এক বৃদ্ধ আমার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে। পুরু কাঁচের চশমার ফাঁক দিয়ে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তিনি আমাকে নিরীক্ষণ করে চলেছেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি অন্য কেউ নন, আমার ঠাকুরদা মি. প্যাটারসন।
আমার মুখের দিকে অনুসন্ধিৎসু নজরে কিছু সময় নীরবে তাকিয়ে থাকার পর এক সময় তিনি ম্লান হেসে বললেন–আরে, কী অবাক কাণ্ড, গর্ডন তুমি!
আমি নীরবে ম্লান হাসলাম।
এ কী করেছ গর্ডন, কার একটা ছেঁড়া-নোংরা ওভারকোট গায়ে চাপিয়েছ বলো
আমি তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে কি বলব, কি বলে ব্যাপারটিকে সামাল দেব, ভাবতে লাগলাম।
