.
০২. ॥ দ্বিতীয় অধ্যায় ।
সবেমাত্র যে ভয়ঙ্কর সমুদ্র-অভিযানের কথা ব্যক্ত করলাম তা বাস্তবিকই অদ্ভুত, নিছকই অত্যাশ্চর্য, আর সে ঘটনার জন্যই সমুদ্রের প্রতি আমার মনে বীতশ্রদ্ধা জাগবে, সমুদ্র অভিযানের প্রতি অনীহা জন্মাবে–পাঠকদের পক্ষে এরকম ধারণা করাই সঙ্গত। আর হবে না-ই বা কেন? এত ঝড়-ঝাঁপটা আর নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে পিতৃদত্ত জীবনটাকে নিয়ে কোনোরকমে ফিরে আসার পর সে আর ভুলেও কোনোদিন ও পথে যাবে না, এটাই তো ভাবা উচিত।
কিন্তু অভাবনীয় উপায়ে প্রাণে বেঁচে যাবার পর এক সপ্তাহ না পেরোতেই সমুদ্রযাত্রারনির্ভীক অভিযানের যে বাঁধ না-মানা ইচ্ছা মনকে চঞ্চল করে তুলল, এমনটা ইতিপূর্বে আর কোনোদিনই দেখা দেয়নি।
আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সে রাতে যে বুক-কাঁপানো অভিজ্ঞতার স্মৃতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে গেঁথে নিয়েছিল তা কয়দিন যেতে না যেতেই নিঃশেষে মুছে যেতে লাগল। আর তার জায়গা দখল করল ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনাটার যা-কিছু রোমাঞ্চকর, যা-কিছু মনোলোভা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, অচিরেই নতুন করে সমুদ্রঅভিযানে পা বাড়াবার জন্য আমি ভেতর থেকে রীতিমত তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম।
আমি মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়ে বন্ধুবর অগাস্টাসের কাছে যাওয়া বাড়িয়ে দিলাম। ইদানিং তার মুখোমুখি বসে সমুদ্র-অভিযানের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আলোচনা করে যত আনন্দ পাই, অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করার তিলমাত্র উৎসাহই আমি পাই না।
অগাস্টাসের কাছে ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে আমাদের মধ্যে আলোচনাও ততই বেড়ে চলল। আর এরই ফলে সমুদ্র অভিযানের প্রতি আমার ইচ্ছাও ক্রমেই প্রবল থেকে প্রবলতর হতে হতে একেবারে তুঙ্গে উঠে যেতে লাগল।
অগাস্টাস সমুদ্র-অভিযানের কাহিনীগুলোকে এমন রসিয়ে রসিয়ে মাত্রাতিরিক্ত খাদ মিশিয়ে এমন আকর্ষণীয় করে আমার কাছে পরিবেশন করত যা শুনেই আমার মন প্রাণ রীতিমত চনম নিয়ে উঠত। সে মুহূর্তে আমি যেন নিজেকে পুরোপরি হারিয়ে ফেলতাম, আর কল্পনার ময়ুরপঙ্খী চেপে অচিন দেশে পাড়ি জমাতাম। এখন অবশ্য আমার মনে হয় তার রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর একটা বড় অংশই মনগড়া, আসলের চেয়ে খাদই মেশানো থাকত বেশি।
আরও অবাক হবার মতো কথা, সমুদ্র অভিযানের রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলোর পাশাপাশি সে যখন দুঃখ-কষ্ট আর যন্ত্রণার মুহূর্তগুলোর কথা আমাকে শোনাত তখনই আমার অস্থির মন ধেয়ে যেত নাবিক-জীবনের দিকে।
আমার মন-প্রাণ জুড়ে থাকত সমুদ্রের প্রলয়ঙ্কর ঝড়-ঝাপ্টা, জাহাজডুবি, অনাহার ও দুর্ভিক্ষ, পথ হারিয়ে অসভ্য জংলী হিংস্র মানুষের পরিবেশে হাজির হওয়া, তাদের কবলে পড়ে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় নির্মমভাবে প্রাণ খোয়ানো, বন্দি-জীবন যাপন করা, নাম
-জানা অজানা-অচেনা পরিবেশে, দুর্গম স্থানে বা সমুদ্রের বুকের কোনো নির্জন-নিরালা পার্বত্য অঞ্চলে চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে দিনের পর দিন মৃতপ্রায় অবস্থায় কাটানো প্রভৃতির মতো ভয়ঙ্কর আরও কত দৃশ্য আমার মনে বার বার উঁকি দিত।
এদিকে এরিয়েল নামক জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়ার পর প্রায় আঠারো মাস পরের কথা। গ্রামপাস’ নামক দুই মাস্তুলের জাহাজটাকে সারাই করে সমুদ্র যাত্রার উপযোগি করে তোলার জন্য কর্মীদের জোর তৎপরতা শুরু হয়ে গেল। উদ্দেশ্য জাহাজটা সারাই হয়ে গেলেই ‘লয়েড অ্যান্ড ব্লেন্ডেনবার্গ, নামক নবাগত তিমি শিকারের কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হবে।
জাহাজটা বহু পুরনো। তার ওপর দীর্ঘদিন অব্যবহারের ফলে সেটা একেবারে জীর্ণদশাপ্রাপ্ত হয়েছে। এমন একটা জাহাজকে মেরামত করে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা খুবই কঠিন সমস্যা। ফলে সেটাকে মেরামত করতে গিয়ে হাজারো হাঙ্গামা পোহাতে হল। তবু কর্মীরা এত সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।
কর্মীদের কাজের তৎপরতা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তারা জাহাজটাকে ব্যবহারের উপযোগি করে তুলতে পারল। তারপর রঙের প্রলেপ দেওয়ায় পর সেটা যেন সদ্য তৈরি একটা জাহাজ পানিতে নামল।
জাহাজটার মেরামতির কাজ মিটে গেলে জাহাজের ক্যাপ্টেন নিযুক্ত করার ব্যাপারটার দিকে নজর দেওয়া হল। অনেক ভেবে চিন্তে শেষপর্যন্ত মি, বানার্ডকেই ক্যাপ্টেনের পদে বহাল করা হল।
আর এও ঠিক হল, আমার বন্ধুবর অগাস্টাসও তার সঙ্গে জাহাজে উঠবে। অগাস্টাস মাঝে-মধ্যেই আমার সঙ্গে দেখা করে। বিভিন্নভাবে আমাকে বোঝায়, আমার সমুদ্র-অভিযানের এমন অপূর্ব সুযোগ আর আসবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ ছাড়াও সে আমাকে আরও কতভাবে যে প্ররোচিত করতে লাগল তা বলে শেষ করা যাবে না।
সত্যি কথা বলতে কি, আমি তো এমন একটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য মনে-প্রাণে আগ্রহী। আরও সহজ ভাষায় বললে, সমুদ্রে পাড়ি জমানোর জন্য আমি তো পা বাড়িয়েই রয়েছি। কিন্তু আসলে ভাবাটা যত সহজ ব্যবস্থা করাটা তো আর এত সহজ নয়।
আমার আন্তরিক ইচ্ছার কথাটা রাতে বাবা-মাকে বললাম। বাবা আমাকে এ কাজে উৎসাহ না দিলেও প্রবল আপত্তি করলেন না। কিন্তু সমস্যা বাঁধালেন আমার গর্ভধারিনী–আমার মা। আমার সমুদ্র-অভিযানের কথা শুনেই তিনি যে কাঁদতে বসলেন সারারাত তার আর কান্না থামল না।
