‘বলতে চাইছি, অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার একমাত্র অনুভূতি ছিল, জমাটবাধা অন্ধকারের আর অস্তিত্বহীনতার।
‘অস্তিত্বহীনতার।
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। আর সঙ্গে ছিল মৃত্যুচেতনা। আর শেষ পর্যন্ত আমার বোধ হলো অকস্মাৎ একটা বিদ্যুৎপ্রবাহ যেন আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করতে লাগল। সে যে কী অবস্থা তা বুঝিয়ে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আসলে যে সেটা একটা অনুভূতি মাত্র, চোখে দেখা বা স্পর্শ করে উপস্থিতি অনুভব করার ব্যাপার নয়।
আমি যেন যন্ত্রচালিতের মতো মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
খুবই সত্য যে, চোখে দেখা, কানে শোনা বা শারীরিক দিক থেকে তখনকার মতো গ্রাহ্য করার মতো কোনোরকম উপস্থিতিই আমার মধ্যে ছিল না।
এক সময় জনতার উত্তেজনা থেমে গেল। এক এক করে সবাই চলে গেল। পথঘাট ধরতে গেলে জনমানবশূন্য হয়ে পড়ল। গোলমালের চিহ্নমাত্রও আর রইল না। শহরের পরিবেশ শান্ত-স্বাভাবিক হয়ে এলো।
আমার শবদেহটা আমারই পায়ের তলায় অবস্থান করছে। তীরটা কপালে গেঁথে রয়েছে। আর মাথাটা ফুলতে ফুলতে ইয়া বড়, খুবই বিকট আকার ধারণ করেছে। বুঝার উপায় নেই, সেটা আমার, কোনো মানুষের মাথা হতে পারে। তবে যা-কিছু বলছি সবই আমার ধারণা–অনুভূতির মাধ্যমে উপলব্ধি করা, কোনোটাই বাস্তব চোখের সামনে দেখা ব্যাপার অবশ্যই নয়। আবারও বলছি, কোনো ব্যাপারেই আমার আগ্রহ উৎসাহের লেশমাত্রও ছিল না। এখনও বলছি, এমনকি আমার শবদেহটার। ব্যাপারেও আমার মধ্যে কোনোরকম আগ্রহ ছিল না। বরং এ ব্যাপারে আমি একেবারেই উদাসীন, সম্পূর্ণ নিস্পৃহ।
আমার মধ্যে আগ্রহ না থাকলেও কেবলই যেন মনে হতে লাগল, কে যেন গোপন অন্তরাল থেকে আমাকে সেখান থেকে কেটে পড়ার জন্য বার বার উস্কানি দিতে লাগল।
আমি শেষপর্যন্ত সেখান থেকে সরে পড়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারলাম না। তাই যে ঘুরপথে আমি শহরে ঢুকেছিলাম সে পথ অনুসরণ করে আমি ব্যস্ত-পায়ে শহর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
উৰ্দ্ধশ্বাসে হাঁটতে হাঁটতে আমি যেখানে হায়নাটাকে চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেরেছিলাম ঠিক সে জাগায়টাতেই আবার এসে হাজির হলাম। সে জায়গাটাকে চিনতে পারামাত্র আমি যেন আচমকা বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে গেলাম। ভার, আগেকার সেই ইচ্ছাশক্তি আর অস্তিত্ববোধ আমার মধ্যে ফিরে আসতে লাগল।
একসময় আপন অস্তিত্ব আমার মধ্যে পুরোপুরি জেগে উঠল।
হ্যাঁ, আমি আবার আপন সত্ত্বা ফিরে পেলাম। সম্বিৎ যে আমি সম্পূর্ণরূপে ফিরে পেয়েছি তা উপলব্ধি করতে আমার দেরি হলো না।
এবার আমি অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। তখন আমার একটা মাত্রই ভাবনা, কত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে পারব।
কিন্তু অতীতকার বাস্তবতাকে অবশ্যই বিস্মৃত হলো না। এর মধ্যে অবাস্তব ব্যাপার-স্যাপার কী-ই বা আছে তা তো আমি ভেবে উঠতে পারলাম না। সম্পূর্ণ বাস্তব যা-কিছু তাদের স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দেওয়া কি করে সম্ভব, বলুন? ডাক্তার টেম্পলটন নির্দিধায় বললেন–সেটা স্বপ্ন ছিল না এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কিছুমাত্রও নেই। কিন্তু সেটাকে যে কোন নামে অভিহিত করা যায় তা-ও তো ভাববার ব্যাপারই বটে।
মি. বেডলো তাঁর দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকিয়ে কথাগুলো শুনতে লাগলেন।
ডাক্তার টেম্পলটন তাঁর বক্তব্য অব্যাহত রাখলেন–‘দেখুন, আমরা শুধুমাত্র এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, বর্তমান যুগের মানুষের মন, মানুষের চিন্তাধারা বিরাট একটা আবিষ্কার করতে চলেছে।
‘আবিষ্কার?
‘হ্যাঁ, আবিষ্কার। একেবারেই অভিনব এক আবিষ্কার। তবে এও সত্য যে, এ পর্যন্ত জেনেই আমাদের তুষ্ট থাকতে হবে, আত্মতৃপ্তি লাভ করতে হবে। আর বাকিটার সামান্যতম ব্যাখ্যা আমি করছি।
মুহূর্তের জন্য নীরব থেকে ডাক্তার টেম্পলটন একটা ছবির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন–এই যে ছবিটা দেখছেন, ভালোভাবে লক্ষ্য করুন। অবশ্য আমার উচিত ছিল আগেই আপনাকে এটা দেখিয়ে রাখা।
মি. বেড়লো কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। আসলে ডাক্তার টেম্পলটন তাকে সে সুযোগ না দিয়ে নিজেই আবার বলতে শুরু করলেন–হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, ছবিটা কেন আমি আগেই দেখাইনি, ঠিক কি না? এর উত্তরে আমি বলব, বর্ণনাতীত একটা আতঙ্কের জন্যই এতদিন ছবিটা দেখানো সম্ভব হয়নি।
তাঁর অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আমরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি দীর্ঘসময় ধরে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে, ভালোভাবে লক্ষ্য করেও ছবিটার মধ্যে এমনকিছু পেলাম না যা আমার কাছে অসাধারণ বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মনে হবে।
ছবিটার মধ্যে আমি অসাধারণ কিছু খুঁজে না পেলেও মি. বেডলোর কাছে তার বিশেষ প্রতিক্রিয়া হল।
আমি লক্ষ্য করলাম, ছবিটা দেখা মাত্র মি. বেডলোর চোখ মুখ মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন বদলে গেল। তিনি প্রায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলার উপক্রম হলেন।
আসলে ছবিটা তো মি. বেডলোরই ছোট একটা প্রতিকৃতি ছাড়া অন্য কিছুই নয়। তবে প্রতিকৃতিটা তো তাঁর নিজেরই অবয়বের এক অদ্ভুত ধরনের অবিকল প্রতিরূপ। আর যা-ই হোক না কেন, ছবিটা দেখে আমার কাছে এ ছাড়া অন্য কিছুই মনে হয়নি। তবে? তবে তার মধ্যে এরকম আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ কি? আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি ও ভাবনা চিন্তা দিয়ে ব্যাপারটার কিনারা করতে পারলাম না।
