জাহাজে কোনো ডাক্তার ছিল না। ক্যাপ্টেন ইটিভি ব্লক চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপার স্যাপার একটু-আধটু জানতেন। তিনিই নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে আমার চিকিৎসা শুরু করে দিলেন। তাঁর আন্তরিক সেবাযত্ন ও চিকিৎসায় আমি অচিরেই সংজ্ঞা ফিরে পেলাম। এমনও হতে পারে, আমার প্রতি পূর্বকৃত গাফিলতির জন্যই তিনি আমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে আমাকে সুস্থ করে তুললেন।
যা-ই হোক, পেঙ্গুইন জাহাজটার কর্মচারী, মেট আর ক্যাপ্টেনের সমবেত চেষ্টায় আমি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলাম।
আমাকে উদ্ধার করার পর মেট হেল্ডারসন আবার নিচে অবস্থানরত ডিঙিটায় নেমে গেলেন। আমি তখনও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকায়, আমার মুখ থেকে আমাদের জাহাজের অন্য কেউ ছিল কি না জানার সুযোগ না পেয়ে নিজেই খুঁজে দেখার জন্য আবার ডিঙিটায় নেমে গেলেন।
দম্কা ঝড় তখন হ্যারিকেনের রূপ নিয়েছে। সে যে কী ভয়ঙ্কর ঝড় তা চাক্ষুষ না করলে কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। যা-ই হোক, ডিঙিটায় চাপামাত্র এক ধাক্কায় হেন্ডারসনের ডিঙিটা বেশ কিছুটা পথ ঝট করে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই ডিঙিটার সামনে দিয়ে আমাদের ছোট্ট জাহাজটার ভাঙাচোরা অংশ তিনি ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে যেতে দেখতে পেলেন। তাঁর সঙ্গি জনা-দুই নাবিকও ছিল।
নাবিকদের মধ্যে থেকে একজন হেন্ডারসনকে বলল–‘ঝড়ের গর্জন ভেদ করে অন্ধকারের ভেতর থেকে কার যেন আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ওই–ওই যে, তীব্র, আর্তনাদ করছে–‘বাঁচাও! বাঁচাও।’
এবার হেল্ডারস নতুন উৎসাহ-উদ্যম নিয়ে চারদিকে হন্যে হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিল। যাকে বলে রীতিমত চিরুনি অভিযান চালাতে লাগলেন। না, আধঘণ্টা ধরে হন্যে হয়ে পানি তোলপাড় করে তল্লাশি চালিয়েও যখন কারো হদিস মিলল না, তখন হেন্ডারসন হতাশ হয়ে বললেন–হয়তো আমাদেরই শোনার ভুল। ঝড় আর ঝড়ের মিলিত তীব্র গর্জনকেই হয়তো আর্তনাদ ভেবে আমরা ভুল করেছি। ভাঙা-জাহাজটায় আর কেউ থাকলে অবশ্যই আমাদের চোখে পড়ত।’
আধ ঘণ্টার কেটে গেলে ক্যাপ্টেন ইটিভি ব্লক জাহাজ থেকে সংকেতের মাধ্যমে মেট হেন্ডারসনসহ সবাইকে নিয়ে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
আর এদিকে মেট হেন্ডারসন ও তার সহযোগি নাবিকরাও হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন। ক্যাপ্টেন ব্লকের নির্দেশ পাওয়ার পর তারা ফিরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নিয়ে নিলেন।
সবাই যখন ফিরে যাওয়ার জন্য ডিঙিটার মুখ ঘোরাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ঠিক তখনই তাদের পাশ দিয়ে, ডিঙিটাকে প্রায় গা ঘেঁষে কালোমতো কি যেন একটা বস্তুকে ভেসে যেতে দেখলেন। আর সে বস্তুটার ভেতর থেকে একটা চাপা আর্তস্বর কানে এলো। গোড়ার দিকে সবাই ভাবলেন, বুঝি এবারও শোনার ভুল।
মুহূর্তের জন্য উৎকর্ণ হয়ে আর্তস্বরটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার চেষ্টা করলেন। না, এত শোনার ভুল হতে পারে না। পরিষ্কার দুর্বল কণ্ঠের গোঙানি। ব্যাস, আর একটা মুহূর্ত দেরি না করে আমাদের ডিঙিটার মুখ ভেসে-যাওয়া বস্তুটার দিকে ঘুরিয়ে নিল। এবার সাধ্যমত দ্রুততার সঙ্গে সেটাকে এগিয়ে নিয়ে কালো বস্তুটাকে ধরে ফেললেন। কালো বস্তুটা আসলে আমাদের ‘এরিয়েল’ জাহাজটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পুরো ডেকটা। আমার বন্ধু অগাস্টাস ডেকের ভেতরে পড়ে অনবরত গোঙাচ্ছে।
ডেকটা ধরে ফেলার পর মেট হেন্ডারসন আর তার সহযোগি নাবিকেরা ভাসমান ডেকের একটা কাঠের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় তাকে দেখতে পেল। আমার প্রিয় পাঠকরা, আশা করি আপনাদের স্মরণ আছে, আমিই তাকে কাঠটার সঙ্গে বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। তা যদি না করতাম তবে বেহুস অবস্থায় ঢেউয়ের টানে কোথায় যে তলিয়ে যেত তার হদিসই মিলত না। যা-ই হোক, আমার বন্ধুর বেহুস দেহটাকে ডিঙিতে তুলে নিল। স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে অগাস্টাসের ঘন্টা খানেক সময় লেগে গেল। তবু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে উঠল না, কেমন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েই গেল।
আমিও ক্রমে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে লাগলাম।
তারপর পেঙ্গুইন আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করল। ভয়ঙ্কর একটা ঝড়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে, রীতিমত দাপাদাপি করতে করতে দিন ভোরের আলো ফুটলে বন্দরে ঢুকে নোঙর করল। প্রাতরাশ সারতে যাওয়ার সময় অগাস্টাস আর আমি ঠিক সময় মতোই মি. বার্ণার্ডের বাড়ির দরজায় পৌঁছে গেলাম। দরজায় কড়া নাড়তেই মি. বার্ণার্ডের পরিচারক দরজা খুলে আমাদের স্বাগত জানাল।
আগের রাতের ভোজসভায় যোগদান করায় সবাই এতই ক্লান্ত যে, অগাস্টাস আর আমার বিধ্বস্ত চেহারার দিকে কারো নজরেই পড়ল না। আমাদের দিকে মন দেওয়ার মতো কারোই দেহ মন সুস্থ নয়।
তারপর থেকে আমরা দুজন ঘটনাটা নিয়ে মাঝে-মধ্যেই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেছি। আমরা যতটাই প্রসঙ্গটা নিয়ে কথা বলেছি, প্রতিবারই আতঙ্কে আমাদের বুকের ভেতরে ধুকপুকানি শুরু হয়ে যায়। শরীরের সব কয়টা স্নায়ু যেন এক সঙ্গে শিথিল হয়ে আসতে চায়। আর মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে থাকে।
বন্ধুবর অগাস্টাস তো একদিন কথা বলতে গিয়ে দুম করেই বলেই ফেলল, সে রাতে আমাদের ছোট্ট পাল-তোলা জাহাজটায় বসে প্রথম যখন সে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে মাত্রাতিরিক্ত মদ গেলায় সে নেশায় একেবারে পাড় মাতাল হয়ে পড়ে তখন মাথার ভেতরে যে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করছিল, তিলে তিলে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল, সংজ্ঞা হারিয়ে কোনো এক অন্ধকার গহবরের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সে রকম পরিস্থিতিতে জীবনে আর কোনোদিন পড়েনি। তার মতে সে অভিজ্ঞতাটা নাকি বাস্তবিকই অভূতপূর্ব আর একেবারে বর্ণণাতীতও বটে।
