জনাকয়েক নাবিক জাহাজটার সামনের দিকে ছিল। গোড়াতে তারাও আমাদের জাহাজটাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু যখন নজরে পড়ল তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আয়ত্বের বাইরে। সংঘর্ষ এড়াবার কোনো পথই খোলা ছিল না। তবু যদি কিছু করা যায় ভেবে তারা চিৎকার চাচামেচি করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ, সাবধান করে দেবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করল। তা আমাদের কানে যেতেই আমরা আতঙ্কে মুষড়ে পড়েছিলাম। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছি, ঠিক সে মুহূর্তেই ঢেউয়ের ঝাপ্টায় অতিকায় জাহাজটা আমাদের ওপর দিয়ে শোলার মতো আলতোভাবে টপকে গেল।
এমন ভয়ঙ্কর একটা কাণ্ড ঘটে গেলেও ছোট জাহাজটার ডেক থেকে সামান্যতম আর্তনাদও উঠল না। কেবলমাত্র ঝড় আর ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া শব্দের সঙ্গে দুটো জাহাজের ঘর্ষণের মৃদু আওয়াজ শোনা গেল। এর বেশি কিছুই নয়।
আমাদের জাহাজটাকে বড়সড় একটা ঝিনুক ভেবে ‘পেঙ্গুইনের ক্যাপ্টেন ইটিভি ব্লক তো জাহাজ নিয়ে চলেই যাচ্ছিলেন।
আমাদের ভাগ্য ভালো যে, পেঙ্গুইনের পর্যবেক্ষক-নাবিকরা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছিল, একটা লোককে তারা হাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেয়েছিল। তারা ক্যাপ্টেনকে এও বলেছে, চেষ্টা করলে তাকে বাঁচানো যেতে পারে। ক্যাপ্টেনের বিশ্বাস স্থাপন করতে তারা শপথ করতে দ্বিধা করল না।
ক্যাপ্টেন ইটিডি ব্লক কিন্তু তবু ব্যাপারটাকে বিশ্বাস করতে উৎসাহ পেলেন না।
পর্যবেক্ষক-নাবিকরা তবুও তাদের বক্তব্য থেকে সরে গেল না। শেষপর্যন্ত ক্যাপ্টেন রেগে একেবারে আগুন হয়ে গেলেন। তিনি গর্জে উঠলেন–তোমরা কী দেখেছ তা জেনে আমার দরকার নেই। দেখ হে; এতবড় একটা জাহাজ নিয়ে আমি
তো আর ঝিনুক কুড়াতে বেরোইনি যে, কোথায় কি পড়ে রয়েছে খুঁজে বেড়াব।
নাবিকরা ভয়ে ভয়ে বলল–তবু একটা লোক–
‘চুপ কর তোমরা! এরকম একটা রসিকতার মূল্য দিতে গিয়ে একটা জাহাজকে অহেতুক আটকে রাখতে আমি রাজি নই। আর যদি কেউ নেহাৎই চাপা পড়ে থাকে তার জন্য অবশ্যই আমি দায়ী নই, সম্পূর্ণ তার নিজের দোষ।
‘চোখের সামনে একটা লোক…’ তাদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ক্যাপ্টেন রীতিমত খেঁকিয়ে উঠলেন। কেউ যদি ডুবে যায়, মরে যায়–যদি আরও কিছু হয়, হোক গে, আমার কিছু করার নেই।
ক্যাপ্টেন যখন গো ধরেই রইলেন, নিজের বক্তব্য থেকে এতটুকুও সরে দাঁড়াতে রাজি হলেন না তখন নিতান্ত উপায়হীন হয়েই জাহাজের প্রথম মেট হেন্ডারস জেদ ধরলেন, প্রকৃত রহস্যটা না জানা পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে এক পা-ও নড়বেন না। জাহাজের নাবিকরাও তাকে সমর্থন করল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই জোট বেঁধে ফেলল।
প্রথম মেট হেন্ডারসন এবার আরও জোর পেলেন। তিনি ক্যাপ্টেনকে স্পষ্টভাষায় জা নিয়ে দিলেন–‘আপনার মধ্যে মানবিকতার লেশমাত্রও নেই। আপনার কথা ও কাজ চরম অমানবিকতার পরিচয় দিচ্ছে।
‘এতবড় কথা আপনি আমাকে বলতে পারলেন মি. হেন্ডারস!’
‘আপনার আচরণই আমাকে এরকম কথা বলতে বাধ্য করছে। আমার তো মনে হয় এর জন্য আপনাকে ফাঁসির দিলে দিলেও আপনার উপযুক্ত শাস্তি হবে না।
মেট হেন্ডারসন কিছুতেই ক্যাপ্টেনের হুকুম তামিল করতে রাজি হলেন না। এর জন্য মাটিতে পা দিতেই তার যদি মৃত্যুদণ্ডও হয় তবুও তিনি পিছপা হবেন না।
জাহাজের নাবিকরা তাঁর পাশে থাকায় তিনি ক্যাপ্টেন ইটিভি ব্লককে জোর করে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে নিজেই এক লাফে জাহাজের হালের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। শক্ত হাতে হাল ধরলেন।
মেট ব্লক এবার নাবিকদের অনুরোধের স্বরে নির্দেশ দিলেন ‘তোমরা নিজের নিজের কাজে যাও। এ-দিকটা আমি একাই সামলাতে পারব।’
নাবিকরা এগিয়ে গিয়ে যে যার কাজে হাত দিল। \সবার সমবেত চেষ্টায় বড় জাহাজটাকে এক পাশে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হল।
মাত্র মিনিট পাঁচেকের চেষ্টায় কাজটা সম্পূর্ণ হয়ে গেল। আর আশা করি পাঠকদের আর বলে দেওয়ার দরকার নেই যে, বড় জাহাজটার মেট মি. হেন্ডারসন আর নাবিকদের সহানুভূতির ফলস্বরূপ আমি আর অগাস্টাস নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে সেবারের মতো বেঁচে গেলাম।
উদ্ধার-কাৰ্যটার কথা যত সহজে বললাম আসলে কিন্তু এত সহজে সম্ভব হয়নি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে তবেই মেট মি. হেন্ডারসন এমন একটা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেন।
মি. হেন্ডারসন বড় জাহাজটাকে তার নিজের জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করে দুজন নাবিককে সঙ্গে নিয়ে ডিঙিটাকে পানিতে নামিয়ে দিলেন। এবার নিজে এক লাফে ডিঙিটায় নামলেন। আমি পেঙ্গুইনের তলায় একটা তামার পাতের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে লটকে ছিলাম। আমাকে এ অবস্থাতেই মি. হেন্ডারসন আবিষ্কার করলেন।
জাহাজটার একটা কাঠের টুকরো অর্ধেক ভেঙে গিয়েছিল। সেটা তামার পাতটাকে ভেদ করে বাইরের দিকে বেরিয়ে পড়ে। আমি বেকায়দায় পড়ে ভেসে যাওয়ার সময় কাঠের টুকরোর মাথাটা হঠাৎ আসার জ্যাকেটের কলারে ঢুকে যায়। ব্যস, আমি ঢেউয়ের মুখে পড়ে ভেসে যাওয়া থেকে বেঁচে গেলাম।
পেঙ্গুইনের নাবিকেরা বহু কসরৎ করে আমাকে তাদের জাহাজের ডেকে তুলে দিল। আমি তখন সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন ও মৃতপ্রায়। সবাই মিলে ধরাধরি করে আমাকে জাহাজের। কেবিনে নিয়ে গেল। আগেই বিছানা পাতাই ছিল। আমাকে সেখানে শুইয়ে দিল।
