ইতিমধ্যে আচমকা দমকা বাতাস শুরু হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত বাতাস পাওয়ায় পাল দুটো ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে গেছে। এরই ফলে আমাদের জাহাজটি ধ্বংসের দিকে উল্কার বেগে ছুটে চলেছে।
ঠিক সে মুহূর্তেই লক্ষ্য করলাম ভয়ঙ্কর একটা ঝড় আমাদের পিছন থেকে গর্জন করতে করতে ধেয়ে আসছে।
হায় ঈশ্বর! এখন উপায়। আমাদের সঙ্গে কম্পাসও নেই যে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে কিছুটা অন্তত ধারণা করতে পারব। আবার এক কণা খাবারও নেই যে, বিপদের সময় পিতৃদত্ত জীবনটাকে কোনোরকমে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারত।
বাতাস বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢেউয়ের বেগও অস্বাভাবিক বেড়ে গেল। সমুদ্র উত্তাল উদ্দাম হয়ে উঠল। ছোট্ট জাহাজটা একবার আকাশ ছোঁয়া ঢেউয়ের মাথায় উঠেই পর মুহূর্তেই আবার দুম্ করে আছাড় খেয়ে পড়ে যেতে লাগল। প্রতি মুহূর্তে শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে পড়ে।
আবার কোনো কোনো সময় বিপরীত কাণ্ড ঘটে যেতে লাগল। জাহাজের সম্মুখটা এক একবার ঢেউয়ের ভেতরে ঢুকে গিয়ে পর মুহূর্তেই আবার ঝট করে পানির ওপর ভেসে উঠতে লাগল।
এবার আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম। এমন একটা অদ্ভুত, অত্যাশ্চর্য ব্যাপার যে ঘটতে পারে তা যেন আমার কল্পনারও অতীত। ব্যাপারটা হচ্ছে, আমাদের জাহাজটা এবার আর বাতাসের অনুকূলে নয়, সম্পূর্ণ প্রতিকূলে, একেবারে বাতাসের বিপরীত মুখ দিয়ে ছুটে চলেছে। এমন অসম্ভব ব্যাপারের কথা কারো কাছে কেঁদেকেটে বললেও বিশ্বাস করবে না, করা সম্ভবও নয়। ভাগ্য ভালো যে, জাহাজটা এবার ঠিকঠাকই চলছে।
বাতাসের বেগ কিন্তু এতটুকুও কমে তোনি-ই বরং ক্রমেই বেড়ে চলেছে, আর সেই সঙ্গে বুক-কাঁপানো গর্জনও।
ঢেউ! ঢেউ! আর ঢেউ! একটার পিছনে আর একটা আকাশ-ছোঁয়া ঢেউ এসে আমাদের পুরোপুরি ভিজিয়ে দিতে লাগল। একটা ঢেউকে সামাল দিতে না দিতেই আর একটা ঢেউ এসে আমাদের ওপর আছাড় খেয়ে পড়তে লাগল।
আতঙ্ক! আর আতঙ্ক! প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হতে আমার হাত-পা শিথিল হয়ে পড়তে লাগল। পরিস্থিতি এমন হয়ে পড়তে লাগল যে, যে কোনো মুহূর্তে আমি সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়তে পারি।
উপায়ান্তর না দেখে দাঁতে দাঁত চেপে, প্রায় হামাগুড়ি দিতে দিতে বড় পালটার কাছে কোনোরকমে হাজির হলাম। সেটাকে নামিয়ে ফেললাম।
পালটার দড়িদড়া খোলার সময় যা আশঙ্কা করেছিলাম, কার্যত হলও ঠিক তাই। দড়ির বাঁধন আলগা হতেই সেটা ভিজে ভারী হয়ে যাওয়া পালটা গলুইটা ডিঙিয়ে হুড়মুড় করে মাস্তুলটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল।
সত্যি কথা বলতে কি সব শেষের দুর্ঘটনাটাই আমাকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল।
এবার হালটাকে হাতে তুলে নিয়ে আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।
আমার মনের কোণে এবার বেঁচে যাওয়ার একটা ক্ষীণ আশার সঞ্চার হল। হয়তো জীবনটা রক্ষা হলে হতেও পারে।
আমার বন্ধু অগাস্টাস তখন সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই এলিয়ে পড়ে রয়েছে।
জাহাজটা মোচার ভোলার মতো অনবরত দোল খেয়েই চলেছে। আমি পা টিপে টিপে অগাস্টাসের কাছে গেলাম। তাকে জাপটে ধরে কিছুটা তুলে প্রায় বসিয়ে দিলাম।
এবার একগাদা দড়ি তার কোমরের সঙ্গে বেঁধে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলাম।
এবার ভাগ্য ঠুকে নিজের কর্তব্য সম্পাদনে মন দিলাম। আমি হালটা মুঠো করে ধরতে না ধরতেই অকস্মাৎ হাজার খানেক দানব যেন একই সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল। সে কী গর্জন। আতঙ্কে আমার ফুসফুস স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল।
সে-মুহূর্তে আকস্মিক আতঙ্কের তীব্র যন্ত্রণা আমার সর্বাঙ্গ যেমন শিথিল করে দিচ্ছিল তা আমৃত্যু আমার স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে থাকবে। পরিস্থিতি এমন খারাপ হয়ে পড়ল যে, মনে হলো আমার শরীরের সব রক্ত বুঝি জমাট বেঁধে যাচ্ছে, আর আমার, চুল সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে পড়ছে। হৃদপিণ্ডও বুঝি বা কুঁকড়ে দুমড়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
চোখ মেলে তাকানোর মতো মনের জোরও আমি হারিয়ে ফেলেছি। চোখ দুটো বন্ধ রেখেই আমি সংজ্ঞা হারিয়ে বন্ধুর এলিয়ে-পড়া দেহটার ওপর শুয়ে পড়লাম। এতে তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া হলো তা বোঝার মতো হুঁসও আমার রইল না।
আমার যখন সংজ্ঞা ফিরে এলো তখন চোখ মেলে তাকিয়েই আমি রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। হায়! আমি কোথায়, বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। বুঝলাম, আমি তিমি-শিকারের জাহাজের কেবিনে একটি চৌপায়ার ওপর শুয়ে। আরও বুঝতে পারলাম, জাহাজটার নাম ‘পেঙ্গুইন’।
আমার চারদিকে অনেক লোক দাঁড়িয়ে। কেউ বা ঝুঁকে আমার পরিস্থিতির ওপর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে নজর রেখে চলেছে। আর অগাস্টাস শিয়রে বসে আমার হাতদুটোকে পর্যায়ক্রমে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনবরত ঘষে ঘষে গরম করার চেষ্টা করে চলেছে। আমার সংজ্ঞা ফিরে আসতেই, চোখ মেলে তাকানোমাত্র সে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে রীতিমত লাফালাফি জুড়ে দিল।
বন্ধু অগাস্টাসের রকম সকম দেখে জাহাজের বিদঘুঁটে দর্শণী লোকগুলো কেউ হাসাহাসি শুরু করে দিল, আবার কেউ বা নীরবে চোখের পানি ঝরাতে লাগল। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আমাদের প্রাণে বেঁচে যাওয়ার, ও তখন অবধি বেঁচে থাকার কারণটা এবার আমার কাছে খোলসা হয়ে গেল।
তিমি শিকারের জাহাজটার ক্যাপ্টেন পালের টানে দ্রুতগতিতে ন্যান্টাকেট যাবার সময় বুঝতে না পেরে আমাদের ছোট জাহাজটাকে আচমকা ধাক্কা মারেন।
