অজ্ঞতার জন্য জাহাজ চালানোর ব্যাপারে, জাহাজ চালানোর কাজে আমাকে বন্ধুর ওপরই সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে থাকতে হল।
হঠাৎ কেন যেন বাতাসের বেগ বেড়ে গেল। প্রায় দমকা বাতাস শুরু হয়ে গেল। আমাদের জাহাজের পালে বাতাস লাগায় মাটির সঙ্গে আমাদের দূরত্ব ক্রমেই বাড়তে লাগল। আমরা ক্রমেই পাড় থেকে দূরে চলে যেতে লাগলাম।
আমাদের জাহাজটা গভীর সমুদ্রের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকলেও আমার মধ্যে যাতে কোনোরকম ভয়ের লক্ষণ প্রকাশ না পায় সেদিকে আমাকে সতর্কতা অবলম্বন করতেই হল। নিজেকে ভীত-সন্ত্রস্ত বলে পরিচয় দিতে আমি খুব লজ্জা পেলাম।
প্রায় আধা ঘণ্টা সময় মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে আমি পাথরের মূর্তির মতো নির্বাক-নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম। সামান্য নড়তে-চড়তেও ভরসা হলো না। আমি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করলে কি হবে, বেশিক্ষণ আমার পক্ষে চুপ করে বসে থাকা সম্ভব হলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে বন্ধুর দিকে তাকালাম। ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারণ করলাম– ‘অগাস্টাস একটা কথা–‘
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই অগাস্টাস ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল–কথা? কী–কী কথা?
আমি আগের মতোই ক্ষীণকণ্ঠেই এবারও বললাম আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, এবার ফিরে গেলেই ভালো হয়। সে আগের মতোই মিনিটখানেক মৌন হয়েই রইল। কেবলমাত্র মুহূর্তের জন্য নীরব চাহনি মেলে আমার মুখের দিকে তাকাল। পরমূহুর্তেই আবার ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তাল জলরাশির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।
আমি একটু বেশ অধীরভাবেই এবার বললাম–কী? চুপ করে রইলে যে বড়? আমি বলছি, এখন ফিরে গেলেই ভালো হত নাকি?’
এবার সে আর মুখ বুজে থাকতে পারল না। তবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আমাকে লক্ষ্য করে কথাটা ছুঁড়ে দিল–‘আরে, এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, বল তো? বাড়ি তো যাবই। তবে বাড়ি ফেরার মতো প্রচুর সময়ই আছে। মাথা ঠাণ্ডা রাখ। সময় হচ্ছে অবশ্যই
তার কথা শেষ হবার আগেই আমার ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তবে এও মিথ্যা নয় যে, তার দিক থেকে এরকমই জবাবই পাওয়া যাবে, আমি আশা করেছিলাম। কার্যত হলও তা-ই। তবে তার কণ্ঠস্বরে এমন একটা সুর আমার কানে বাজল যাতে তার বুকের জমাটবাধা আতঙ্কই প্রকাশ পেল। তার কণ্ঠস্বর আমার কানে যেতেই মনটা অস্বাভাবিক বিষিয়ে উঠল।
তার দিকে আবার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালাম। লক্ষ্য করলাম, তার ঠোঁট দুটো রক্তশূন্য–ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আর হাঁটু দুটো এত কাঁপছে যে, তার পক্ষে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।
বন্ধুর বেহাল অবস্থা দেখে আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। গলা। দিয়ে ভয়ার্ত স্বর বেরিয়ে এলো–‘অগাস্টাস, ঈশ্বরের দোহাই, আমার কাছে গোপন কোরো না; তোমার কী সমস্যা আমাকে খোলসা করে বল? কি তোমার কষ্ট
আমি কথাটা শেষ করার আগেই সে কোনোরকমে উচ্চারণ করল–হুম!’
আমি কণ্ঠস্বরে অধিকতর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বললাম–তোমার ব্যাপার স্যাপার তো কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না! ব্যাপারটা কী বল তো?
‘ব্যাপার কিছুই না।
‘আমার কাছে তুমি গোপন করছ। কিছু না কিছু তো ঘটেছেই। তুমি যেন অস্বাভাবিক কিছু একটা করতে চলেছ। কী? হয়েছে কি, খোলসা করে বল?
‘কি আবার হবে?’ বললামই এমন কোনো ব্যাপারই ঘটেনি যে–‘
‘কিচ্ছু না?
‘না, কিছুই না। বাড়ি চলেছি। তুমি বুঝতে পারছ না, আমরা বাড়ি ফিরছি?
এতক্ষণে আসল ব্যাপারটা আমার কাছে খোলসা হল। আমি এক লাফে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেললাম। টানাটানি করে তুলে নিলাম। মদের নেশায় সে এক্কেবারে পুঁদ হয়ে পড়েছে, তাই জ্ঞান প্রায় খুইয়ে বসেছে; দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তিটুকুও তার মধ্য থেকে লোপ পেয়েছে। এমনকি কথা বলার মতো সামান্যতম ক্ষমতাও তার নেই। আর চোখেও দেখতে পাচ্ছে না কিছু। চোখের মনি দুটো দিয়ে যেন ঠিকরে আলোকচ্ছটা বেরিয়ে আসছে।
আমি কর্তব্য ঠিক করার আগেই আমাকে একেবারে হতাশ করে দিয়ে জাহাজের খোলে জমে থাকা পানিতে একটা মূলহীন গাছের গুঁড়ির মতো দুম্ করে পড়ে গেল। আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু পুরোপুরি ব্যর্থ হলাম।
ব্যাপারটা আমার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। সন্ধ্যায় আমি যতখানি অনুমান করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক-অনেক বেশি পরিমাণে মদ সে গলায় ঢেলেছে। তাই সে নেশায় পাঁড় মাতাল হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়েছিল। আর সে সঙ্গে রাতের পানিবাহিত হিমেল বাতাসের ক্রিয়া তো রয়েছেই। এখন সে নেশায় পুরোপুরি বুঁদ হয়ে পড়েছে। আগামী ঘণ্টা কয়েক সে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই থাকবে। বাহ্যিক ক্ষমতা ফিরে পেতে সময় লাগবে।
আমার আকস্মিক ভীতিটা ক্রমে বাড়তে বাড়তে তুঙ্গে উঠতে লাগল। সত্যি কথা বলতে কি, আমার তখনকার মানসিক পরিস্থিতির কথা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ আগে যে মদটুকু আমি গলা দিয়ে ঢুকিয়েছিলাম তার কাজ অনেকাংশে হালকা হয়ে গেছে। নিজেকে সামলে নিতে পেরেছি। তাই বন্ধু অগাস্টাসের এই পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে ভাবনা-চিন্তা করার মতো আমার শরীর ও মন দুইই স্বাভাবিক ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এক অবর্ণনীয় অস্থিরতা আমাকে পেয়ে বসল।
আর যা-ই হোক, আমার নিজের হিম্মৎ সম্বন্ধে আমি তো আর অজ্ঞ নই। জাহাজ চালাবার ক্ষমতা আমার নেই। এ-কাজে আমি একেবারেই অপারগ।
