যা-ই হোক, আমি আর অগাস্টাস উভয়েই নেশার ঘোরে কুঁদ হয়ে বিছানা আঁকড়ে পড়ে রইলাম। সে তার প্রিয় বিষয়টা সম্বন্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। আধা ঘণ্টা আমরা পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে পড়ে রইলাম।
আমার চোখের পাতা দুটো সবে ঘুমে বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল। অগাস্টাস হঠাৎ ভয়ঙ্কর একটা শপথ করে বলে উঠল–বুঝতে পারছ, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে কেমন মিষ্টি মধুর ঝিরঝিরে বাতাস বইছে?
আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম–হুম।
সে এবার বলল–‘আমার সাফ কথা শোন, খ্রিস্টিয় রাজ্যের কে এক আর্থার পাম-এর খাতিরে এমন অভাবনীয় মনোরম একটা মুহূর্ত আমি ঘুমিয়ে বরবাদ করে দিতে পারব না।
তার কথা শুনে আমি হতচকিত হয়ে চোখ মেলে তাকালাম। অকল্পিত বিস্ময়ে আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলার জোগাড় হলাম।
তার দিক থেকে সে মুহূর্তে আর কোনো কথাই শুনলাম না।
আমি তার কথাটাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দিলাম। আসলে তার বক্তব্যটাই তো আমার বোধগুম্য হলো না। আমি নিঃসন্দেহ হলাম, মদের নেশায় সে জ্ঞান-বুদ্ধি খুইয়ে বসেছে। আমিও তাকে না ঘাঁটিয়ে মুখ বুজেই রইলাম।
আমার দিক থেকে কোনো সাড়া না পেলে কি হবে, সে কিন্তু বেশিক্ষণনির্বাক থাকতে পারল না। মিনিট খানেকের মধ্যেই ধীর-স্থিরভাবে, খুবই শান্তস্বরেই কথা বলতে লাগল।
অগাস্টাস ভালোই জানে যে, আমি ধরেই নিয়েছি সে নেশায় একেবারে কুঁদ হয়ে গেছে। আসলে কিন্তু জীবনে কোনোদিনই সে এমন সুস্থ-স্বাভাবিক থাকেনি। সে আরও বলল–এমন একটা মায়া-কাজল মাখানো মধুর রাত একটা কুকুরের বিছানা আঁকড়ে, কুঁকড়ে শুয়ে কাটিয়ে দিতে নারাজ। কিছুতেই পারব না।’
সে এবার যা বলল তার তাৎপর্য হচ্ছে, বিছানা ছেড়ে উঠে পোশাক পরিচ্ছদ গায়ে চাপিয়ে সে সাধের জাহাজটায় চেপে মজা লুটতে বেরিয়ে পড়বে।
আমার কাঁধে যে কি ভর করেছিল, বলতে পারব না। তার মুখ থেকে প্রস্তাবটা শোনামাত্র আমার মন-প্রাণ আকস্মিক রোমাঞ্চে ভরপুর হয়ে গেল।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো পাশ ফিরে তার মুখোমুখি শুলাম। তার এ মুহূর্তে খামখেয়ালি, পাগলামিকেই পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দদায়ক ব্যাপার বলে মনে হল। আর অবশ্যই যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে করতেও দ্বিধা করলাম না।
ইতিমধ্যে ঝড় শুরু হয়েছে। ঘরের বাইরের ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। মাত্রাতিরিক্ত ঠাণ্ডা পড়েছে।
অক্টোবর মাস শেষ হতে চলেছে। অতএব এ-সময়ে অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা পড়েছে। যাকে বলে ঠাণ্ডাটা রীতিমত জাঁকিয়েই পড়েছে। তা সত্ত্বেও আমি এক লাফে উঠে বিছানায় বসে পড়লাম। আসলে আমিও তো নিজেকে বন্ধুবর অগাস্টাসের তুলনায় কম সাহসি মনে করি না। আমিও কুকুরের মতো বিছানায় শুয়ে শুয়ে এমন মধুর রাতটা কাটিয়ে দিতে রাজি নই, কিছুতেই না। তা ছাড়া ন্যান্টকেটের বাসিন্দা অগাস্টাস বার্নাডের মতোই আমিও যে কোনোরকম মজা লুটতে কম উৎসাহি নই। তাই আমিও মনের দিক থেকে তৈরি হয়ে পড়লাম।
মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে আমি কষ্ট করে বিছানায় উঠে বসে পড়লাম। তারপরই এক লাফে বিছানা থেকে লাফিয়ে খাট থেকে নেমেই জাহাজের খোঁজে দৌড়ে গেলাম। জাহাজটা বাধা ছিল কাঠের বড় বড় গুঁড়ির ধারে, প্যাংকি অ্যান্ড কোম্পানির গুদামের গায়ে নোঙর করা।
অগাস্টাসও আমার পিছন পিছন উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে জাহাজটার গায়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে এক লাফে জাহাজে উঠে গেল। ব্যস্ত হাতে তার খোলের সব পানি সেঁচতে আরম্ভ করে দিল।
এবার আমরা দুজনে টানাটানি করে বড় পাল আর তিন কোণা পালটা টাঙিয়ে ফেললাম। অগাস্টাস জাহাজটার ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে হাল ধরল, আর মাস্তুলটার গা ঘেঁষে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।
আমি তো আগেই বলেছি, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণাকুণি থেকে বাতাস বইছে। আর আকাশ পরিষ্কার ও ঠাণ্ডা। আমাদের জাহাজটা বাতাসের কাঁধে ভর করে তরতর করে এগিয়ে চলল। জাহাজটা ঘাট ছেড়ে আসার পর থেকে আমি বা অগাস্টাস কেউ-ই মুখ খুলিনি, টু শব্দটিও করিনি।
আমিই প্রথমে নীরবতা ভঙ্গ করলাম। মাস্তুলটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েই অমি সঙ্গি অগাস্টাসকে জিজ্ঞেস করলাম–কী হে, জাহাজটাকে তুমি কোন পথে নিয়ে যেতে চাইছ, জানতে পারি কী?
অগাস্টাস আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আমি এবার বললাম ‘অন্তত একটা কথার জবাব দাও, আমরা কবে ফিরতে পারব বলে তুমি মনে করছ?
সে অন্যমনস্কভাবে আরও কয়েক মিনিট ধরে শিস দিতে দিতে এক সময় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল–‘সবে তো রওনা দিয়েছি, এখনই ফেরার চিন্তা?
‘তবু তো জানা দরকার?’
‘আমি সমুদ্রে চলেছি।‘
‘সমুদ্রে! আমরা সমুদ্রে চলেছি!’
‘হ্যাঁ, সমুদ্রে! তোমার আপত্তি থাকলে এখনও সময় আছে, ইচ্ছে করলে তুমি বাড়ি ফিরে যেতে পার। সাফ কথা, এখনও সময় আছে, ভালো না লাগলে ফিরে যাও।’
আমি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম। তার মুখে বে-পরোয়ার ছাপ ফুটে উঠলেও তাকে রীতিমত উত্তেজিতই দেখলাম।
আমি আরও লক্ষ্য করলাম, তার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপছে। এমনকি দুহাতে মুঠো করে ধরে রাখা হালটাকে আর আঁকড়ে রাখতে পারছে না। কোনো-না-কোনো একটা গোলমাল যে হয়েছে এটা বুঝতে আমার দেরি হলো না। তখন জাহাজ চালানোর ব্যাপার-স্যাপার সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা থাকা তো দূরের ব্যাপার সামান্যতম ধারনাও ছিল না।
