আর পাঠকদের মধ্যে যারা কোনোদিন ‘ম্যাসেঞ্জার’ পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ পাননি তাঁদেরও ব্যাপারটা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করার তাগিদেই কোন অবধি তিনি লিখেছেন আর আমার লেখার শুরু হয়েছে ব্যক্ত করেছি। সত্যি কথা বলতে কি, লেখার কায়দা কৌশলের পার্থক্যটা সহজেই ধরা যাবে। অতএব এবার স্বীকার করতেই হয়, এরও দরকার রয়েছে।
এ জি পাম
নিউ ইয়র্ক জুলাই, ১৮৩৮
.
০১. ॥ প্রথম অধ্যায় ॥
আমি এবার নিজের নামটা খোলাখুলিই বলছি–আর্থার গর্ডন পাম আমার নাম।
আমার বাবা ছিলেন একজন নামকরা ব্যবসায়ী। ন্যান্টাকেটের জাহাজি মালপত্রের একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি ও সম্মান লাভ করেছিলেন। আমার জন্মও নান্টাকেটেই হয়েছিল। আমার মাতামহ একজন কৃতী এটর্নি ছিলেন। এ ব্যবসায়ে তিনি মালকড়ি ভালোই কামাতেন। শুধুমাত্র অর্থকড়ির দিক থেকেই নয়, সব দিক থেকেই তার ভাগ্য ছিল খুবই ভালো।
এড গন-নিউ ব্যাংকের কোম্পানির কাগজের কারবার করতে গিয়ে সে আমলে তিনি খুবই সাফল্যলাভ করেছিলেন। এ কারবার তো ছিলই, এছাড়া আরও বিভিন্নভাবে তিনি প্রচুর অর্থকড়ি কামিয়েছিলেন, জমিয়ে ছিলেনও কম নয়।
সারা পৃথিবীতে আপনজন বলতে যে ক’জন আছে তাদের মধ্যে আমিই তার সবচেয়ে বেশি প্রিয়পাত্র ছিলাম, অন্তত আমার বিশ্বাস। এ কথা বিবেচনা করেই আমার প্রত্যাশা ছিল, তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির একটা বড় ভগ্নাংশের উত্তরাধিকারী হব।
আমার যখন ছয়বছর বয়স তখন তিনি আমাকে বৃদ্ধ রিকেটসের বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন।
বৃদ্ধ রিকেটসের একটামাত্র হাত ছিল। তার কথাবার্তা আর চলনবলনে খামখেয়ালি খুবই বেশি মাত্রায় প্রকাশ পেত।
যারা নিউ বেডফোর্ডে গেছে তারা সবাই খুব ভালোভাবেই তাকে চেনে।
আমি তার বিদ্যালয়ে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত পাঠাভ্যাস করি, সেখানকার পাঠ মিটিয়ে মি. ই রোনাল্ডের শিক্ষা নিকেতনে ভর্তি হই। তাঁর প্রতিষ্ঠানটা পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত ছিল।
মি. ই রোনাল্ড-এর শিক্ষায়তনে পড়াশোনা করার সময় নৌ অধিনায়ক মি. বার্নাডের ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। আর আমাদের সে বন্ধুত্ব ক্রমে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে থাকে।
মি বার্নাড তখন লয়েড অ্যান্ড ড্রেডেনবুর্গের কর্মী ছিলেন। বেডফোর্ডের সবাই মি. বানার্ডকে চেনেন। এ ছাড়া এডগার্টনেও তার বহু আত্মীয়স্বজন বাস করত।
মি. বার্নাডের ছেলের নাম ছিল অগাস্টাস। সে বয়সে আমার চেয়ে দুবছরের বড় ছিল।
অগাস্টাস একবার তার বাবার সঙ্গে জন ডোনাল্ডসন জাহাজে চেপে উত্তাল সমুদ্রে তিমি শিকার করতে গিয়েছিল। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে তখন তাকে বহুদিন কাটাতে হয়। তাই সে প্রায়ই আমাকে দক্ষিণ মহাসাগরের বিভিন্ন অভিযানের গল্প রসিয়ে রসিয়ে শোনাত।
মাঝে মধ্যে আমাকে সে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত। সারাদিন উভয়ে গল্পগুজব করেই কাটিয়ে দিতাম। কোনো কোনোদিন তাদের বাড়িতে রাতও কাটাতাম। আমরা একই বিছানায়, পাশাপাশি শুতাম।
রাতে বিছানায় শুয়ে সে টিনিয়ার দ্বীপ এবং অভিযান করতে গিয়ে আর যেসব দেশের মাটিতে সে নেমেছে, ঘোরাফেরা করেছে সে সব দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার কথা রীতিমত রসিয়ে রসিয়ে শোনাত। সারা রাত আমাকে সে জাগিয়ে রাখত। আমি কিন্তু এতে রীতিমত উৎসাহই পেতাম।
এভাবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তার মুখে সমুদ্র-অভিযানের গল্প শুনে শুনে সমুদ্র সম্বন্ধে আমার মনে উৎসাহ উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। আর এরই ফলে আমার মনে সমুদ্রযাত্রা সম্বন্ধে আগ্রহ জন্মাল। আর তা ক্রমে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠল। আমার নিজের একটা জাহাজ ছিল–পালতোলা জাহাজ। আমি সেটার নামকরণ করেছিলাম ‘এরিয়েল’।
নগদ পঁচাত্তর ডলারের বিনিময়ে আমি সাধের ময়ুরপঙ্খী এরিয়েলকে খরিদ করেছিলাম। তাতে ছোট্ট একটা ছাউনির ঘরও ছিল।
আমার জাহাজটা যে কত টন বহনযোগ্য ছিল আজ আর তা মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে, দশজন যাত্রী অনায়াসেই তাতে যাতায়াত করতে পারত।
আমার সে জাহাজ এরিয়েলে চেপে আমরা পাগলের মতো কত কাণ্ডই যে করতাম। তা বলে শেষ করা যাবে না। এখন আমি সে সময়কার দিনগুলোর কথা ভাবতে বসলে যারপরনাই অবাক হই, আমি কি করে আজও বেঁচে, বহাল তবিয়তে আছি।
আমার তখনকার অভিযানগুলোর মধ্যে থেকে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের বিবরণ এখানে উল্লেখ করার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না।
উল্লেখযোগ্য সে ঘটনাটা হচ্ছে–সেটা ছিল এক রাতের ঘটনা। সে-রাতে মি. বার্নাডের বাড়িতে একটা ভোজসভার আয়োজন হয়েছিল। আমি আর বন্ধুবর অগাস্টাস সে-নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে সেখানে গিয়েছিলাম।
গলা অবধি দামি মদ গিলে আমি আর অগাস্টাস উভয়েই পাড় মাতাল হয়ে পড়েছিলাম। নেশার ঘোরে বাহ্যিক বোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলাম। মদের নেশা চেপে গেলে অধিকাংশ মানুষ যা করে থাকে আমিও শেষপর্যন্ত তা-ই করলাম। বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত বাতিল করে অগাস্টাসের বাড়ি চলে গেলাম। তার বিছানাতেই শুয়ে পড়লাম। সেও নীরবে আমার পাশে শুয়ে পড়ল।
প্রায় একটা নাগাদ পার্টি ভেঙেছিল। তারপর শোয়া। শুতে শুতে কত রাত হয়ে গিয়েছিল সহজেই অনুমান করতে পারছেন।
