অভিযানের বিবরণী লেখার ব্যাপারে আমার অনীহার দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে– বিবরণীতে যে সব ঘটনার উল্লেখ করতে হবে সেগুলো এতই অত্যাশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্য যে কোনো রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কেবলমাত্র আমার গণ্ডির মধ্যে যারা আছেন, আর আমার বন্ধুজনরাই তাতে আস্থাভাজন হবেন এটুকুই ভরসা করতে পারি। আর অন্যান্যরা সবাই আমার বিবৃতিকে আষাঢ়ে গল্প বলেই উড়িয়ে দেবে। সবাই ধরে নেবে, আমি কাল্পনিক উপন্যাস ফাঁদতে বসেছি। তবে সাক্ষ্য প্রমাণের কথা যা বললাম তাতে মাত্র একজন দো-আঁসলা আদিবাসীর সাক্ষ্য আমার হাতে আছে। ব্যস, এটুকুই। কিন্তু এ-তো মোটেই যথেষ্ট নয়। তাই তো বিবরণী লেখার ব্যাপারে আমার যথেষ্ট ওজর আপত্তি। তবুও আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধুবান্ধবদের পরামর্শ মেনে নিয়ে তাদের অনুরোধ যে আমি রক্ষা করতে পারিনি তার সবচেয়ে বড় কারণটা হচ্ছে–লেখক হিসেবে আমার নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে আস্থার অভাব। এ কাজটা যে আমি যথাযথভাবে সেরে উঠতে পারবই এ বিশ্বাসটুকুর অভাববশতই কাজটা সম্বন্ধে আমি মনের দিক থেকে এতটুকুও উৎসাহ পাচ্ছিলাম না।
আমার অভিযানের বিবরণ, বিশেষ করে বিবরণের যে স্থানে দক্ষিণ মেরু সমুদ্র সম্বন্ধে বক্তব্য রয়েছে এ-বিষয়ে জানার জন্য ভার্জিনিয়ায় যেসব অত্যুৎসাহী ভদ্রলোক রয়েছেন তাঁদের একজনের নাম টমাস ডাব্লু হোয়াইট। বর্তমানে তিনি রিচমন্ড শহরের অধিবাসী। আর তিনি সেখানকার মাসিক পত্রিকা ‘সার্দান লিটারেরি ম্যাসেঞ্জার’-এর সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। আর তিনি এ কাজে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয়ও দিয়েছেন, সন্দেহ নেই।
অন্য সব অত্যুৎসাহীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তিনি যারপরনাই দৃঢ়তার সঙ্গে আমাকে বলেছেন–অভিযানে বেরোবার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি যা-কিছু চাক্ষুষ করেছি আর যেসব ঘটনার সঙ্গে নিজেকে লিপ্ত করেছি সবকিছু যেন বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করে ফেলি। আর এও বলেছেন, আমি যেন জনগণের প্রখর বুদ্ধি-বিবেচনার ওপর আস্থা রাখি। তবে তিনি কিন্তু আমাকে আশা ভরসা কম দিলেন না। তিনি খোলাখুলিই বললেন–আমার অভিযানসংক্রান্ত বইটার ছাপা আর বাঁধাই যত নিকৃষ্টমানের হোক না কেন–শেষপর্যন্ত যদি তাই হয়, তবু তা সত্য ঘটনা প্রকাশের সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে উঠবে। আর এ বইটার জন্য যে আমার নাম ডাক যথেষ্টই হবে তাতে তিলমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, তাদের কাছ আশাতিরিক্ত আশা ভরসা পাওয়ার পরও কিন্তু আমি ব্যাপারটা সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। কেমন যেন একটা অব্যক্ত দ্বিধা আমাকে কাজটা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করল। আমি হাল ছেড়ে না দিয়ে পারলাম না।
ব্যাপারটা সম্বন্ধে আমার দিক থেকে উৎসাহের লক্ষণ দেখতে না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনিই প্রস্তাব করলেন–আমার অভিযানের প্রথম পর্যায়–আমার পরিবেশিত তথ্য অনুসারেই, তার নিজের ভাষায় লিখে, উপন্যাসের রূপদান করে বহুল প্রচারিত ‘সার্দান লিটারেরি ম্যাসেঞ্জার’-এ ছাপতে পারেন, তার অনুমতি আমি তাঁকে দিই।
আমি তার প্রস্তাবটাকে সহানুভূতির সঙ্গে বিচার বিবেচনা করলাম।
ভেবে দেখলাম, তার প্রস্তাবটা অবশ্যই সাধুবাদ জানানোর উপযোগি। আর এতে আমাকে যখন কোনো ঝুঁকি নিতে হবে না তখন লাভ ছাড়া লোকসানের প্রশ্নই ওঠে না।
আমি সানন্দে আমার অভিযানের বিবরণী প্রকাশের সম্মতি দিয়ে দিলাম। তবে আপত্তির এটুকুই থাকতে পারে, বিবরণীটার গায়ে উপন্যাসের পোশাক-আশাক পরিয়ে তাকে কেতাদুরস্ত করতে হবে। তা হোক গে, আপত্তি কীসের?
কথা প্রসঙ্গে তার কাছে আমি একটা শর্ত আরোপ করলাম, আমার অভিযান সম্বন্ধে যা-ই ছাপা হোক না কেন, তাতে আমার আসল নাম ব্যবহার করতে হবে। তিনি আমার শর্ত মেনে নিলেন।
‘ম্যাসেঞ্জার’ পত্রিকার ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ছদ্মবেশ পরিহিত উপন্যাসটার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব ছাপা হল। আর লেখাটাকে যাতে অবশ্যই উপন্যাস জ্ঞান করা হয় সে দিকে লক্ষ্য রেখে সূচিপত্রে মি. পো-র নামটাই ছাপা হল। অতএব শর্ত ভঙ্গ হলো না। আমারও আপত্তি বা কোনোরকম অভিযোগের প্রশ্নই ওঠে না।
আমার পাঠকরা এ-প্রবঞ্চনাকে কিভাবে নিলেন তাতেই উৎসাহিত হয়ে পূর্বকথিত অভিযান-কাহিনিকে প্রকাশনার ব্যবস্থা করছি। এরও কারণ অবশ্যই আছে। আমি লক্ষ্য করে এটুকুই উপলব্ধি করেছি আমার অভিযান-বিবরণীর যে অংশটুকু ম্যাসেঞ্জার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাতে উপকথার প্রলেপ বুলিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও পাঠকরা কিন্তু তাকে উপকথার পর্যায়ে ফেলেনি। উপরন্তু মি. পি কে লেখা যে কয়েকটা চিঠি পাওয়া গিয়েছে তার বক্তব্য এর বিপরীত মন্তব্যই প্রকটভাবে লক্ষিত হয়েছে।
তাই আমি চিন্তা ভাবনা করে এ সিদ্ধান্তই গ্রহণ করলাম যে, আমার অভিযানের বিবরণে যে সব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো নিজেরাই তাদের সত্যতার যথেষ্ট নজির। অতএব জনগণের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গুরুত্ব দেওয়ার কোনো যুক্তিই নেই। এমনকি তারা যদি ব্যাপারটাকে অবিশ্বাস করে তবুও ভয়ের কোনো কারণই নেই।
অতএব আমার এরকম সরাসরি স্বীকারোক্তি থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে যে এ বিবরণীর কতখানি আমার নিজের বক্তব্য আর কতখানিই বা খাদ মেশানো, রং চড়ানো হয়েছে, আর এও ধরা যাবে, মি. পো গোড়ার দিককার যে কয়েকটা লেখা লিখেছেন তাতেও কোনো ঘটনাকে বাড়িয়ে-কমিয়ে লেখা হয়নি।
