টবি, দৌড়াবার নির্দেশ পাওয়ামাত্র দৌড় শুরু করল। আর দৌড়ানো আরম্ভ করার পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যেই সে সজোরে এক লাফ দিল।
আমি স্পষ্টই দেখতে পেলাম অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটাই আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। হ্যাঁ, দেখতে পেলাম, টবি স্বাভাবিকভাবেই দৌড়ে গেল। সেতুটার ওপর থেকে ভালোভাবেই লাফ দিল। পাখি যেমন বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে শূন্যে উড়তে থাকে ঠিক সে রকম ওড়ার ভঙ্গিতেই শূন্যে পা দুটো অনবরত নাড়তে লাগল। আরও লক্ষ্য করলাম, অদ্ভুত ভঙ্গিতে বাতাসে ভর করে সে উড়তে উড়তে বহু উঁচুতে উঠে গেল। ক্রমে উঠতে উঠতে সে একেবারে ঘোরানো দরজাটার মাথার ওপর উঠে গেল। কিন্তু সে আর কতক্ষণ? চোখের পলক পড়তে না পড়তেই টবি সোজা নিচে নামতে না নামতেই ঘোরানো দরজাটার মাথার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
আমি টবির ওপরেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলাম। দেখলাম, সে অদ্ভুত ধরনের ঘোরানো দরজাটার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ামাত্র মিলানের অন্ধকার পরিবেশ থেকে কি যেন একটা বস্তু আচমকা তার এপ্রণের ওপর পড়ল। ব্যস, মুহূর্তমাত্র দেরি না করে সেটাকে অ্যাপ্রোণের ভেতর ঢুকিয়ে হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। তারপরই সে লম্বা লম্বা পায়ে ছুটতে আরম্ভ করল।
ব্যাপার দেখে আমার তো চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবার জোগাড় হল। বাশক্তি হারিয়ে ফেলার উপক্রম। কোনোকিছু ভাববার মতো ক্ষমতাও আমি হারিয়ে বসলাম আর সে সময়ও আমার নেই। টবি কিন্তু তখনও নিশ্চল-নিথরভাবে পড়ে রয়েছে। এই মুহূর্তেই তাকে সাহায্য করা দরকার। অন্যথায় যে কোনো মুহূর্তে কোনো একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে।
আমি আর মুহূর্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে ব্যস্ত পায়ে টবির কাছে হাজির হলাম।
আগেই আমি অনুমান করেছিলাম, তার চোটটা বড় রকমই লেগেছে। কাছে ছুটে গিয়ে দেখলামও তাই। আসলে তার মাথাটাই বেপাড়া হয়ে গেছে, কোথায় যেন পড়ে গেছে।
আমি হন্যে হয়ে টবির মাথাটা খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজিতেও সেটার পাত্তা মিলল না। কোথায় যেন সেটা হারিয়ে গেছে।
কিন্তু আমাকে তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। এর একটা সমাধান করতেই হবে। মনস্থির করে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম–টবিকে বাড়িতে নিয়ে এসে কোনো একজন হোমিওপ্যাথের শরণাপন্ন হব। অকস্মাৎ একটা মতলব মাথায় খেলে গেল। ব্যস, যা ভাবলাম, কার্যতও তা-ই করলাম। সেতুর একটা জানালা দুম্ করে খুলে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যেই করুণ সত্যটা আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
আরও দেখলাম, ঘোরানো দরজাটার প্রায় ফুট পাঁচেক ওপরে দুটো চওড়া লোহার পাত আড়াআড়িভাবে স্থাপন করে দুটো পাতের সংযোগ সাধন করা হয়েছে।
এবার ব্যাপারটা আমার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল, দরজাটার মাথার ওপর থেকে লাফ দেওয়ামাত্র আমার বন্ধুবর টবির গলাটা সোজা গিয়ে সে পাতলা ও প্রায় মসৃণ লোহার পাতের ওপর পড়ে। ব্যস, এতেই যা ঘটার তা ঘটে গেল।
না, তাকে কিছুতেই রক্ষা করা গেল না। সব প্রয়াসই মর্মান্তিকভাবে ব্যর্থ হল। হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকও চেষ্টার কোনো ত্রুটিই করেননি। কার্যত ফায়দা কিছুই হলো না। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়ে পড়তে লাগল। অন্তিম সময় আগত প্রায়।
এ ঘটনায় একটাই কাজের কাজ হল। যারা অতিমাত্রায় আনন্দপ্রিয়, হৈ হুল্লোড়ের মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করতে চায় তারা এ থেকে একটা শিক্ষা লাভ করল।
তাকে সমাহিত করা হল। আমি দীর্ঘসময় ধরে চোখের পানি ফেলে তার সমাধির মাটিকে ভিজিয়ে দিলাম। অভিন্ন হৃদয় বন্ধুর প্রতি আমার এটা কর্তব্য মনে করেই আমি সহজে তার সমাধিক্ষেত্র ছেড়ে চলে আসতে পারিনি। বাধ্য হয়ে ভারাক্রান্ত মনে সেখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে নিতে বাধ্য হলাম ।
টবির মৃতদেহের সকারের জন্য সামান্য কিছু যা খরচাপাতি হয়েছিল তার বিলটা উপযুক্ত সংস্থায় দাখিল করলাম। কিন্তু হতচ্ছাড়ারা দেয় টাকা মিটিয়ে দিতে সম্মত হলো না। উপায়ান্তর না দেখে আবার কবরটা খুঁড়ে টবির মৃতদেহটাকে তুলে। আনলাম। সেটাকে কুকুরের খাদ্য হিসেবে বিক্রি করে দিয়ে ব্যাপারটারনিষ্পত্তি করলাম।
ন্যারেটিভ আর্থার গর্ডন পাম – ০১ (উপন্যাস)
ন্যারেটিভ আর্থার গর্ডন পাম – (অ্যাডগার অ্যালান পো’র লেখা একমাত্র সম্পূর্ণ উপন্যাস)
প্রথম অধ্যায়
মাস কয়েক আগে আমি দক্ষিণ সমুদ্র ও অন্যান্য বেশ কয়েকটা অভিযান একের পর
এক সম্পূর্ণ করে আবার যুক্তরাস্ট্রে ফিরে এসেছি।
অভিযানকালে একেবারে হঠাৎ-ই ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড শহরে কয়েকজন ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায় এবং আলাপ পরিচয় হয়।
আমার অভিযানের কথা জানতে পেরে তারা আমাকে বার বার বিশেষভাবে অনুরোধ করতে থাকেন, আমি যেসব জায়গায় অভিযান সেরে এসেছি, সে সব জায়গার পরিপূর্ণ বিবরণ এবং দেখে শুনে যা-কিছু উপলব্ধি করেছি তা যেন আমি সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরি।
তাঁরা আমাকে বারবার বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন বটে, কিন্তু কয়েকটা ব্যাপারে আমি তা রক্ষা করতে উৎসাহি হইনি, আপত্তি ছিল। আর সে কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিছকই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, তবে অন্যগুলো তেমন নয়।
আমার আপত্তিগুলোর মধ্যে একটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে–আমার অনুপস্থিতিকালের অধিকাংশ সময়েরই দিনলিপি আমি লিখে রাখিনি, কিছুই না। তাই তো সঙ্গত কারণেই আমার আশঙ্কা ছিল, কেবলমাত্র স্মৃতির ওপর ভরসা করে এমন একটা বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে আমি হয়তো গুলিয়ে ফেলব অর্থাৎ আমার পক্ষে সেটা যথাযথভাবে লিখে শেষ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এ আশঙ্কাটাই আমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে কাজ করছিল বলেই আমি মনের দিক থেকে মোটেই সায় পাইনি।
