ভদ্রলোক ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল–এটা ভাববার মতো কোনো ব্যাপারই নয়। নিছকই মামুলি একটা পরীক্ষা ছাড়া একে অন্য কোনো নামেই অভিহিত করা যাবে না, আশা করি আমার বক্তব্য তোমাকে বুঝাতে পেরেছি, কী বল?
আমার বন্ধুবর টবির মুখে একটাও রা সরল না। চোখ-মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ এঁকে সে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুততার সঙ্গে হাত চালিয়ে জামাটা খুলে ফেলল। পকেট থেকে বড়সড় একটা রুমাল বের করে চটপট কোমরে বেঁধে নিল।
রুমালটা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে সে চোখ দুটোকে উলটে আর ঠোঁট দুটোর কোণ বাঁকিয়ে চোখ-মুখের বিচিত্র একটা পরিবর্তন ঘটিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে জবাব দিল– ‘আহেম।’
মুহূর্তের জন্য থেমে আবার আগের মতোই অদ্ভুত ভঙ্গিতে জবাব দিল–‘আহেম’। ব্যস, এটুকুই। এর বেশি আর একটা শব্দও সে উচ্চারণ করল না। মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে দিল।
টবির অবস্থা দেখে আমি কেবলমাত্র অবাকই নয়, যারপরনাই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি আক্ষেপসূচক শব্দে উচ্চারণ না করে পারলাম না–‘আহা! একী হল। তার সে অনর্গল প্যাচাল পাড়ার স্বভাবটা কোথায় গেল। টবি এমন সংক্ষেপে এতবড় একটা ব্যাপারের নিষ্পত্তি করে ফেলল! এ. যে স্বপ্নেরও অতীত।
আমি একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পুরো ব্যাপারটা নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। বুড়ো লোকটা কোনো কথা না বলেই টবির হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে তাকে সেতুটার ছায়ায় নিয়ে গেল। জায়গাটা ঘোরানো দরজাটা থেকে কয়েক হাত আগে।
তাকে নিয়ে ছায়ায় পৌঁছে বুড়ো লোকটা নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল।
টবি বিস্ময়-মাখানো দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে মুখ খোলার চেষ্টা করতেই বুড়ো লোকটা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল–‘বাছা, আমি যা বলছি, ধৈর্য ধরে শোন–কেবলমাত্র বিবেকের তাগিদেই আমি তোমাকে এটুকু পথ দৌড়াবার সুযোগ দিতে চাচ্ছি।’
কপালের চামড়ায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে টবি বলে উঠল–‘সুযোগ, দৌড়াবার সুযোগ?
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।’
‘আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। যদি একটু খোলসা করে’।
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বুড়ো লোকটা ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপাত্মক হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল–‘সুযোগ ছাড়া একে আর কি বা বলতে পারি, বলুন তো ভাই? যাক গে, যে কথা বলতে চাচ্ছি–‘ওই ফটকটার কাছে আমি না পৌঁছানো অবধি তুমি এখানেই অপেক্ষা কর।’
‘কারণটা জানতে পারি কী?
‘কারণ একটাই, আমি ওখানে দাঁড়ালে ভালোভাবে দেখতে পাব, রকুটাকে তুমি ভালোভাবে অতিক্রম করতে পারলে, নাকি শ্রেষ্ঠ দৌড়বীরের অতিক্রম করলে। আর যখন লাফ দেবে তখন পায়রার ডানা-মেলে উড়ে যাবার কৌশলটা দেখাতে যেন ভুলে না, বুঝলে?’
‘হুম!
‘আরে ভায়া, সে কৌশল, মানে ভঙ্গিটাই তো আসল হে।
টবি নীরবে তার বক্তব্য শুনতে লাগল।
বুড়ো লোকটা আগের প্রসঙ্গের জের টেনেই এবার বললেন–‘হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, আমি যখন বলব–এক-দুই-তিন দৌড়াও ব্যস, তোমাকে দৌড় শুরু করতে হবে, বুঝলে তো?
আমার বন্ধুবর টবি ঘাড় কাত করল।
বুড়ো লোকটা বলল–‘মনে রেখো, যতক্ষণ আমি ‘দৌড়াও’ না বলব ততক্ষণ কিন্তু ভুলেও যেন পা-বাড়াবে না।’
কথাটা বলতে বলতে টবিকে সেখানে দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘোরানো দরজাটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। মুহূর্তের জন্য তিনি যেন একেবারে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। পর মুহূর্তেই মুখ তুলে তাকিয়ে নীরবে মুচকি হাসলেন। তারপর অ্যাপ্রোণের রশিটাকে সাধ্য মতো বাঁধতে লাগলেন।
অ্যাপ্রোণের দড়িটা বাঁধতে বাঁধতে তিনি নিস্পলক চোখে আমার বন্ধুবর টবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এদিকে টবি দৌড় শুরু করার জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়াল।
বুড়ো ভদ্রলোকটা এবার পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেশ জোরে জোরেই উচ্চারণ করলেন–এক, দুই, তিন–এবার দৌড়াও।
‘দৌড়াও’ কথাটা কানে যাওয়ামাত্র আমার বন্ধু টবি দৌড়াতে শুরু করল।
যে ঘোড়ানো দরজাটার কথা একটু আগে বলেছি সেটা কিন্তু আসলে খুব বেশি উঁচু নয়। আবার খুব বেশি নিচু এমন কথা বললে সত্য গোপনই করা হবে। তাই তো আমি সম্পূর্ণ নিসন্দেহই ছিলাম, সে দরজাটা অতিক্রম করতে পারবেই পারবে।
আমি আর নিজেকে সামলে সুমলে রাখতে পারলাম না। উপায়ান্তর না দেখে বলেই ফেললাম–‘আশ্চর্য ব্যাপার তো! ওই বুড়ো হাড়গিলেটার কি অধিকার আছে যে আমার বন্ধুটাকে তাড়িয়ে বেড়াবে, লম্ফ-ঝম্ফ দেওয়াবে? ঘাটের মরাটার দিন তো ফুরিয়ে এসেছে, আর কয় দিনই টিকবে, কে এ-বুড়োটা? আমাকে যদি সে লাফ দেওয়ার হুকুম দিত, আমি অবশ্যই তার হুকুম তালিম করতাম না। কেনই বা আমি লাফ দিতে যাব, কোন যুক্তিতে? সে যত বড় সাক্ষাৎ শয়তানই হোক না কেন, আমি কিছুতেই তার কথামতো কাজ করতাম না। তাকে পাত্তা দেওয়ার কোনো দরকার আছে বলেই আমি মনে করি না।
আমি তো আগেই বলেছি, সেতুটা একেবারেই অদ্ভুত ধরনের। অদ্ভুত ধরনের তার নির্মাণকৌশল। আর খিলানগুলোও সেটাকে আরও বিচিত্র করে তুলেছে। তাই প্রতি মুহূর্তেই এমন অস্বস্তিকর একটা প্রতিধ্বনি সৃষ্টি যা মনের ওপর বিশেষ একটা প্রতিক্রিয়া জাগে। আমি যখন আমার বক্তব্যের শেষের কথাগুলো বলি তখন সে প্রতিধ্বনিটা আমার কানে এলো সে রকম প্রতিধ্বনি এর আগে আমি আর কোনোদিন শুনিনি, কোনোদিনই না। সত্যি বলতে কি প্রতিধ্বনিটা ছিল বাস্তবিকই বড়ই অস্বস্তিকর। তবে এও তো খুবই সত্য আমি যা-কিছু শুনেছি, যা-কিছু ভেবেছি, আর যা-কিছু কানে এসেছে সবই তো অত্যল্পকালের মধ্যেই ঘটে গেছে। হ্যাঁ, চোখের পলকেই সবকিছু ঘটে গেছে।
