উপায় নেই, যে করেই হোক অন্ধকার সেতুটা আমাদের অতিক্রম করতেই হবে। করতে লাগলাম তা-ই। সেতুটাকে একেবারে অতিক্রম করার মুহূর্তে আমার একটি বেশ উঁচু ঘোরানো দরজার সামনে হাজির হলাম। আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে পড়তেই হল। মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে সেটাকে ঘুরিয়ে আমি দরজাটা অতিক্রম করে ওপারে চলে গেলাম।
টবি কিন্তু এভাবে যেতে নারাজ। সে জেদ ধরল, ঘোরানো ফটকটাকে সে লাফ দিয়ে পেরিয়ে যাবে।
আমি কিন্তু নিশ্চিত যে, কিছুতেই সে ফটকটাকে লাফিয়ে ডিঙিয়ে যেতে পারবে না। তার জেদ ভাঙার জন্য আমি সাধ্যমত চেষ্টা করলাম। সে যেন লাফিয়ে ঘোরানো ফটকা ডিঙিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকে। সে আমার কথাগুলো মুখ বুজে শুনলেও আসলে আমার পরামর্শটাকে আমলই দিল না।
আমি শেষপর্যন্ত অন্য উপায় না দেখে বললাম–‘তুমি যতই হম্বিতম্বি কর না কেন আসলে কিন্তু তুমি যা করতে চাইছ তা কিন্তু কিছুতেই করতে সক্ষম করবে না।
সে আমার কথামত কাজ করা তো দূরের ব্যাপার বরং এক ফুঙ্কারে উড়িয়ে দিল। কাজের কাজ তো হলই না বরং ফল হলো বিপরীত। একটু পরেই বুঝলাম, আসলে আমি কথাটা বলেই হয়তো ভুল করেছি। কারণ, আমার কথার জবাব দিতে গিয়ে সে বাজি ধরে ফেলল–‘শয়তানের কাছে আমার মাথাটাই বাজি ধরছি, আমি কাজটা করবই করব।’
তার কথার জবাবে আমি মুখ খুলতে যাব ঠিক সে মুহূর্তেই আমার পাশ থেকে, একেবারে কানের কাছে কার যেন কাশির শব্দ আমার কানে এলো।
আমি চমকে উঠলাম। কাশিটা ঠিক যেন ‘আহেম’ শব্দের মতো শোনাল।
আমি সচকিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক চোখ ফেরাতে লাগলাম। হঠাৎ ) সেতুটার একটা কোণের দিকে চোখ গেল। দেখলাম, এক ভদ্র চেহারার এক বুড়ো দাঁড়িয়ে। চেহারার ছবি ভদ্রলোকের মতো। আর এও লক্ষ্য করলাম, লোকটা বুড়ো খুবই বুড়ো। তার পরনে কালো রঙের প্যান্ট, আর গায়ের জামাটার রঙ ধবধবে সাদা। আর জামার সাদা গলাবন্ধের সঙ্গে কলারটাকে মনলোভা কায়দায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্যি সব মিলিয়ে তাকে রীতিমত কেতাদুরস্তই দেখাচ্ছে। আর তার চুলের বিশেষত্বটুকু লক্ষ্য করার মতোই। সিঁথিটা করেছে মাথার ঠিক মাঝ বরাবর। মেয়েদের সিঁথি ঠিক যেমনটি হয়ে থাকে। আর তার হাত দুটো ভাঁজ করে অদ্ভুতভাবে বুকের ওপর রাখা, একটার পরে আর একটি তুলে দেওয়া। আর চোখ দুটোকে মাথার দিকে তোলা। সব মিলিয়ে বুড়োটাকে অদ্ভুতই দেখাতে লাগল।
আমি অনুসন্ধিৎসু চোখে বুড়ো ভদ্রলোকটাকে আরও ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। এবার চোখে পড়ল তার সর্বাঙ্গ একটা খুবই মিহি কালো রেশমি অ্যাপ্রোণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সত্যি ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুতই মনে হল।
আমি বুড়ো ভদ্রলোকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই কিছু বলার চেষ্টা করলাম। সে সুযোগ তিনি আমাকে দিলেন না। আমি মুখ খোলার আগেই তিনি সেই শব্দ অনুসরণ করে বলে উঠলেন–‘আহেম।
বলে উঠলেন–‘আহেম’।
‘আহেম!’ হ্যাঁ, তিনি এ-কথাটা আবারও বললেন।
তার কথাটার কি উত্তর দেব আমি সঙ্গে সঙ্গে গুছিয়ে উঠতে পারলাম না। তাই বাধ্য হয়েই নীরবে তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। আর এরকম কথার কোনো উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়াও সম্ভব নয়।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বন্ধুবর টবির দিকে তাকালাম। ম্লান হেসে বললাম টবি, কী করছ?
কোনো জবাব পেলাম না।
এবার বললাম–কী ব্যাপার, শুনতে পাওনি টবি?’
বুড়ো ভদ্রলোক বললেন–‘আহেম।
লক্ষ্য করলাম কথাটা কানে যেতেই টবির মধ্যে অকস্মাৎ কেমন যেন অভাবনীয় এক পরিবর্তনের জোয়ার খেলে গেল। তার মন, আর চোখ-মুখের পরিবর্তনের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠল। শরীরের সবটুকুক রক্ত যেন নিঃশেষে মুখে এসে জড়ো হয়েছে। আর চোখের মণি দুটো অস্বাভাবিক চঞ্চল।
একটু পরেই টবি মুখ খুলল। কাঁপা কাঁপা অনুচ্চ কণ্ঠে, বার কয়েক ঢোক গিলে সে বলে উঠল–‘বলছ কি হে? এ কথাগুলো তিনি বলছেন, তুমি কি ঠিক শুনেছ? শুনে রাখ, আমি যা সাব্যস্ত করছি, করবও ঠিক তা-ই। আর এ ব্যাপারে তুমি আশা করিনি সন্দেহ, তাই না? আর এও জেনে রাখ, এমন কোনো শক্তি নেই যা আমাকে কর্তব্যচ্যুত করতে পারে। এই তবে–আহেম! আহেম–এই আহেম?
বুড়ো মানুষটাকে কেন যে এত হাসিখুশি, আর খোশ মেজাজে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল তা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।
ঘটনাটা একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবেই ঘটে গেল। বুড়ো ভদ্রলোক খোঁড়া-পায়ে লম্বা একটা লাফ দিয়ে সেতুর সে কোণটা থেকে এগিয়ে এসে একেবারে টবির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল। টবি কিছু ভেবে উঠতে না উঠতেই আচমকা দুহাতে তার হাতটা জড়িয়ে বার কয়েক ঝাঁকুনি দিল। এ অবিমিশ্র অনুকম্পার সঙ্গে সর্বক্ষণ হাসিমাখা মুখে তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে চলল।
সহজ-সরল হাসির রেখা মুখে ফুটিয়ে তুলে বুড়ো লোকটা উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠল–‘আরে টবি, আমি নিঃসন্দেহ, এ-বাজিটায় তোমার জয় অবশ্যম্ভাবী। আমাদের প্রত্যয় যত দৃঢ়ই হোক না কেন, তোমার এ-কাজটা মামুলি হলেও একটা পরীক্ষা আমাদের নিতেই হবে। মনে করতে পার এটা নিছকই আনুষ্ঠানিক একটা পরীক্ষা, বুঝলে কি না?
টবি কপালের চামড়ায় পরপর কয়েকটা ভাঁজ এঁকে তার মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল।
