আমাদের দলটা হেরে গেল। একমাত্র সংখ্যাধিক্যের চাপে পড়ে আমাদের পরাজয় স্বীকার করতেই হল। কোনো উপায় না দেখে আমরা রণক্ষেত্র ছেড়ে চম্পট দিলাম। উর্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম ছাদহীন একটা ঘরে। মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে চারদিকে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে তখনকার মতো কিছুটা অন্তত নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত হলাম।
ছাউনিটার মাথার দিকের একটা বড়সড় ছিদ্রপথে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেখতে পেলাম, উত্তেজিত জনতার বিরাট একটা দল নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদোপম সুবিশাল একটা বাড়ির ওপর চড়াও হয়েছে, তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছে।
বাড়িটার দিকে অনুসন্ধিৎসু নজরে দীর্ঘসময় ধরে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেলাম। উপরের দিককার খোলা-জানালা ভেতর থেকে যেন ইয়া মোটা একটা দড়ি নিচে নেমে এসেছে। পাগড়ির কাপড় দিয়ে তৈরি দড়ি। আর সে দড়িটা বেয়ে মেয়ে মানুষের মতো দেখতে একটা লোক তরতর করে নিচে নেমে যাচ্ছে।
নদীর পাড়ে একটা নৌকা আগে থেকেই মোটা একটা গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মেয়েলি চেহারার লেকটা দড়ি বেয়ে নিচে নেমেই ব্যস্ত পায়ে নৌকাটায় চেপে বসল। বাঁধন খুলতেই সেই নৌকাটা স্রোতের টানে এগিয়ে চলল। লোকটা নদীর বিপরীত তীরে গিয়ে উঠল। পালিয়ে গেল নির্বিবাদে, তার গায়ে কাঁটার আঁচড়টিও কেউ দিতে পারল না।
আমার মাথায় এবার একটা নতুন পরিকল্পনা খেলল। মতলবটা একেবারেই নতুন। বন্ধুদের কাছে খুব সংক্ষেপে সেটা ব্যক্ত করলাম। আমার পরিকল্পনাটা শোনামাত্র তারা আমার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেল।
ব্যস, আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে চালা ঘরটা থেকে দৌড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
শত্রুপক্ষ আমাদের হঠাৎ এবং জোরদার আক্রমণের চাপ বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না। বে-কায়দা বুঝে, হঠাৎ করে কর্তব্য স্থির করতে না পেরে তারা পড়ি কি মরি করে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল, সবাই গলিতে-গলিতে গিয়ে গা-ঢাকা দিল।
তারা কিন্তু হাত-পা গুটিয়েনিশ্চেষ্ট হয়ে বসে রইল না। দুদিকের গলিগুলো থেকেই তীর আর বর্শা নিয়ে আমাদের ওপরে আক্রমণ চালাতে লাগল। উভয়দিক থেকে ঘন ঘন বৃষ্টির মতো তীর আর বর্শা ছুটে আসতে লাগল।
তীরের ফলাগুলো কী যে মারাত্মক তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। যাকে বলে যথার্থ মারণাস্ত্র। একমাত্র মালয় দেশের অস্ত্র বাঁকা কিরিচের সঙ্গেই সেগুলোর তুলনা চলতে পারে। তীরের ফলার মাথায় যে কেবলমাত্র বিষ মাখানো তা-ই নয়, সেগুলো। সর্পাকৃতি। আর লম্বাটে ও কুচকুচে কালো। সেগুলো এক নজরে দেখলেই আতঙ্কে বুকের মধ্যে ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে যায়।
আতঙ্ক! আতঙ্কের পর আতঙ্ক। আচমকা একটা তীর ছুটে এসে সোজা আমার কপালে গেঁথে গেল। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় ঝিমঝিমানি শুরু হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই মাথাটা চক্কর মেরে উঠল। আমি হুমড়ি খেয়ে পথে পড়ে গেলাম। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম। অসুস্থ হয়ে পড়লাম। তবু আমি হাত থেকে অস্ত্রটা ফেললাম না। দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও অনেকক্ষণ লড়ে গেলাম। এবার বিষ-জ্বালা সহ্যাতীত হয়ে পড়ল। হাঁপও ধরে গেল। আর টিকে থাকতে পারলাম না, মরে গেলাম। শেষ। আমার সব শেষ হয়ে গেল।
মুহূর্তের জন্য নীরব থেকে আমি আবার মুখ খুললাম–‘ডাক্তার টেম্পলটন, আশা করি এতকিছু শোনার পর আর আগের মতো বলবেন না যে, আপনার গোটা
অভিযানটাকে একটা স্বপ্ন ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে উৎসাহ পাচ্ছি না।’
ডাক্তার টেম্পলটন ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে চশমার ফাঁক দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন।
আমি এবার বললাম–‘ডাক্তার টেম্পলটন, আশা করি আপনি অবশ্যই বলতে উৎসাহি হবেন না যে, আপনি মৃত, কী বলেন?
ডাক্তার টেম্পলটন এবার নীরবে মুচকি হাসলেন।
আমি মি. বেডলোর মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। তাকেও নীরব দেখে আমি অবাকই হলাম। আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম, তার কাছ থেকে মোক্ষম একটা মন্তব্য শুনতে পাব। কি আশ্চর্য ব্যাপার। লক্ষ্য করলাম, ইতস্তত করছে। তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে, থর থরিয়ে কাঁপছে। মুখটা ফ্যাকাশে, রক্ত শূন্য। ছাইয়ের মতো বিবর্ণ সাদাটে হয়ে গেছে। তিনি নীরব, মুখে কলুপ এঁটে বসে রইলেন। টু-শব্দটিও করলেন না।
আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে আবার ডাক্তার টেম্পলটনের মুখের দিকে তাকালাম। তার অবস্থা দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ার জোগাড় হলাম। দেখলাম, তিনি চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে কাঠের মতো সোজা ও শক্ত হয়ে চেয়ার আঁকড়ে বসে। ঘন ঘন দাঁতে দাঁত লাগার রীতিমত ঠক ঠক আওয়াজ হচ্ছে। আর চোখ দুটো ইয়া বড় বড়। নিশ্চল-নিথর। কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
পর মুহূর্তেই নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, বুকে শক্তি ও সাহস সঞ্চার করে কোনোরকমে উচ্চারণ করলেন–‘মি. বেডলো থামলেন কেন? বলে যান। তারপর কি হলো, বলুন?
বেডলো নিজের চেয়ারে একটু নড়েচড়ে আয়েশ করে বসলেন। তারপর আবার মুখ খুললেন ‘হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম–দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমার একমাত্র অনুভূতি কি ছিল জানেন ডাক্তার টেম্পলটন?
ডাক্তার টেম্পলটন ভাঙা ভাঙা গলায় কোনোরকমে উচ্চারণ করলেন–কী? কীসের কথা বলছেন?
