সে বেশিক্ষণ চোখ দুটো বন্ধ করে রাখে না, মানে রাখতে পারে না। পর মুহূর্তেই সে দু-দুটো চোখই এক সঙ্গে মেলে ইয়া বড় বড় করে তাকায়। তার ইয়া বড় বড় গোল চোখ দুটোর দিকে আমার দৃষ্টি যেতেই আমি তার পরিণতির কথা ভেবে ভয়ে কুঁকড়ে যাই। আমিনিস্পলক চোখের মণি দুটোতে আতঙ্কের ছাপ এঁকে তাকিয়ে থাকি। ভয়ে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবার জোগাড় হয়। এতেও কিন্তু সে থেমে থাকল না। সে এবার বুড়ো আঙুলটাকে নাকের ডগায় স্থাপন করে বাকি সব আঙুলগুলোকে বিচিত্র এক ভঙ্গিতে অনবরত নাচাতে লাগল। সে বিশেষ ভঙ্গিটার যথাযথ ব্যাখ্যা করে কারো মধ্যে ধারণা সঞ্চার করা সম্ভব নয়। আঙুলগুলো নাচাতে নাচাতে এক সময় হাত দুটোকে আচমকা নামিয়ে নিয়ে এসে আরও অদ্ভুত ভঙ্গিতে ভাজ করে বুকের ওপর রেখে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়।
আমার বন্ধুবর টবির ভাষণের আসল কথাগুলো আমার স্মৃতির পাতায়। পাকাপাকিভাবে লেখা হয়ে গেছে। আজ, এতদিন পরও সে-সব কথা আমার মনে আছে।
সে আমাকে বলে, আমি মুখ বন্ধ করলেই সে ধন্য হবে। আমার কোনো পরামর্শই সে শুনতে উৎসাহি নয়। উপদেশের নামে আমার ধমক-ধামককে সে ঘৃণা করে। আর এও স্পষ্ট ভাষায় আসবে, জা নিয়ে দেয়। নিজেকে সামলে সুমলে চলার মতো যথেষ্ট ধৈর্য রাখা হয়েছে। আমার কাছে কি সে আজও ছোট্ট টবি-ই রয়ে গেছে নাকি? আমি। কি তাকে নাবালক ভেবেই এমন সব হিতোপদেশ দিতে উৎসাহি হচ্ছি? সে বয়স সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে।
এরকম কথা বলতেও সে দ্বিধা করে না-আমি কি তার চরিত্র সম্বন্ধে কোনো রকম বিরূপ মন্তব্য করতে উৎসাহি? তার কুৎসা প্রচার বানিন্দা করার ইচ্ছা কি আমার আছে? আমি একজন বোকা হাঁদা নাকি? আমার সম্বন্ধে আবারও নতুন করে জানতে আগ্রহী, আমি যে ঘর ছেড়েছি তা কি আমার মা জানেন, নাকি চুপিসারে বেরিয়ে এসেছি। সে মুচকি হেসে মন্তব্য করত। আমার নীরবতাই ব্যাপারটা ফাস করে দিয়েছে। আমাকে ধরা পড়ে যেতে সাহায্য করেছে। এর জন্য সে শয়তানের কাছে। নিজের মাথাটা বাজি ধরতেও কুণ্ঠিত তো হয়ই, বরং মনে-প্রাণে সম্মত হয়।
আশ্চর্য ব্যাপার। আমি কি জবাব দেব তা না শুনেই বন্ধুবর টবি লম্বা লম্বা পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। চলে গেল না বলে বরং পালিয়ে গেল বললেই ঠিক বলা হবে। তবে এও ঠিক করেছে যে, সে পালিয়ে যাওয়ায় কার্যত ভালোই করেছে। নইলে সে যদি আমার হাতের নাগালের মধ্যে থাকত তবে হয়তো বা বিশ্রি একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে বসতাম। কারণ, আমার রাগ যেমন তুঙ্গে উঠেছিল তাতে হয়তো বা তা আচ্ছা করে উত্তম মধ্যমই দিয়ে দিতাম।
আল্লাহ সবার শাস্তি বিধান করুন। অসতর্কতাবশত তুমি আচমকা মুসলমান সম্প্রদায়ের কারো পা মাড়িয়া দিলে সে কথাটা বলেই নিজেই আক্ষেপ প্রকাশ করে। আর আমি যা-কিছু করছি, কেন? আমি বলব, সবই অবশ্যই কর্তব্যের তাগিদেই করছি। বন্ধুবর টবির প্রতি আমার কর্তব্য, তাই তো মানুষের মতোই এ অপমান জ্বালাও মুখ বুজে সহ্য করে না নিয়ে পারলাম না।
এবার থেকে টবিকে উপদেশ দেবার ব্যাপারটা অনেকাংশে কমিয়ে দিলাম বটে, কিন্তু তার সংস্রব থেকে দূরে সরে থাকা সম্ভব হলো না। আমি আগের মতোই তার সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবেই মেলামেশা করতে লাগলাম।
টবির আচার আচরণ, চলাফেরা আর কথাবার্তা শুনে আমি মর্মাহত হলেও, চোখের কোণে পানি ভিড় করে এলেও অম্লান মুখে, যাকে বলে রীতিমত হাসিমুখেই তার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা আগের মতোই চালিয়ে যেতে লাগলাম। আমার ব্যবহারে নতুনত্ব কিছু লক্ষিত হত না। আমরা দুজন একদিন বেড়াতে বের হলাম। পাশাপাশি, পরস্পরের হাত ধরাধরি করে আমরা হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে এগিয়ে চলেছি। সামনে, কিছুদূর এগোলে সে পথে একটা লম্বা সেতু পড়ল। সাঁকোটা পার হয়ে যেতে হবে। পথিকদের রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সেতুটার মাথার ওপর ছাউনি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য ভেতরটায় আবছা অন্ধকার বিরাজ করছে। গাঢ় অন্ধকার না হলেও মোটামুটি অন্ধকারই বলা চলে। ওটার ওপর দিয়ে যাতায়াত করা কষ্টসাধ্য ব্যাপারই বটে। সূর্যের অত্যুজ্জ্বল আলো থেকে হঠাৎ অন্ধকারে ঢুকতে গিয়েই আমার মেজাজটা তিড়িক্কি হয়ে গেল।
আমি টবির মুখের দিকে আড়চোখে তাকালাম। তার দিকে চোখ ফেরাতেই আমি যেন আচমকা একটা হোঁচট খেলাম। লক্ষ্য করে দেখলাম, আমার মধ্যে এখন বিরক্তি ভর করেছে কিন্তু তার চোখ মুখে এতটুকু পরিবর্তনের ছাপ ফুটে ওঠেনি।
টবির মুখ কেবলমাত্র স্বাভাবিক বললে কম করেই বলা হবে, রং তার মুখে রীতিমত হাসির ঝিলিক বিরাজ করছে। আমি তাজ্জব বনে গেলাম।
আমি চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটিয়ে, কপালের চামড়ায় ভাঁজ এঁকে তার হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার বিস্ময়টুকু তার নজর এড়াল না। সে তো বলেই ফেলল–আমি যে অস্বস্তি বোধ করছি তার জন্য সে শয়তানের কাছে নিজের মাথাটা বাজি ধরতেও রাজি।
কথাটা বলেই সে এমন চিৎকার চাচামেচি, হৈ-হুঁল্লোড় আর লম্ফ-ঝম্ফ শুরু করে দিল যে, রীতিমত একটা তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দিল। আর সে সঙ্গে অনর্গল বড় বড় কথার ফুলঝুড়ি ছুটানোর ব্যাপার তো আছেই। এ পরিস্থিতিতে সর্বক্ষণ তার মুখে হাসির ঝিলিকের পরিবর্তে গাম্ভীর্যই বিরাজ করতে লাগল।
