আমি তবুও কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত হলাম না। আবারও বললাম–এমন কথাবার্তা যে বলে সমাজের কেউই তাকে সুনজরে দেখে না, মনে রেখো।
সে আমাকে পাত্তাই দিল না।
আমি তাকে বকাঝকাও কম করলাম না।
কাজের কাজ কিছুই হলো না। আমার কথার কোনো দামই সে দিল না।
নিষ্ফল প্রয়াস।
আমি কড়াস্বরে প্রতিবাদ জানালাম। তা-ও পুরোপুরি বৃথাই গেল।
এবার অন্য পথ ধরলাম। আর বকাবকি না করে সাধ্যমত গলা নামিয়ে । সহানুভূতির স্বরে তার কাছে বহুভাবে অনুরোধ রাখলাম।
সে আগের মতোই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাসল।
ভাবলাম মহাসমস্যায় পড়া গেল তো! এবার আগের মতোই মোলায়েম স্বরে প্রসঙ্গটা সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দিলাম।
সে কপালে বিরক্তির ছাপ এঁকে আমার দিকে তাকাল। আমাকে বিদ্রূপ করল।
এবার আমি মরিয়া না হয়ে পারলাম না। কর্কশ স্বরে বহুভাবে তাকে ভয় দেখালাম। ফল হলো হিতে বিপরীত। সে ভয় তো পেলই না, উপরন্তু প্রতিজ্ঞা করল। অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার কিছুই করার রইল না।
আমি চোখের তারায় হতাশার ছাপ এঁকে তার দিকে তাকিয়ে থেকে হাল ছেড়ে দিতে পারলাম না। এবার শেষ অস্ত্রটা ছেড়ে দেবার জন্য নিজের মনকে শক্ত করে বাঁধলাম। বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে তাকে আচমকা এক লাথি মেরে বসলাম।
সে গুলি খাওয়া বাঘের মতো গর্জন করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। পুলিশ ডেকে আনল।
আমি রাগে বেসামাল হয়ে তার নাক ধরে টানাটানি করলাম। সে বার কয়েক সশব্দে নাক ঝাড়ল। উপায়ান্তর না দেখে সে শেষপর্যন্ত বলেই ফেলল, এরকম কাজ সে যদি ভবিষ্যতে কোনোদিন করে তবে সে নিজের মাথাটাই শয়তানের কাছে বাজি রাখবে।
হায়! আমার এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করার পরিণাম শেষপর্যন্ত এই দাঁড়াল।
টবির জীবনের দারিদ্র ছিল অন্য আর এক পাপ। হ্যাঁ, অবশ্যই পাপ। সে খুবই বেশি রকম গরিব ছিল। আর অর্থাভাবের জন্যই সে যে কথায় কথায় বাজি ধরার কথা বলত তা কোনোদিন অর্থনৈতিক রূপ লাভ, মানে বাস্তবায়িত হত না। তা নিছক মুখের কথাই রয়ে যেত।
‘আমি তোমার সঙ্গে এক পাউন্ড বাজি ধরছি’–এরকম কথা তার মুখ দিয়ে খুব কমই বের হত? তবে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই সে বলত–তোমার যা-যা খুশি তাই বাজি ধরছি, কোনো সমস্যা নেই। তা না হলে তুমি সাহস করে যা-খুশি বাজি ধর, তাতেই আমি রাজি, বল কী বাজি ধরব? ঠিক আছে, আমার মাথাটাকেই শয়তানের কাছে বাজি রাখছি, খুশি তো?
সব শেষের বাজি ধরার কথাটা উচ্চারণ করতেই টবি বেশি আনন্দ পেত। কেন? এ বাজিটাতে কোনোরকম টাকাকড়ির ঝুঁকি, মানে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার স্যাপার থাকার জন্যই হয়তো এ ব্যাপারটায় সে আনন্দ পেত।
আর একটা কথা বলে রাখা দরকার, টবি খুব কৃপণও হয়ে উঠেছিল। এমনও হতে পারে, এ পর্যন্ত যা-কিছু বললাম, সবই আমার মনের ভাবনা-চিন্তার ব্যাপার। আর এও হতে পারে বন্ধুর ওপর এমন সব দোষ চাপিয়ে দেওয়াও মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। তা সত্ত্বেও তার মাথায় ব্যাংক-নোটের মতো বাজিরার চিন্তা-ভাবনা যে একেবারেই অসঙ্গত, এ-ব্যাপারটাই আমি বহুভাবে চেষ্টা চরিত্র করেও বন্ধুবরের মাথায় কিছুতেই ঢোকাতে পারলাম না।
আমার প্যানপ্যানানিতে শেষপর্যন্ত সে অন্য সবকিছু ছেড়ে দিয়ে শয়তানের কাছে আমার মাথাটাকেই বাজি ধরব–এ বক্তব্যটাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করল, একান্ত সম্বল হিসেবে ধরে রাখল। তার এরকম দৃঢ় মনোভাব লক্ষ্য করে আমার বিস্ময় ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হয়ে পড়তে লাগল। এতে আমি মর্মাহতও কম হলাম না। বহু দুঃখে তার এরকম অভাবনীয় মনোভাব আমাকে একটা কথাই ভাবতে ও বলতে বাধ্য করল–‘অদ্ভুত! অদ্ভুত!’
মি. কোলরিজ হয়তো আমার বন্ধুবরের এরকম অত্যাশ্চর্য মনোভাবকে রহস্যময় বলেই আখ্যা দিতেন।
আর মি. কান্ট হয়তো বা আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলতেন–একে একমাত্র সর্বেশ্বরবাদ ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না।
আর মি. ইমারসন? তিনি হয়তো রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই বলে উঠলেন–খুবই বড় রকমের একটা ধাঁধা।’
আমি অন্তর থেকেই বলছি–ব্যাপারটা আমার কাছে কিছুমাত্রও ভালো লাগছে না। বরদাস্ত করা কিছুতেই সম্ভব হয়নি। এদিকে বন্ধুবর ধাঁধার মন ক্রমেই ভেঙে পড়তে আরম্ভ করল।
আমি নিজের মনের সঙ্গে দীর্ঘ বোঝাপড়ার পর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করে হলেও বন্ধুবর টবিকে রক্ষা করব। অতএব আর অহেতুক কালবিলম্ব না করে সে কাজে পুরোপুরি মেতে গেলাম। ভাবলাম, ব্যাপারটা সম্বন্ধে তাকে আরও বোঝাতে হবে, প্রয়োজনে আমার যেটুকু শক্তি আছে নিঃশেষে নিঙড়ে তাকে বোঝাবার কাজে লিপ্ত হতে হবে। মোদ্দা কথা, তাকে পথে আনার জন্য যা-কিছু করা দরকার কোনো ত্রুটিই রাখলাম না।
আমার বক্তব্য শেষ করতে না করতেই আমার বন্ধুবর টবি এমন সব আচরণে মেতে যেত যার অর্থ–মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারতাম না। কখনো কখনো সে এমন অভাবনীয় কাণ্ড করত যা আমাকে যারপরনাই অবাক করত। কপালের চামড়ায় পর পর কয়েকটা ভাঁজ এঁকে নীরব চাহনি মেলে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।
কিন্তু সে আর কতক্ষণ? পরমুহূর্তেই ঘাড়টাকে একদিকে কাৎ করে, মাথাটাকে হেলে দুটোকে প্রায় কপালে তুলে চলত। তারপর ঝট করে হাত দুটোকে সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঁধ দুটোকে মৃদু মৃদু ঝাঁকুনি দিত। তারপর ডান চোখটাকে সামান্য ফাঁক করে মিটি মিটি তাকায়, একেবারেই বিশেষ এক ভঙ্গি। এও বেশিক্ষণ নয়। পরমুহূর্তেই বাঁ-চোখেও তার প্রতিক্রিয়া লক্ষিত হয়। এবার দুটো চোখকে একই সঙ্গে বন্ধ করে দেয়। সত্যি অদ্ভুত! একেবারেই অদ্ভুত তার আচরণ।
