এক সময় বইয়ের পাতাটা থেকে চোখ তুলে আমাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল– শোন, ভয়ঙ্কর দৈত্যটার বর্ণনা দিতে গিয়ে তুমি সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়গুলোর ওপর এত বেশি গুরুত্ব না দিতে তবে সেটা যে প্রকৃতপক্ষেই কোনোদিনই তোমার মধ্যে সম্যক ধারণা জন্মানো আমার পক্ষে সম্ভব হতো না, খুবই সত্য কথা।
আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম–হুম!
সে বলে চলল–হ্যাঁ বন্ধু, যা বলছি শতকরা একশো ভাগই সত্য।
আমি নীরবে মুচকি হাসলাম।
সে বলেই চলল–গোড়াতেই তোমাকে একটা স্কুল পাঠ্যবইয়ের কিছু অংশ পড়ে শোনাচ্ছি। ধৈর্য ধরে শোন। আমি এখন পড়ছি, ইনসেক্টা অর্থাৎ পতঙ্গ শ্রেণির অন্তর্গত বহু প্রাণি সমন্বিত জাতির অন্তর্গত। ক্রিপাসকুলারিয়া পরিবারভুক্ত–স্ফিংস প্রজাতির কথা।
এই বইটায় স্ফিংস প্রজাতির যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা হল–
ধাতুর মতো ঝিল্লা দেয় এমন ছোট ছোট রঙিন আঁশে মোড়া চারটি ডানা। মুখটা চোয়াল থেকে নিচের দিকে ঝুলে-পড়া এবং লম্বা নাক ওয়ালা। মুখের দুধারে ইয়া বড় বড় গোছা গোছা লোম থাকে। আর নিচের দিকের ডানা দুটো শক্ত ও লম্বা লোমের সাহায্যে ওপরের চোয়ালের সঙ্গে শক্তভাবে আটকানো। আর শুয়োগুলো লম্বা-লম্বা লাঠির মতো আর স্কটিকের মতো স্বচ্ছ। তলপেটটা বেশ তীক্ষ্ণ।
মাথার খুলিওয়ালা স্ফিংস অতীতে করুণ কান্নার মতো আওয়াজ করে সাধারণ মানুষের মনে রীতিমত আতঙ্কের সঞ্চার করত। এর পরও মড়ার খুলির কুল-চিহ্ন দেহের ওপর লক্ষিত হয়। বাস্তবিকই বিচিত্র এক বিশেষ প্রজাতির প্রাণী স্ফিংস।
বন্ধুবর এ পর্যন্ত পড়ে থামল। এবার বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে আমার মুখের দিকে তাকর।
আমার চোখে-মুখে তখন কৌতূহলের ছাপ। ভয়ালদর্শন দৈত্যটাকে দেখামাত্র সামনের দিকে ঝুঁকে সে ভঙ্গিতে আমি বলেছিলাম ঠিক সে ভঙ্গিতে সে এবার বলল। তারপর সে বলতে লাগল–আরে আরে, ওই তা–সে লম্বা পায়ে পাহাড়ের ওপর উঠে যাচ্ছে। ওই যে! ও দিকে!
আমি তার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে পাহাড়ের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলাম।
বন্ধুবর পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনে এবার বলল–দেখ বন্ধু আমি কিন্তু এখন আর সে জানোয়ারটাকে অদ্ভুতদর্শন জানোয়ার বলে স্বীকার করে না নিয়ে পারছি না। তবে এ-কথা না বলে পারছি না, তুমি কল্পনার মাধ্যমে সেটাকে যেমন দেখেছিলে আসলে কিন্তু অতটা বৃহদাকার নয়, আবার ততটা দূরেও অবস্থান করছে না।
আমি বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে তার মুখের দিকে নীরবে তাকালাম। সে বলে চলল–আসল ব্যাপারটা কি জান বন্ধু? আমি বলে উঠলাম–আসল ব্যাপার? তোমার আসল ব্যাপারটা কি, বলবে কী?
অবশ্যই। ব্যাপারটা হচ্ছে, জানালার শার্সির সোজা মাকড়শা যে জাল বুনেছে সেটা বেয়ে প্রাণীটা যখন শরীরটাকে বার বার অদ্ভুতভাবে এদিক ওদিক বাঁকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তখন আমি সেটাকে এক ইঞ্চির ষোল ভাগের এক ভাগ দেখতে পাচ্ছি। আর আমার চোখের মণি দুটো থেকে তার দূরত্ব একই, বুঝলে?
নেভার বেট দ্য ডেভিল ইয়োর হেড
বিশ্বাস করুন, আমার মৃত অভিন্ন হৃদয় বন্ধু টবি ড্যামিট সম্বন্ধে কুৎসা প্রচার করতে আমি কলম ধরিনি।
সত্যি বলছি, টবি ছিল এক অদৃষ্ট বিড়ম্বিত কুকুর। আর কুকুরের মতোই তার মৃত্যুও হয়েছে।
তবে খুবই সত্য যে, তার অপকর্মের জন্য কেবলমাত্র তাকেই দায়ী করা চলে না, তার গর্ভধারিণী মায়েরও বহু দোষ-ত্রুটি ছিল।
শৈশব থেকে টবির মা তাকে যখন তখন বেধড়ক মেরেছে। আর কারণে অকারণে অতিরিক্ত গালিগালাজ ও মারার জন্যই সে দিন দিন ক্রমেই খারাপ হতে হতেই জঘন্যতম পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। শেষপর্যন্ত একেবারে চরম সীমায় এসে পৌঁছেছে।
টবি বাল্য ও কৈশোরের দিনগুলো কাটিয়ে আজ রীতিমত এক জোয়ান মরদ–বড় হয়ে উঠেছে।
তখন পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠল যে, কেবলমাত্র জুয়াড়িদের ব্যবহৃত বাছা বাছা শব্দগুলো ছাড়া অন্য কোনো শব্দ বা কথাই তার মুখে আসে না। সে যে সত্যি জুয়া খেলে বা জুয়ার আড্ডায় যাতায়াত করে এমন কথা ভাবাই যায় না। তবে সে যে কথায় কথায় বাজি ধরে, ব্যাপারটা কি, তাই না? এটা নিছকই তার একটা মুখের কথা। একেবারেই খেয়ালের বশে অর্থহীনভাবে কথাগুলো বলে। আর খামখেয়ালির বশীভূত হয়েই সে কথায় কথায় বলে–‘আমি তোমার সঙ্গে এটা-ওটা বাজি ধরতে রাজি আছি।’ তার এসব কথা কেউ তখন গায়েই মাখে না। আসলে তার বাজি ধরার ব্যাপারটা যে নিছকই একটা কথার কথা তা-তো কারোই অজানা নয়। অতএব কে আর কেনই বা আমল দিতে যাবে, বলুন?
তা সত্ত্বেও আমি তাকে কথায় কথায় এমন বাজি ধরার ব্যাপারটা থেকে বিরত করতে তৎপর হতাম। আর এ বাজিটাকে আমি কর্তব্য বলেই ধরে নিলাম।
আমি তাকে ডেকে বললাম–শোন হে, বাজি ধরার কথাটা, মানে এ অভ্যাসটা নীতিগতভাবে মোটেই সঙ্গত নয়। এমন কথা মুখে উচ্চারণ করা মোটেই উচিত নয়।
আমার কথাগুলো শুনে সে –কুঁচকে আড়চোখে আমার দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকাল।
আমার বক্তব্যটা আরও খোলসা করে বলে আমি তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম– ‘শোন হে, এমন কথা সমাজের অভদ্র মানুষদের বদ অভ্যাস ছাড়া কিছু নয়। এতএব এখন থেকেই কাউকে এমন কথা ভুলেও যেন বোলো না।
কথাটা বলতে বলতে তার মুখের দিকে তাকালাম। সে আগের মতোই বিশেষ ভঙ্গিতে আমার দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল। তার চোখে মুখে তাচ্ছিল্যের ছাপ সুস্পষ্ট।
