সে জানালাটা দিয়ে আমি সে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা চাক্ষুষ করেছিলাম আমি ঠিক সেখানে, সে চেয়ারটায় বসে অদূরবর্তী পাহাড় আর পার্বত্য জঙ্গলটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলাম। আর আমার বন্ধুবর? সে আমার অদূরে একটা আরাম-কেদারায় শরীর। এলিয়ে দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় ছিল। আসলে আমার উৎসাহ আগ্রহে সাড়া দিতে গিয়ে সে আমার সঙ্গে অবস্থান করলেও আমাদের উভয়ের উৎসাহের মধ্যে ফারাক যে বিস্তরই ছিল তা তো আর অস্বীকার করার জো নেই।
আমি বন্ধুকে আগেই অলৌকিক ঘটনাটা সম্বন্ধে সামান্য আভাস দিয়ে রেখেছিলাম। তবে তা খুবই সামান্য। এমন স্থান ও কালের এ-মিলনের ফলেই যেন আমার মধ্যে সে দিনের সে ভয়ঙ্কর ঘটনাটা তার কাছে সবিস্তারে ব্যক্ত করতে আমি অতিমাত্রায় উৎসাহি হয়েছিলাম।
আমি কিছুমাত্র গোপন না করেই বন্ধুর কাছে সেদিনের সে অলৌকিক ঘটনাটা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। সে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে সবকিছু ধৈর্য ধরে শুনল।
গোড়ার দিকে সে আমার কথা শুনে সরবে হেসে উঠল। যেন পুরো ব্যাপারটাই হেসে উড়িয়েই দিল। কিন্তু সে আর কতক্ষণ? পরমুহূর্তেই তার সে প্রাণখোলা হাসি যেন কপুরের মতো নিঃশেষে মিলিয়ে গিয়ে চকের মতো মিলিয়ে গেল। চোখ-মুখে এমন একটা গভীর ভাব ফুটে উঠতে আরম্ভ করল যেন আমার মানসিক অসুস্থতা সম্বন্ধে সে নিঃসন্দেহ হয়ে পড়েছে।
আমি বন্ধুর ওপর থেকে দৃষ্টি তুলে নিয়ে সে বিশেষ জানালার পাশে পাহাড় আর জঙ্গলটার ওপর চোখের মণি দুটোকে বুলাতে লাগলাম। একেবারে হঠাৎই আমার দৃষ্টি এক জায়গায় থমকে গেল। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল বিকৃত অতিকায় ভয়ালদর্শন দৈত্যটা। আমি সঙ্গে সঙ্গে বিকট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলাম। আর্তনাদ করতে করতেই আমি জঙ্গলের সে বিশেষ স্থানটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলাম।
আমার আর্তস্বর কানে যেতেই বন্ধুবর যন্ত্রচালিতের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে আমার প্রায় গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সে আমার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। মুহূর্তে তার চোখে-মুখে অবিশ্বাস আর সন্দেহের ছাপ ফুটে উঠল। সে কিছু দেখতে পেল না, কিছুই না। শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে আমার মুখের দিকে এমন চাপা ক্রোধপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল যে, যেন আমাকে কাঁচাই গিলে খেয়ে ফেলবে। তবে সে অতিকায় প্রাণীটা যে ভাবে আর যে পথে ন্যাড়া পাহাড়টা থেকে নিচের দিকে দুলকি। চালে, জঙ্গলটার দিকে নেমে গেছে তার বিস্তারিত বিবরণ, কিছুমাত্রও বাদ না দিয়ে তার কাছে ব্যক্ত করলাম।
আমি ব্যাপারটা সম্বন্ধে আগেই কিছু না কিছু ভিত ছিলাম বটে। এবার জমাটবাধা ভীতি আমার বুকের সবটুকু স্থান জুড়ে বসল। যেন আমার মনে হচ্ছে, এ দৃশ্য নির্ঘাৎ আমার মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ। আর তা যদি নেহাৎ না-ই হয় তবে উন্মাদদশা প্রাপ্ত হওয়ার সূচনা তো বটেই।
চেয়ারে বসা-অবস্থায়ই যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত তুলে নিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। বুকের ভেতরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ধুকপুকানি হয়েই চলেছে।
কয়েকমুহূর্ত আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে আমি আবার যখন চোখ মেলে তাকালাম তখন কিন্তু ভয়ঙ্কর সে ছায়ামূর্তিটা আর নজরে পড়ল না। চোখের সামনে কেবলমাত্র পাহাড় আর পাহাড়ে জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না।
আমার বন্ধুবর তখনও চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে নীরবে বসেছিল। চোখে মুখে বিষণ্ণতার ছাপ লক্ষিত হলেও আগের মতো তেমন প্রকট নয়। আর মনের প্রশান্তিও অনেকাংশে কেটে যাওয়ায় অন্তত কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছে।
স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়ার পর সে ভৌতিক জানোয়ারটা সম্বন্ধে আমাকে বিভিন্ন ধরনের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করতে লাগল।
আমিও তার প্রতিটা প্রশ্নের যথাযথ উত্তরদানে তাকে সাধ্যমত খুশি করতে লাগলাম। আমার বক্তব্য শেষপর্যন্ত শোনার পর খুশি হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তার চোখ মুখের ভাব দেখে আমার স্পষ্টই মনে হলো যেন বুকের ওপর থেকে ভারী একটা পাথর হঠাৎ নেমে গেছে। ব্যস এ পর্যন্তই। তারপরই যে সে প্রসঙ্গটা থেকে সরে গিয়ে দর্শনশাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা শুরু করল। অচিরেই সে আলোচনায় রীতিমত মজে গেল। আমি নীরব-শ্রোতার ভূমিকা পালনে ব্রতী হলাম।
কিছুক্ষণ একনাগাড়ে আলোচনা চালাবার পর আমার বন্ধুবর নীরব হলো। এবার সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে বইয়ের তাকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর। বইয়ের সারি ঘাটাঘাটি করে প্রাণীবিজ্ঞানের একটা বই টেনে বের করে আনল। সেটাকে হাতে নিয়ে ফিরে এসে আবার নিজের চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল।
হাতের বইটা খুলেই সে থমকে গেল। আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। বইয়ের পাতাটার দিকে চোখ পড়তেই আমার দিকে তার তাকানোর উদ্দেশ্যটা বুঝতে অসুবিধা হলো না। বইয়ের অক্ষরগুলো এতই ছোট যে, চেয়ারে বসে সেগুলো পাঠোদ্ধার করা তার পক্ষে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই উপায়ান্তর না দেখে আমরা চেয়ার পাল্টাপাল্টি করে নিলাম। এবার সে জানালার গায়ে আমার সে হাতলওয়ালা চেয়ারটায় বসল। স্বাভাবিকভাবেই আমি তার আরাম চেয়ারটা দখল করলাম। সে এবার বইটার একটা বিশেষ পাতা খুলে জোরে জোরে উচ্চারণ করে পড়তে আরম্ভ করল।
