অতিকায় বিকৃত আর ভয়ালদর্শন জীবটা সে মুহূর্তে আমার নজরে পড়ল তখন আমার পরিস্থিতি এমনই সঙ্কটজনক হয়ে পড়ল যে, আমার মানসিক সুস্থতা সম্বন্ধে আমার নিজের মনেই যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক ঘটল। আর যা-ই হোক, আমার চোখের ওপর অন্তত আমি যে পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলাম, কিছুমাত্র ভুল নয়।
দীর্ঘসময় ধরে আমি নিজের সম্বন্ধে, আমার আকস্মিক মানসিক পরিবর্তন সম্বন্ধে নীরবে গভীর ভাবনায় তলিয়ে রইলাম। শেষপর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারলাম, আর যা-ই হোক আমি অন্তত পাগল হয়ে যাইনি আর জেগে স্বপ্নও দেখিনি।
এতকিছু সত্ত্বেও আমি যখন, যার কাছেই ওই দৈত্যটা সম্বন্ধে বিবরণ দিয়েছি, সব ক্ষেত্রেই বলেছি, আমি তাকে স্বচক্ষে স্পষ্ট দেখেছি আর লক্ষ্যও করেছি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আমার পাঠক-পাঠিকারা তখন কিন্তু এ ব্যাপার দুটো সম্বন্ধে অবশ্যই আমার মতো এতখানি নিশ্চিত, এতখানি নিঃসন্দেহ হতে পারেননি। অন্তরের অন্তঃস্থলে কিছু না-কিছু দ্বিধা তাদের থাকারই কথা।
জঙ্গলের সে কয়টা সুদীর্ঘ, আকাশছোঁয়া গাছ ধ্বংসের কবল থেকে অব্যাহতি পেয়েছিল। তাদের মধ্যে দীর্ঘতম সে গাছটার গা-ঘেঁষে অতিকাল বিকৃতদর্শন প্রাণিটা চলে গেল তার ব্যাসের সঙ্গে প্রাণিটার তুলনা করার পর আমার মধ্যে ধারণা জন্মাল যে, এখনকার জলপথ-বেয়ে যে সব জাহাজ যাতায়াত করে তাদের যে কোনোটা থেকে সেটা আকারে বড়, অবশ্যই বড়।
এতকিছু থাকতে আমি কেন জাহাজটার কথা উল্লেখ করলাম, তাই না? আসলে। প্রাণীটার অতিকায়ত্ব সম্বন্ধে বলতে গিয়ে জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো জুতসই উপমা আমার মনে আসেনি।
আমাদের চুয়াত্তর টনের জাহাজের খোলে কথা বিবেচনা করলেই প্রাণিটার দেহটা সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধঅরণা করে নেওয়া সম্ভব।
বিকৃতদর্শন অতিকায় প্রাণিটার ষাট-সত্তর ফুট লম্বা আর সে অনুপাতে মোটা শুড়টার একেবারে শেষপ্রান্তে ইয়া পেল্লাই মুখটার অবস্থান। আর যে জায়গাটা এ শুড়টার উৎস সে জায়গায় লম্বা-লম্বা কালো লোমে ঢাকা। সেগুলো এতই ঘন যে, এক বিশ মোষও তাদের দেহ থেকে এত লোম সরবরাহ করতে পারবে না। সে ঘন-কালো লোমের জঙ্গল থেকে দুদিকে দুটো ইয়া মোটা ও লম্বা লম্বা দুটো দাঁত বেরিয়ে এসেছে। যারা বুনো শুয়োরের দাঁতের চেয়েও অনেক, অনেক বেশি বড় ধবধবে সাদা আর রীতিমত চকচকে ঝকঝকে। আর তাদের পরিধিও সে বুনো শুয়োরের দাঁতের চেয়ে কতগুণ বেশি, তার হিসাব করা বাস্তবিকই বড়ই সমস্যার ব্যাপার।
আরও আছে, সুবিশাল গুঁড়টার দুদিক থেকে সমান্তরালভাবে একটা লম্বা দাঁত সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। লম্বা ত্রিশ বা চল্লিশফুট। আর এক ঝলক দেখলেই মনে হয় সেটা বুঝি লক্ষ কোটি ত্রিভুজাকৃতি স্বচ্ছ স্ফটিকের সমন্বয়ে গঠিত। বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভা পড়ে সেটা রীতিমত ঝিমি করছে। দাঁতের গঠনও বিচিত্র। মাটির দিকে মুখ করা একটা কীলককে যেমন দেখায় ঠিক সে রকমই তার গঠন। সেখান থেকে দুজোড়া ডানা বেরিয়েছে। পেখম-মেলা ডানার মতোই দেখতে। সবগুলো পাখাই ঘন ধাতব আঁশ দিয়ে ঢাকা। আর এক একটা আঁশের ব্যাস দশ বারো ফুট তো হবেই। আর পাখাসমেত পেখম-মেলা ডানাগুলোর দৈর্ঘ্য কম করেও একশো গজ তো হবেই। এক জোড়ার ওপর তার এক জোড়া ডানা চমৎকারভাবে অবস্থান করছে।
বিকৃত আর ভয়ালদর্শন ভয়ঙ্কর সে প্রাণীটাকে, বিশেষ করে তার বুকের ওপর আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হতেই আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে এমন জমাট বাঁধা ভীতির সঞ্চার হলো যার ফলে একটা নিশ্চিত বিপদের অনুভূতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। বহু চেষ্টা করে, কোনো যুক্তি দিয়েও আমি জগদ্দল পাথরের মতো বুকে চেপে-বসা অনুভূতি দূর করে নিজেকে হালকা করে পারলাম না, কিছুতেই না।
আমি যখননিদারুণ আতঙ্ক-জ্বরের শিকার হয়ে রীতিমত কুঁকড়ে গিয়েছিলাম ঠিক তখনই আমার নজরে পড়ল, ভয়ঙ্কর সে জানোয়ারটা দুটো চোয়াল অস্বাভাবিক রকম ফাঁক হয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে তা থেকে বেরিয়ে এলো বুকের রক্ত হিম করে দেওয়া কর্কশ, একেবারেই ভয়ঙ্কর একটা স্বর, যেটা আমার স্নায়ুগুলোর গায়ে আচমকা মরণ-ঘণ্টার মতো কঠিনভাবে আঘাত হানল।
ভয়ালদর্শন দৈত্যটা পাহাড়ের পাদদেশের গভীর জঙ্গলে ঢুকে বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার পরই সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ে গেলাম। কতক্ষণ যে সেখানে সংজ্ঞাহীনভাবে এলিয়ে পড়েছিলাম বলতে পারব না।
একসময় আমার মধ্যে ধীরে ধীরে সংজ্ঞা ফিরে এলো। চোখ মেলে তাকালাম। ধীরে ধীরে উঠে বসলাম।
সংজ্ঞা ফিরে পাবার পর মেঝেতেই কিছুক্ষণ অথর্বের মতো বিষণ্ণ মনে বসে রইলাম। সেখানে বসেই আমার মনে প্রথম ইচ্ছা জাগল। একটু আগে আমি যা-কিছু দেখলাম, যা-কিছু শুনলাম সবই, কিছুমাত্রও গোপন না করে হুবহু বন্ধুর কাছে বলব।
শেষপর্যন্ত কিন্তু আমার সে ইচ্ছাটা মনেই রয়ে গেল, বন্ধুর কাছে ঘটনাটা ব্যক্ত করতে পারলাম না। আসলে মনের গোপন করে এমন একটা বিতৃষ্ণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল যার ফলে সে ইচ্ছাটাকে আমার পক্ষে আর বাস্তবায়িত করা সম্ভব হলো না। তাই যা দেখেছি, যা শুনেছি সবই আমার অন্তরের অন্তঃস্থলেই চাপা পড়ে রইল।
এ ঘটনার তিন-চার দিন পর এক সন্ধ্যায় বন্ধুবর আর আমি যে ঘরটার জানালা দিয়ে আমি যে লোমহর্ষক ঘটনাটা, যে অলৌকিক দৃশ্যটা চাক্ষুষ করেছিলাম ঠিক সে ঘরটাতেই বসেছিলাম।
