এবার আমাদের গৃহকর্তার প্রসঙ্গে কিছু বলা দরকার। সে ভদ্রলোকের মেজাজটা কিন্তু অন্য ধরনের, আমাদের মতো সন্দেহপ্রবণ অবশ্যই নয়। আর একটা ব্যাপার খুবই নজরে পড়ত, নিজের মনটা বিষণ্ণতায় ভরপুর হলেও আমাদের সে বিষণ্ণতার ভাগিদার করতে মোটেই উৎসাহি তো হতোই না, বরং আমরা যাতে মৃত্যুর নিতান্ত অবাঞ্ছিত আতঙ্কটাকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারি, তার জন্য সাধ্যমত সবদিক থেকে প্রয়াস চালিয়ে যেতেন।
আমাদের আতঙ্কের কারণ সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন থাকা সত্ত্বেও আমাদের গৃহকর্তা ভদ্রলোক কিন্তু তার ছায়াকে আদৌ ভয় করতেন না বরং মনকে শক্ত করে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার পক্ষপাতি ছিলেন।
আমি সে অভাবনীয় ভয়ঙ্কর বিষণ্ণতার অন্ধকার অতল গহ্বরে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছিলাম যেখান থেকে আমাকে তুলে এনে শান্তি-স্বস্তিদানের সব প্রয়াসই তার নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়ে যেতে লাগল। কেন? কীভাবে? কীসের প্রভাবে? তার লাইব্রেরির কয়েকটা বইয়ের প্রভাবের কথাই সবার আগে বলতে হয়।
আমাদের গৃহকর্তা ভদ্রলোকের লাইব্রেরির যে কয়েকটা বইয়ের কথা বললাম সেগুলোর বিষয়বস্তু এমন যে, আমাদের বুকের ভেতরের ঘাপটি মেরে থাকা বংশপরম্পরায় চলে-আসা কুসংস্কারগুলো নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠতে আরম্ভ করল।
গৃহকর্তার অনুমতি নেওয়া তো দূরের ব্যাপার, তার অজ্ঞাতে, একেবারেই গোপনে লাইব্রেরির বইগুলো আমি পড়তে আরম্ভ করলাম। তাই আমাকে অর্থহীন অস্বাভাবিক কল্পনায় বিভোর হয়ে থাকতে, আতঙ্কে মিইয়ে থাকতে দেখে তিনি প্রায়ই কিছু বুঝতে না পেরে মুখে কুলুপ এঁটে থাকাকেই শ্ৰেয় জ্ঞান করতেন। ফলে নীরবে
আমার ভাব গতিক লক্ষ্য করা ছাড়া মুখে টু-শব্দটিই করতেন না।
আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল, অশুভ লক্ষণ বিশ্বাসে। আমার জ্ঞানের সে অধ্যায়টাতে আমিনিজে ছিলাম সে বিশ্বাসের একজন বড় সমর্থক। সে অশুভ লক্ষণের প্রতি আস্থাভাজন আমার চেয়ে বড় কেউ থাকতে পারে কি না আমার অন্তত জানা নেই।
আমরা একটু সময়-সুযোগ পেলেই অশুভ লক্ষণ বিষয়বস্তুর প্রসঙ্গে দীর্ঘ উত্তপ্ত আলোচনায় লিপ্ত হতাম।
আমাদের গৃহকর্তা ভদ্রলোক সবকিছু শুনে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে জোরালো মন্তব্য করতেন–এরকম বিশ্বাস নিতান্তই ভিত্তিহীন। মনের দুর্বলতা থেকে এরকম বিশ্বাস জন্মায়। তারপর তা অন্তরের অন্তঃস্থলে জগদ্দল পাথরের মতো স্থায়ী আসন পেতে বসে।
তার বক্তব্যকে সমর্থন করা আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। মুচকি হেসে প্রতিবাদের স্বরে বলে উঠলাম–দেখুন, যে কোনো স্বাভাবিক ও প্রচলিত বিশ্বাসের মধ্যে কিছু না কিছু অবশ্য-সত্য থাকেই থাকে। আর সে কারণেই তো তা যথেষ্ট শ্রদ্ধা লাভ করার যোগ্য বিবেচিত হয়।
এবার শুনুন, প্রকৃত ঘটনাটা আপনাদের সামনে ব্যক্ত করছি। আমি এখানে, বিশেষ করে এ বাড়িটায় আশ্রয় নেবার পরমুহূর্ত থেকেই আমাকে কেন্দ্র করে এমন এক অত্যাশ্চর্য ও অবর্ণনীয় ঘটনা ঘটে যেতে লাগল, যার একটা বড় ভগ্নাংশই ছিল ভাবী অমঙ্গলসূচক। তাই তো আমি সেটাকে অশুভ লক্ষণ বলেই ধরে নিয়েছিলাম। আর ক্রমে তা আমার মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে স্থায়ী আসন পেতে নিল। তাতে আমি কেবল ভয়ই পেলাম না, যাকে বলে ভয়ে একেবারে মুষড়ে পড়লাম। আকস্মিক ভয়-ভীতিতে আমার বুদ্ধি যেন লোপ পেয়ে গেল।
আমি ব্যাপারটায় এমনই বিচলিত ও জ্ঞান-বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়লাম যে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমার আশ্রয়দাতা বন্ধুবরের কাছে ঘটনাটা সম্বন্ধে কিছু বলতে উৎসাহি হলাম না, বললামও না কিছুই। কয়েকবার চেষ্টা করেও আমাকে থমকে যেতে হলো, একটা কথাও বা সম্ভব হলো না।
সেদিনটায় ছিল খুবই গরম। দিনের শেষে একটা বই হাতে করে আমি খোলা জানালার ধারে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলাম। আমার চোখের সামনে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত নদীর তীর দুটো বিরাজ করছিল। আর চোখে পড়ছিল বহু দূরবর্তী। পাহাড়ের চূড়া আর পাহাড়ের গায়ের দৃশ্যাবলী। আমার কাছাকাছি সবচেয়ে কাছের। একটা জায়গার বনভূমির আকাশ-ছোঁয়া গাছগুলো পাহাড়ের ধস নামার ফলে গাছগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ায় জায়গাটাকে একেবারে ন্যাড়া ন্যাড়া মনে হচ্ছিল।
আমার কিন্তু হাতের বইটার দিকে আদৌ নজর ছিল না। অনেকক্ষণ আগে থেকেই আমার মন বইটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরের জ্বলন্ত দুঃখ-দুর্দশা আর জনমানব শূন্যতার মধ্যে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছিল। অপলক চোখে বাইরের নিকট ও দূরবর্তী। দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে শহরের চরম দুর্দশার কথাই নিরবচ্ছিন্নভাবে বইটার পাতা থেকে আমি যখন চোখ দুটোকে তুলে নিয়েছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল পাহাড়ের ওই ন্যাড়া স্থানটার ওপর। হ্যাঁ, ন্যাড়া স্থানটার ওপর দৃষ্টি পড়লেও মুহূর্তের মধ্যেই আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল তারই বিশেষ একটা কিছুর ওপর। কি সেটা তাই না? সেটা এমন বিকৃত আর ভয়ালদর্শন একটা জীবন্তু দৈত্য যে বিদ্যুগতিতে পাহাড়টার শীর্ষদেশ থেকে চোখের পলকে নিচে নেমে এলো।
ভয়ালদর্শন সে দৈত্য নিচে নেমে তেমনই দ্রুতগতিতে পাশের গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেল। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যেই সেটা চোখের আড়ালে চলে গেল।
