এবার গানের আসরের কথা বলছি। গানের আসরে ম্যাডাম ল্যানাডের নাম যখন ঘোষণা করা হল, তখন অল্পবয়সী মেয়েটাই পিয়ানোর সামনে বসে দিব্যি সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে সবাইকে মোহিত করে দিল। আসলে তো গানটা বুড়ি গায়নি, গেয়েছিল ম্যাডাম স্টিফনি ল্যানাড।
আই-গ্লাসটা কেন আমাকে উপহার দেওয়া হল, তাই না? এটা প্রবঞ্চনা আর একটা কারসাজি ছাড়া কিছুই নয়। বুড়ি সেটার কাঁচ বদল করে আমার চোখের উপযুক্ত করে রেখেছিল যাতে সেটা চোখে লাগানো মাত্র ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। আমি যে একটা পয়লা নম্বরের আহাম্মক, এবার আমি নিজেই সেটা আবিষ্কার করে ফেললাম।
এবার বিয়ের নামে ছেলেখেলার ব্যাপারটা সম্বন্ধে দু-চার কথা বলা যাক। যে পাদরী বাড়ির পোশাকের সঙ্গে আমার পোশাকের যে নিছক একটা গিট মেরে রসিকতা করেছিল। সে তো আসলে ট্যালবটের প্রাণের বন্ধু। হতচ্ছাড়াটা অবশ্যই পাদরি নয়। গাড়ি চালায়।
বিয়ের নামে বিটলেমিটা শেষ করেই ইয়া লম্বা একটা আলখাল্লা গায়ে চাপিয়ে নিজেই গিয়ে গাড়ির কোচবাক্সে বসে। গাড়ি হাঁকিয়ে আমাদের নিয়ে যায় শহর থেকে দূরে, বহু দূরের এ-সরাইখানায় নিয়ে হাজির করে নতুন বর-বউকে।
হতচ্ছাড়া ট্যালবট কোচবাক্সে, চালকের পাশেই ঘাপটি মেরে বসেছিল। সে নাকি পিছন দিককার ছোট্ট জানালাটা দিয়ে আমাদের সব কাণ্ডকারখানার ওপর নজর রেখেছে আর হেসে অনবরত গড়াগড়ি খেয়েছে।
যাক গে, আমি তো আর আমার ঠাকুমার মায়ের মাকে বিয়ে করিনি। এ-মুহূর্তে এটুকুই আমার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। আমি বিয়ে তো করেছি, ম্যাডাম স্টিফেনি ল্যানাডেকে। যদিও হাবভাব দেখে মনে হয় না, বুড়ি কোনোদিন কেঁসে যেতে পারে। আর যদি নেহাৎ দুনিয়া থেকে কোনোদিন বিদায় নেয়-ই তবে তার পর্বত প্রমাণ টাকা পয়সার মালিক তো অবশ্যই আমি হব। কারণ, সেগুলো তো আমার হকের পাওনা।
তবে একটা কথা বলে রাখছি, প্রেমপত্র লেখার পোকাগুলোকে মাথা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছি। আর চশমাকেও কোনোদিন প্রশ্রয় দিয়ে নাকে তুলব না।
দ্য স্ফিংস
নিউ ইয়র্কে যে বছর কলেরা ভয়ঙ্কর মহামারীর রূপ নিয়েছিল, সে সময় আমার এক আত্মীয় হাওখন নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। তার সেখানকার চমৎকার কুঁড়ে ঘরটায় একপক্ষকালের জন্য তার অবসর জীবনযাপনে সঙ্গদান করার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলাম।
হাতের মুঠোয় চলে-আসা একেবারে অপ্রত্যাশিত সুযোগটা হাতছাড়া করা নিছকই বোকামি ভেবে আমি সানন্দে তার আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে পারলাম না।
এক সকালে আমি সে আত্মীয়ের মনোরম কুটিরে হাজির হলাম। সে আমাকে সত্যিকারের সানন্দেই গ্রহণ করেছিল।
তখন মনোরম গ্রীষ্মকাল চলছে। সেখানে আমাদের বাসস্থানের চারদিকে গ্রীষ্মকালীন সাধারণ আমোদ প্রমোদের যাবতীয় সুব্যবস্থাই ছিল। যাবতীয় ব্যবস্থা বলতে, সকাল-বিকেল মনের খেয়ালে হৃদের পানিতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, বনের ছায়া-ছায়া পথে যত খুশি হেঁটে বেড়ানো, হ্রদের পানিতে ছিপ ফেলে মাছ ধরা, গোসল করা আর যত খুশি সাঁতার কাটা, গাছের ছায়ায় ইজেল পেতে ছবি আঁকা, ঘাসের বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে মনের সুখে বই পড়া–এসবে যদি নেহাৎ-ই মন না ভরে তবে গলা ছেড়ে গান গাওয়াতেও কোনো অসুবিধা ছিল না। এসব তো ছিলই। এছাড়া আবার বিনোদনের আরও কত রকম ব্যবস্থা ছিল তার ইয়ত্তা ছিল না। সব মিলিয়ে সেখানকার মনোলোভা গ্রাম্য পরিবেশে আমাদের দিনগুলো নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের মধ্য দিয়েই চলছিল।
কিন্তু আমাদের একমাত্র বিস্ময় ও বিষণ্ণতার কারণ ছিল শহর থেকে প্রতি সকালে আসা ভয়াবহ খবরগুলো।
এমন একটা দিনের কথা আমাদের স্মৃতিতে নেই, যে দিন আমাদের কোনো কোনো আত্মীয়ের মৃত্যু সংবাদ আসত না। ফলে রোজ সকালেই কোনো-না-কোনো আত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদে মন-প্রাণ বিষিয়ে থাকত।
ক্রমে পরিস্থিতি যখন আরও অনেক, অনেক বেশি করে ভয়াবহ রূপ নিল, তখন আমরা পথের দিকে তাকিয়ে থাকতাম কোনো-না-কোনো বন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শোনার প্রত্যাশায়। শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল, কোনো সকালে আত্মীয় পরিজনের মৃত্যু সংবাদ না পাওয়াটাই যেন অস্বাভাবিক ব্যাপার।
শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল যে, দক্ষিণের কোনো পত্র বাহককে দেখলে বা এমন কারো উপস্থিতির কথা শুনলেই আমাদের বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়ে যেত, অজ্ঞাত ও অনিশ্চিত আতঙ্কে রীতিমত মুষড়ে পড়তাম। শুধু কি এ-ই? এমনকি দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত বাতাসেই যেন মৃত্যুগন্ধ পেতে লাগলাম। সে যে কী দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার, তা কাউকে ভাষার মাধ্যমে তো নয়ই, কোনোভাবেই বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। এরকম চিত্ত দুর্বল করা চিন্তা আমাদের পেয়ে বসল, সর্বক্ষণের সঙ্গি হয়ে দাঁড়াল। প্রতিটা মুহূর্ত একই যন্ত্রণাদায়ক চিন্তা আমাদের মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগল। যার ফলে অন্য কোনো ব্যাপার স্যাপার সম্বন্ধে ভাববার অবসর তো ছিলই না, কোনো ভাবনা কাছে পর্যন্ত ঘেঁষতে পারত না। পথে-ঘাটে কারো সঙ্গে দেখা হলে ওই একমাত্র মৃত্যুর আতঙ্ক ছাড়া অন্য কোনো প্রসঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারতাম না। মোদ্দা কথা, অন্য কোনো প্রসঙ্গ ভাবতে পারতাম না, এমনকি স্বপ্ন পর্যন্ত দেখতে পেতাম না।
