আমি যখন অসহায়ভাবে বসে প্রায় কাতড়ে চলেছি ঠিক তখনই ইউজিনি এক লাফে আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার পর মুহূর্তেই আচমকা এক হেঁচকা টানে তার নকল একটা দিক আলগা করে দিল।
এবার সে প্রায় উন্মাদিনির মতো বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল–আরে, এত ভাবছ কী পাগলের মতো! আমি নিজেই তো নেপোলিয়ান বোনাপার্ট ফয়সাট, বুঝলি এবার? আমি হ্যাঁ, আমিই সেই ফ্ৰয়সার্ট–নেপোলিয়ান বোনাপার্ট ফ্ৰয়সার্ট, এবার বুঝলি তো আহাম্মক?
এবার কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে ইউজিনি বলতে লাগল–আমি আজ কাকে বিয়ে করেছি! ম্যাডাম ইউজিনি ল্যানাড ওরফে সিম্পসন, ভূতপূর্ব ময়সার্ট হচ্ছেন আমার ঠাকুরমার মায়ের মা, বুঝলে? বয়সকালে সে ছিল যথার্থই এক রূপসি রূপের আঁকর যাকে বলে।
বিরাশি বছর বয়স চলছে। কিন্তু আজও সম্রাজ্ঞীর মতো শরীরটাকে বজায় রেখেছে। শরীরের কোনো জায়গা এতটুকু দুমড়ে মুচড়ে তো যাইনি, এমনকি টোল খায়নি এতটুকুও। এতটুকু কুঁজো পর্যন্ত হয়নি। মাথার গড়ন পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে। আর চোখ দুটো? আজও দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণ্ণ রয়েছে। কুমারী বয়সে নাকের সে সৌন্দর্য পর্যন্ত আজও দিব্যি বজায় রাখতে পেরেছে। তবে মাথায় পরচুলা ব্যবহার করতে হয়েছে, ব্যস। আর সে সৌন্দর্যকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে নকল বুক আর দাঁতের পাটি জোড়া।
প্যারিসের সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞদের হাতের যাদু বলে তার বয়স কমিয়ে বার্ধক্য থেকে একেবারে যৌবনে নিয়ে এসেছে–অবিশ্বাস্য কাণ্ড। ব্যস, এবার দিব্যি যুবতি সেজে হাসিমুখে দিব্যি শহরময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যাদু, যাদুবিদ্যা রপ্ত না থাকলে কারো পক্ষে কী করে যে এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ডকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব ভাবাই যায় না।
টাকা! টাকা! আর টাকা! ইউজিনি আজ টাকার পাহাড় তৈরি করে সম্রাজ্ঞীর মতো দিব্যি বসে আছে।
প্রথম বিয়ের পর নিঃসন্তান অবস্থায় তার দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়। তাই তো মনস্থ করেছিল, আমেরিকার অধিবাসী এ-উলুকটাকে টাকার পাহাড়ের উত্তরাধিকারী করে দেবে। তার দ্বিতীয় স্বামীর দূর-সম্পর্কের এক আত্মীয়া অতুলনীয়া রূপসি ম্যাডাম স্টিফানি ল্যানাডেকে সঙ্গে করে এ-ধান্ধাতেই আমেরিকায় হাজির হয়েছে।
রঙ্গমঞ্চের আসরে গীতিনাট্য চলার সময় আমার আগ্রহ ও কৌতূহলাপন্ন নিস্পলক। চাহনি আমার পিতামহীকে সচকিত করে ও মনে কৌতূহলের জোয়ার বইয়ে দেয়।
কৌতূহলের শিকার হয়ে চোখে আই-গ্লাস লাগায়। তার ভেতর দিয়ে আমার মুখে তার পারিবারিক ছাপ লক্ষ্য করে বিস্মিত কৌতূহলাপন্ন আর আগ্রহান্বিত হয়ে পড়ে।
আগ্রহের শিকার হয়ে খোঁজ-খবর নিতে থাকে, আমি এ শহরের কোন অঞ্চলে বসবাস করি। তার সঙ্গের ভদ্রলোকটা আমার পরিচয় ও ঠিকানা জানত। সে-ই আমার যাবতীয় তথ্য তাকে বলে দেয়।
যাবতীয় তথ্য পাওয়ার পর আমার ঠাকুমার মায়ের মার মনে আগ্রহ আরও হাজার গুণ বেড়ে যায়। আবার চোখে আই-গ্লাস লাগিয়ে আমার পা থেকে মাথা অবধি ভালো কওে নিরীক্ষণ করে নেয়। এ দেখাটাই আমার সর্বনাশটা ডেকে আনে।
আমি তখন আনন্দের জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে কি কি করেছি, সবই তো। খালাখুলিভাবেই বলেছি। ঠাকুমার মায়ের মা ঘাড় কাত করে তখন আমার অভিনন্দন কেন ফিরিয়ে দিয়েছিল, তাই না? বুড়িটা নির্ঘাৎ ধরে নিয়েছিল, আমিও তাকে কোনো না-কোনোভাবে চিনতে পেরে গেছি।
এবার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি কেন এভাবে প্রবঞ্চিত হলাম? এখন আমি বলব, আমার দুর্বল চোখ দুটো আর বুড়িটার অসাধারণ প্রসাধনের কেরামতি।
আমি যখন ট্যালবটের কাছে মেয়েটার পরিচয় জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছি, সে কিন্তু নিঃসন্দেহই হয়েছিল, আমি বুড়ির সঙ্গিনী অল্পবয়সা মেয়েটার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছি। আর তার পক্ষে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই সে সেবারেই আমার কথার জবাব দিয়েছে স্বনামধন্যা ম্যাডাম ল্যানাডে। বিধবা। উপযুক্ত বরসংগ্রহের ধান্ধায় প্যারিস ছেড়ে লন্ডন শহরে এসে ঘাঁটি গেড়েছে।
পরদিনই পথ চলতে গিয়ে বুড়িটার সঙ্গে হঠাৎ ট্যালবটের দেখা হয়ে যায়। বলাবাহুল্য তার সঙ্গে বুড়ির আগেই পরিচয় হয়েছিল। পথের মাঝেই উভয়ের মধ্যে আমার প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। আমার চোখের দুর্বলতার জন্য রঙ্গশালায় যা-কিছু ঘটেছে তার ব্যাখাও মিলে গেছে। বুড়ি ধরেই নিয়েছে, আমি হয়তো তাকে চিনতে পেরে আনন্দে উথলে উঠেছি। তাই তো আমার ইশারায় সাড়া দিতে দেরি করেনি। আর এরই ফলে আমি নিতান্ত বোকা হাঁদার মতো খোলাখুলিভাবেই প্রেমের ইঙ্গিত একের পর এক দিয়ে গেছি।
আমি অকপটে স্বীকার করছি, রূপসি যুবতিদের প্রতি আমার মনে অস্বাভাবিক দুর্বলতা রয়েছে। আর এর জন্য আমার অবশ্যই শাস্তি হওয়া দরকার।
বুড়িটা আমার বন্ধু ট্যালবটের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মতলব এঁটেছে। গভীর ষড়যন্ত্রও বলা চলে। বুড়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ভয়েই ট্যালবট ইচ্ছে করেই শহর থেকে কেটে পড়েছে।
পথের মাঝে দাঁড়িয়ে যে তিন বন্ধু পঞ্চমুখে রূপসি বিধবা ম্যাডাম ল্যানাডের রূপ সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিল–এ ক্ষেত্রেও তারা অল্পবয়সী মেয়েটার কথাই বুঝেছিল।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, দিনের আলোয় কোনোদিনই বুড়িকে কাছ থেকে দেখা সম্ভব হয়নি। আরও বড় কারণ হচ্ছে আমি চোখে চশমা কোনোদিনই ব্যবহার করিনি। এ বস্তুটার প্রতি বরাবরই আমার অনীহা, কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারি না। তাই তো পাশাপাশি বসেও বুড়ির বয়স সম্বন্ধে কোনোদিনই কোনোরকম ধারণা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
