হায় ঈশ্বর! এ কী দেখালে আমাকে! ওগুলো কি দাঁত নাকি? তার দাঁতের এ-হাল হলো কি করে? হায় ঈশ্বর এ কী দেখালে!
আমি মুহূর্তমাত্র দেরি না করে এক ঝটকায় নাকের ডগা থেকে আই-গ্লাসটাকে নামিয়ে আনলাম। চরম বিতৃষ্ণায় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো এক লাফে খাঁটিয়া ছেড়ে উঠে পড়লাম। আমি ক্রোধোন্মত্ত বাঘের মতো অনবরত ফুঁসতে লাগলাম। মুহূর্তে যেন বাশক্তি হারিয়ে ফেললাম।
দেখলাম, মিসেস সিম্পসন গগামড়ামুখে অদূরে বসে রয়েছে।
আতঙ্কের সঙ্গে অপরিমিত ক্রোধ গাটছড়া বাঁধায় আমার জিভটাও যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। হায় ঈশ্বর! এ কী অত্যাদ্ভুত দশা হলো আমার!
মিসেস সিম্পসন হঠাৎ বলে উঠল–এ কী কাণ্ড করছ! এভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছ কেন? ব্যাপারটা কি বুঝছি না তো! আমাকে কি তোমার এখন আর পছন্দ হচ্ছে না? ভালো লাগছে না?
আমি ক্রোধ সম্বরণ করতে না পেরে উন্মাদের মতো গর্জে উঠলাম– হরামজাদি! ডাইনি কোথাকার! নচ্ছার মেয়ে মানুষ! বুড়ি ঘাটের মড়া শকুনি কোথাকার!
সে-ও বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠল–কী বললে, আমি বুড়ি? বিরাশি বছরের মেয়েকে তুমি বুড়ি বলে গালমন্দ করছ অপমান করছ!
কী বললে, বিরাশি বছর! কথাটা সোনামাত্র আমার মাথাটা আচমকা চক্কর মেরে উঠল। কোনোরকমে দেওয়ালের গায়ে শরীরের ভার সঁপে দিতে না পারলে, মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়েই যেতাম। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বাজ-পড়া রোগীর মতো অনবরত কাতড়াতে লাগলাম।
আমি অতি কষ্টে স্মৃতিশক্তিকে চাঙা করে তুলে আপন মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম–ছবিটার পিছনে তো সাতাশ বছর সাত মাস বয়স লেখা ছিল।
সে কণ্ঠস্বরে স্বাভাবিকতা বজায় রেখেই এবার বলল–কিছুমাত্রও ভুল দেখনি। আসলে ছবিটা তো আঁকা হয়েছিল পঞ্চান্ন বছর আগে। দ্বিতীয়বার জনাব ল্যানাডেকে বিয়ে করার সময় এটাকে এক অভিজ্ঞ শিল্পী এঁকেছিল।
পঞ্চান্ন বছর আগে! দ্বিতীয় বার বিয়ে!
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। আমর প্রথম স্বামী ময়সার্টের মেয়ের জন্য এটা আঁকিয়ে ছিলাম।
ময়সার্ট! মি. ময়সাট!
আরে হ্যাঁ-হ্যা! মি. ময়সার্ট। আমার প্রথম স্বামী ময়সার্টের কথা বলছি। ব্যাপার কী? ময়সার্টকে চেনো না তুমি?
না, কোনোদিনই না। ময়সার্ট আমার এক পূর্ব পুরুষের নাম ছিল। ব্যস, এর বেশি কিছুই জানা নেই। কিন্তু তুই ডাইনি, শকুনি, বুড়ি। ঘাটের মড়া ছাড়া তোকে আমি অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না।
নামটা ভারি সুন্দর, তাই না? ভয়সার্ট নামটাও কিন্তু মনে দোলা দেয়, ঠিক বলিনি?
হুম! আমি গুলি খাওয়া বাঘের মতো অনবরত ফুঁসতে লাগলাম।
সে পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনে বলে যেতে লাগল–শোনো, মি, ভয়সার্টকে আমার রূপসি কুমারি মেয়ে বিয়ে করে ঘর রাঁধতে চেয়েছিল।
বুড়ি শকুনি! ময়সার্ট! কী সব আজেবাজে কথা তখন থেকে সমানে বলে যাচ্ছিস!
কি বলতে চাচ্ছি ধৈর্য ধরে শোনো–আমার মেয়ের মেয়ে কুমারী ভয়সার্ট মি. ভয়সার্ট-এর গলায় বরমাল্য দিয়ে তার ঘর করতে গিয়েছিল। আমার মেয়ের নাতনি মি. ফ্ৰয়সার্টকে স্বামীত্বে বরণ করে নিয়েছিল। কী চমঙ্কার সব নাম, ঠিক কি না?
কি বললি বুড়ি শকুনি, ফ্ৰয়সার্ট! মনে হচ্ছে, আমি বুঝি এবার সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়েই পড়ব। আরে বাবা! ময়সার্ট, ভয়সার্ট, ক্ৰয়সার্ট আর ফ্ৰয়সাট–কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল! সব কিছু আমার কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে!
আরে ভাই ফয়সার্ট তো একটা নিরেট আহাম্মক। আমেরিকায় মরতে গিয়েছিল হতচ্ছাড়াটা। সেখানে সে একটা ছেলেও পয়দা করেছিল। সেটা ছিল একটা আস্ত উল্লুক।
হুম্! আমি ক্রোধে স্বগতোক্তি করলাম।
সত্যি বলছি, এমন আহাম্মক আমি আগে কোনোদিনই দেখিনি। কেবল আমার কথাই বা বলি কেন? আমার বান্ধবী ম্যাডাম স্টিফানি ল্যানাডেরও সে দুর্ভাগ্য কোনোদিন হয়নি। হতচ্ছাড়াটার নাম কী জানো? আমি তার কথার জবাব না দিয়ে ভেতরে ভেতরে গজরাতে লাগলাম।
সে বলেই চলল–হতচ্ছাড়া ছোঁড়াটার নাম ছিল, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফ্রয়সাট। বেশ নাম বটে, তুমি কী বল?
কথা বলতে বলতে ইউজিনি যেন মৃগী রোগীর মতো দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে যাওয়ার যোগাড় হলো। যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত একটা লাফ দিয়ে ঘরে একেবারে মাঝামাঝি জায়গায় এসে পড়ল। মনে হলো যেন ডাইনিতে নতুবা কাঁধে পেত্নী ভর করেছে। তিড়িং বিড়িং করে নাচতে নাচতে মাথা থেকে টুপিটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতেই হঠাৎ তার পরচুলা খুলে দুম্ করে মেঝেতে পড়ে গেল। এবার বিকট আর্তনাদ করে আমার দিকে ঘুষি বাগিয়ে আমার নাকের সামনে অনবরত নাচাতে লাগল। আর পেত্নীর মতো তিড়িং বিড়িং করে লাফানো আর গলা-ফাটানো চিৎকার সমান তালেই চালাতে লাগল। সে যে কী উদ্দাম নাচ! তা আর কহতব্য নয়।
তার বুক-কাঁপানো চিৎকারে আমার কানের পর্দা ফেটে যাবার যোগাড় হলো।
নাচতে নাচতে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বার-কয়েক মুখ খিচুনি দিই মুখ থেকে নকল দাঁতের পাটি দুটো খুলে ছিটকে গিয়ে মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল।
আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো অবস্থা আমার মধ্য থেকে লোপ পাওয়ায় আমি দুপা পিছিয়ে গিয়ে দুম্ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। আর বিমর্ষমুখে মন্ত্রের মতো অনুচ্চকণ্ঠে ময়সার্ট আর ভয়সার্ট! ভয়সার্ট আর ময়সার্ট–অনবরত উচ্চারণ করতে লাগলাম।
