অনুষ্ঠানের শেষে সবাই যখন এক-এক করে বেরোত আরম্ভ করবে তখন হৈ হট্টগোলের মধ্যে ম্যাডাম গিয়ে দরজায় অপেক্ষমান গাড়িতে ঝটপট বসবে। সেখান থেকে সোজা আগে থাকতে বন্দোবস্ত করে রাখা এক পাদরির বাড়ি হাজির হব। সেখানেই আমাদের বিয়েটা চুকিয়ে নেব।
পাদরির বাড়ি থেকে বেরিয়ে বন্ধুবর ট্যালবটকে তার বাড়ির দরজায় বসিয়ে দেব। ব্যস, এভাবে কাজ মিটিয়ে আমরা সোজা পূর্বাঞ্চলের দিকে যাত্রা করব। প্রাচ্যের কোনো একনিরিবিলি অঞ্চলে গিয়ে আমরা ঘর বাঁধব। আমাদের দেখে সম্ভ্রান্ত ও সৌখিন সমাজ যখন কৌতূহলাপন্ন হয়ে পড়বে, গোপনে সমালোচনায় লিপ্ত হবে তখনই আমরা সেখান থেকে চম্পট দেব।
পরিকল্পনার খসড়াটা পাকাপাকি করে ফেলতে পেরেছি তখনই, আর মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে গাইয়েদের আখড়া থেকে আমি কেটে পড়লাম।
বন্ধু ট্যালবটের খোঁজে রওনা হওয়ার পূর্বমুহূর্তে আমি পথের ধারের ছোট্ট একটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। উদ্দেশ্য, আই-গ্লাসের ভেতর দিয়ে ছোট্ট ছবিটাকে ভালোভাবে দেখে চোখ-আর মনকে একটু তৃপ্ত করে নেওয়া। করলামও ঠিক তাই।
ছবিটাকে বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর সেটাকে উলটে দিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কয়েকটা অক্ষর। দেখলাম লেখা রয়েছে–ইউজিনি ল্যানাড বয়স সাতাশ বছর সাত মাস ব্যস, এর বেশি আর একটা শব্দও লেখা ছিল না।
গাড়িটা বার কয়েক বাঁক ঘুরে বন্ধু ট্যালবটের বাড়ির সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। বন্ধুকে বাড়িতেই পেয়ে গেলাম।
কুশল সংবাদাদি আদান-প্রদান ছাড়া অতিরিক্ত আর একটা শব্দও উচ্চারণ না করেই আমি আমার সৌভাগ্যের কথা ঝটপট তাকে অত্যুত্র আগ্রহের সঙ্গে ব্যক্ত করলাম।
আমার ভাগ্য খোলার কাহিনী শুনে ট্যালবট খুবই অবাক হলেও আমাকে অভিনন্দন জানাতে কিন্তু সে ভুল করল না। আর সে সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিল, আমাকে সে এ-ব্যাপারে সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা করবে।
রাত দুটোয় ইউজিনি আর আমি একটা ঢাকা-গাড়িতে চেপে সোজা উত্তর-পশ্চিম দিকে ধেয়ে চললাম।
পাদরি সাহেবের বাড়িতে, তারই পৌরহিত্যে রাত দুটোর সময় আমাদের বিয়ের পাট ভালোভাবেই সেরে নিলাম।
বন্ধুবর ট্যালবটই শহর থেকে সাতাশ মাইল দূরবর্তী এক গ্রাম্য পরিবেশের অখ্যাত অজ্ঞাত এক সরাইখানায় আমাদের মধুচন্দ্রিমা যাপনের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। কারণ, আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।
সরাইখানা থেকে ভোরে জল-খাবারের পাট চুকিয়ে আমাদের আবার গাড়িতে উঠতে হবে। এবারই আমাদের আসল যাত্রা শুরু হবে। ( কাঁটায়-কাঁটায় চারটার সময় আমাদের গাড়িটা সরাইখানার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর হাত ধরে গাড়ি থেকে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনলাম।
এখন সবে পূর্ব-আকাশে রক্তিম ছোপ দেখা দিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জল খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে আমরা দুজন সরাইখানার বারান্দায় একটা খাঁটিয়ার ওপর বসলাম।
আমি নিস্পলক চোখে আমার পাশে বসে থাকা চোখ ধাঁধানো রূপের ডালি গায়ে মাখা দেবী-মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার মনে হল–যাকে সহধর্মিনীরূপে পাওয়ার জন্য আমি এতদিন উন্মাদপ্রায় হয়ে গিয়েছিলাম আজ সে সত্যি সত্যি আমার সহধর্মিনী হয়ে আমার পাশে, একেবারে গা-ঘেঁষে অবস্থান করছে।
তাই একেবারে কাছ থেকে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার জন্য আমি বড়ই মানসিক চাঞ্চল্য বোধ করলাম। আমার এ ইচ্ছাটার কারণও তো রয়েছে যথেষ্ট। সত্যি কথা বলতে কি, দিনের আলোয় তাকে দেখার এমন অপূর্ব সুযোগ তো এর আগে মুহূর্তের জন্যও বরাতে জোটেনি।
আমার মনের কথা আমার সদ্য বিয়ে করা বউ ইউজিনি মুখে হাসির ছোপ ফুটিয়ে তুলে বলে উঠল–আশাকরি কাল রাতের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যাও নি কী বলো?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম। সে মুখের হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই এবার বলল–কাল রাতে কথা দিয়েছিলে, দিনের আলো ফুটে উঠলেই চশমা চোখে লাগাবে আর সারা জীবনে সেটা চোখ থেকে খুলবে না, মনে নেই?
আমি থতমত খেয়ে বললাম–আছে, অবশ্যই মনে আছে। তবে কি প্রতিশ্রুতি দিয়ে–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম–প্রতিশ্রুতি যখন দিয়েছি তখন রক্ষাও করব অবশ্যই।
আমি চশমাটা নাকে লাগানো মাত্র ইউজিনি নড়েচড়ে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে বসল। আমার কাছে কিন্তু তার বসার এ ভঙ্গিকে তেমন সুন্দর কিছু মনে হলো না।
চশমাটা নাকে বসাতে না বসাতেই আমি গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম–একী! চশমাটার হলো কী?
সঙ্গে সঙ্গে আই-গ্লাসটাকে নাক থেকে নামিয়ে এনে রুমাল দিয়ে জোরে ঘষে ঘষে মুছতে আরম্ভ করলাম। তারপর আবার নাকে লাগিয়ে দিলাম।
চশমাটা নাকে লাগিয়ে প্রথমবার আমি অবাক হয়েছিলাম। আর দ্বিতীয়বার? দ্বিতীয়বার স্তম্ভিত না হয়ে পারলাম না। কেবলমাত্র স্তম্ভিত বললে ঠিকঠিক বলা হবে না। মানুষ যখন অত্যধিক স্তম্ভিত হয় তখন তা আতঙ্কে পরিণত হয়।
আমি আই-গ্লাসের ভেতর দিয়ে যাকে প্রত্যক্ষ করলাম, তাকে মূর্তিময়ী বিভীষিকা ছাড়া আর কিছুই ভাবা সম্ভব নয়। এর চেয়ে কদারকার কোনো মূর্তি হতে পারে বলে আমার অন্তত জানা নেই। তার মুখের দিকে চোখ পড়ামাত্র আমার সর্বাঙ্গ রীতিমত থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল। আর শরীরের সবকয়টা স্নায়ু যেন একই সঙ্গে ঝনঝ নিয়ে উঠল। হায়! আমি কি তবে নিজের চোখ দুটোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছি? আমি সংশয়ের দোলায় দুলতে লাগলাম। ওটা কি? ওটাই বা কি দেখছি? তবে কি বলিরেখা? আমার স্বপ্নের রানির এমন সুন্দর মুখায়বে আমি এসব কি দেখছি!
