আর সদর রাস্তায় দেখা যাচ্ছে, অবগুণ্ঠনে ঢাকা পাল্কি, মহিলা বহনকারী শিবিকা। আর বহুমূল্য মসলিন ও জরি প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হাতি মনিবকে পিঠে, নিয়ে দুলকি চালে পথ পাড়ি দেওয়ার দৃশ্যটাও কম দৃষ্টিনন্দন নয়।
পথচারীদের কতাবার্তা চিৎকার চ্যাঁচামেচি আর হৈ চৈ আর ভিড়ের মধ্যে ঝলমলে রাজপোশাকে সজ্জিত হয়ে, মাথায় বাহারি পাগড়ি চাপিয়ে বুক পর্যন্ত নেমে-আসা লম্বা দাড়িওয়ালা লক্ষ লক্ষ কুচকুচে কালো ও হলদেটে মানুষের ভিড়ে অগণিত পবিত্র ষাঁড় নির্ভয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আকাশচুম্বি মিনার, মসজিদের কার্নির্স আর উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর পবিত্র জানালায়র গায়ে ময়লা জড়ানো হাজার হাজার হনুমান বিচিত্র ভঙ্গিতে ঝুলে রয়েছে। এ যেন সত্যি বড় অদ্ভুত এক দৃশ্য।
নদীর তীর ঘেঁষে জনবহুল সদর রাস্তা এগিয়ে গেছে। সেটা থেকে নদীর পানি পর্যন্ত বহু ঘাট নেমে গেছে। এগুলো শহরবাসীদের স্নানের ঘাট।
আর নদীর হালকা ঢেউয়ের ওপর দিয়ে মাল বোঝাই বড় বড় জাহাজ এগিয়ে চলেছে। পালতোলা নৌকার সংখ্যাও কম নয়।
শহরের সীমানার বাইরে থেকে সারি সারি তাল ও অন্যান্য আকাশছোঁয়া গাছ উঁকি দিচ্ছে। ছোট-বড় বহু ফল বাগিচার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। আর এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চাষের ক্ষেত। কোনো কোনোটাতে ফসলও ফলেছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে ছোট-বড় মাটির দেওয়াল আর খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর। সুবিশাল একটা জলাশয় আর নির্জন পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে জীর্ণ অথচ বেশ বড় সড় একটা মন্দির। পথের ধারে, মাঠের গায়ে বেদেদের তাঁবুও দেখা যাচ্ছে। মাথায় কলসি নিয়ে এক মেয়েমানুষ সিঁড়ি বেয়ে নদীর ঘাটে নামতে দেখা যাচ্ছে। আমি স্বপ্নে বিভোর ছিলাম বলেই এমন কথা শোনাচ্ছি, আপনারা হয়তো বলবেন। আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়। আমি যা-কিছু চাক্ষুষ করেছি, যা-কিছু শুনেছি, অন্তর দিয়ে যা-কিছু উপলব্ধি করেছি আর ভেবেছি–তার মধ্যে স্বপ্ন দেখার কোনো ব্যাপার-স্যাপার তো দূরের ব্যাপার সামান্যতম খামখেয়ালির স্থানও ছিল না। আরও পরিষ্কার করে বললে সবকিছুর মধ্যেই সামঞ্জস্যের ছোঁয়া ছিল পুরোদস্তুর।
তবে স্বীকার করছি, গোড়ার দিকে আমি সন্দেহের দোলায় দুলছিলাম। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বার বার সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল। আমি ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে আছি, নাকি পুরোপুরি জেগে আছি। ব্যাপারটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও কম করিনি। আর তার পরই আমি বুঝতে পারলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, আমি সত্যি সত্যি জেগেই আছি। তাই তো এসব দৃশ্যকে আমি সম্পূর্ণ বাস্তব, শতকরা একশো ভাগই সত্য ঘটনা বলেই মনে। করছি, অতএব,
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ডাক্তার টেম্পলটন আগ বাড়িয়ে বলে উঠলেন–‘দেখুন ভাই, আমি অবশ্য ব্যাপারটা, নিয়ে বড় একটা ভাবিত নই, তবে বলছি, আপনি নির্দিধায় চালিয়ে যান, আমি শুনছি।
মুহূর্তের জন্য নীরব থেকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মি. বেডলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন–‘আপনি গাছতলা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে এগোতে লাগলেন, তাই তো বললেন, ঠিক কি না?
‘হ্যাঁ, আমি শহরের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
‘তারপর? তারপর কী হল?
চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে মি. বেডলো ডাক্তারের মুখের দিকে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ময়ের ঘোরটুকু কাটিয়ে নিয়ে আবার মুখ খুললেন–হ্যাঁ, বলেছেন ঠিকই। আমি গাছের তলার ঘাসের বিছানার আশ্রয় ছেড়ে উঠে পায়ে পায়ে শহরের দিকে এগোতে লাগলাম।
ডাক্তার টেম্পলটন চশমার ফাঁক দিয়ে মি. বেডলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে তার কথাগুলো গিলতে লাগলেন।
মি. বেডলো বলে চললেন–‘শহরের দিকে এগোবার সময় পথে বহু লোকজনের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হল। দেখলাম, সবাই ভিড় করে ব্যস্ত পায়ে একই দিকে চলেছে। আর এও লক্ষ্য করলাম, সবার মুখেই উত্তেজনার ছাপ সুস্পষ্ট। ব্যাপারটা আমাকে যে কেন এত ভাবিয়ে তুলল বুঝতে পারলাম না। সত্য গোপন না করলে বলতেই হয়, ব্যাপারটা সম্পর্কে আমি যারপরনাই কৌতূহলের শিকার হয়ে পড়লাম। আর এও। স্বীকার করে নিচ্ছি, ভীড় করে এগিয়ে চলা লোকজনের ওপর আমার মনে তীব্র একটা শত্রুতার ভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
আমি পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে যন্ত্রচালিতের মতো সেখান থেকে সরে পড়লাম। সাধ্যমত দ্রুততার সঙ্গে পা চালিয়ে ঘুর পথে শহরে হাজির হয়ে গেলাম।
আমি শহরে পা দিয়েই দেখি, শহর জুড়ে হৈ হট্টগোল চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোলমাল তুঙ্গে উঠে গেল। ব্যস, দেখতে দেখতে বেঁধে গেল তুমুল লড়াই। দল দুইটির মধ্যে একদল আধা বৃটিশ ইউনিফর্ম পরিহিত পদস্থ অফিসারগণ আর আধা বৃটিশ ও আধা ভারতীয় পোষাক পরিহিত মানুষের ছোট একটা দল। আর বিপক্ষে লড়াই করছে, বিভিন্ন গলিপথ থেকে বেরিয়ে আসা দুষ্ট প্রকৃতির একদল লোক।
হ্যাঁ, তুমুল গণ্ডগোল চলতে লাগল। আমি অদূরবর্তী পথের ধারে দাঁড়িয়ে কর্তব্য সম্বন্ধে ভাবতে লাগলাম। মুহূর্তে মনস্থির করে ফেললাম, লড়াইয়ে ভিড়ে যাওয়াই সঙ্গত মনে করলাম। আমি এক লাফে এগিয়ে গিয়ে কোনো এক মৃত অফিসারের হাত থেকে ছিটকে পড়া অস্ত্রপাতি কুড়িয়ে নিয়ে দুর্বলতর দলটার হয়ে লড়াইয়ে মেতে গেলাম।
কাদের মধ্যে লড়াই হচ্ছে, কেনই বা লড়াইয়ের সূত্রপাত কোনোকিছু বিচার বিবেচনা না করেই আমি এলোপাথাড়ি অস্ত্র চালাতে লাগলাম। সে যে কী লড়াই ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
