কেবল আমার কথাই বা বলি কেন? ইউজিনির অবস্থাও আমারই মতো। তার কথাগুলোও যেন গলা দিয়ে কেঁপে কেঁপে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই লক্ষ্য করলাম, তিনি গান ধরতেই যেন কণ্ঠস্বরের স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়ে গেলেন। আমি রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে, নিতান্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো তন্ময় হয়ে তার মধুঝরা কণ্ঠের গান শুনতে লাগলাম। এমন মধুর কণ্ঠস্বর যে স্বর্গের দেবী ছাড়া মর্ত্যের কোনো মানবীর হতে পারে, তা আমার কল্পনায়ই ছিল না।
আমরা দুজনে কাছাকাছি পাশাপাশি বসে দীর্ঘসময় ধরে কথাবার্তা বলছিলাম। কোনো দিক থেকেই বাধা আসেনি, আপত্তিও করেনি কেউ-ই। যাকে বলে একেবারে মনভরে অনর্গল নিজের কথা বলে গিয়েছিলাম।
আমার প্রাণাধিকা ইউজিনি কিন্তু আমার মতো ধৈর্য ধরে শুনেছিল। আমি আগেই মনস্থির করেছিলাম, আমার নিজের সম্বন্ধে যা-কিছু বলব তার একটা কথাও গোপন করব না, বাদও দেব না কিছুই। কলেজ জীবনে যত নষ্টামি করেছি, ছোটখাট টুকরো টুকরো যত গর্হিত কাজ করেছি, শরীরের ওপর যতভাবে অত্যাচার করেছি, বিবেকে কতরকমের কু-মতলব জমা আছে আর কাকে-কাকে ভালোবেসেছি আর প্রেমের নামে কতভাবে খেলায় মেতেছি–এসব কথার কিছুই বাদ দিইনি।
একবার অস্বাভাবিক ঠাণ্ডায় ঘোরাফেরা করার জন্য বুকে কফ বসে যাওয়ায় ক্রনিক ব্যাধিতে ভুগতে হয়েছিল, বাতের ব্যথা বেদনায় বেশ কিছুদিন ভোগান্তিতে পড়েছিলাম। এসবে মূলে আমার বংশগতির প্রভাব রয়েছে, তা-ও বলেছি। সব শেষে আমার চোখের দুর্বলতার কথা বলতেও বাদ দেইনি।
আমি চোখের দুর্বলতার কথাটা পাড়তেই, ইউজিনি সশব্দে হেসে উঠল।
আমি তার আকস্মিক হাসি, কারণ কিছুই ধরতে না পেরে, ঢ্যাবাচ্যাবা চোখে তার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম।
হাসি থামিয়ে এক সময় সে বলল–এটা মুখ ফুটে না বললেও আপনার দুর্বলতাগুলো আজ না হোক কাল তো জানাজানি হবেই হবে। অতএব আগেভাগেই স্বীকার করে নিয়ে ভালোই করেছেন।
কথাটা বলার সময় তার গাল দুটো এমন রক্তিম হয়ে উঠল যে, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারেও আমি যেন স্পষ্টই দেখতে পেলাম।
ইউজিনি এবার একটা দূরবীন আঙুলে নাচাতে লাগল। আমার চিনতে অসুবিধা হলো না, রঙ্গমঞ্চে নৃত্যনাট্য দেখার সময় সে এটা ব্যবহার করেছিল।
তার প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম–হ্যাঁ, এ-যন্ত্রটার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে অবশ্যই। আগেই আপনার চোখে দেখেছিলাম। এবার হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখা যাক। কথা বলতে বলতে দূরবীনটা তার হাত থেকে নিলাম। আবছা অন্ধকারেও বুঝতে পারলাম, যন্ত্রটা খুবই দামি, সন্দেহ নেই।
আমার মধুমিতা মুচকি হেসে বলল তোমার প্রেমে আমি যারপরনাই মুগ্ধ। আমি শপথ করছি কাল, হ্যাঁ, কালই বিয়ের মালা গলায় পড়ব। কিন্তু এর বদলে আমি কিন্তু ছোট্ট একটা অনুরোধ রাখতে যাচ্ছি।
অনুরোধ! অনুরোধ না বলে তার চেয়ে বরং বলুন আদেশ।
ঠিক আছে, আপনার কথাই হবে, আদেশ–
হাজার বার। এমন গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে আমি কথাটা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম যে, ধারেকাছে যারা ছিল সবাই রীতিমত চমকে উঠে। আমার দিকে আতঙ্কিত দৃষ্টি মেলে তাকাল।
সবার দৃষ্টি আমার দিকে ছিল বলে আমি নিজেকে সামলে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। নইলে আমি অবশ্যই দুম করে তার পায়ে পড়ে যেতাম।
আমি ভাবাপুত কণ্ঠে বলে উঠলাম–প্রিয়তমা, আমার প্রিয়তমা ইউজিনি তোমার আদেশটা কি, বলো? কেবলমাত্র একটা বার তোমার অনুরোধের কথা আমাকে বলো?
শুধুমাত্র এ দূরবীন–তাই-গ্লাসটা চোখে লাগাতে হবে।
আই-গ্লাস!
আসলে ডাবল আই-গ্লাস তো। একটু চেষ্টা করে অ্যাডজাস্ট করে নিলেই দিব্যি একটা লেখায় পরিণত হয়ে যাবে। আমি অবাক বিস্ময়ে ঢ্যাব-ঢ্যাব চোখ মেলে তার দিকে তাকালাম। পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনে সে এবার বলল–এটা চোখে লাগালে তোমার মহত্ব আরও অনেকাংশে বেড়ে যাবে। আর দৃষ্টিশক্তি প্রকটতর হবে। বহু মূল্যবান বস্তু। যত্ন করে কোটের পকেটে রেখে দিও। একবার মুখ ফুটে বল, তুমি রাজি? যদি রাজি হয়ে যাও তবে আমি বলব, তুমি সত্যি সত্যি আমাকে অন্তর থেকে ভালোবাস।
ব্যাপারটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তার অনুরোধটা শুনে আমি কেমন বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম। মাথার মধ্যে সবকিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু তখন আমার যা হাল হয়েছে, তাতে ওজর-আপত্তির কথা তো আমার পক্ষে ভাবাই সম্ভব নয়।
আমি শুকনো, কাঁপাকাপা গলায় উচ্চারণ করলাম–রাজি। আমি রাজি। আমার ভেতরটা মুহূর্তে মিইয়ে গেলেও জোর করেই বলে উঠলাম–আমি রাজি! রাজি! রাজি!
ইউজিনি সোল্লাসে বলে উঠল–রাজি! তুমি রাজি!
হ্যাঁ, আমি রাজি। আমি রাজি হয়েছি কেবলমাত্র তোমার প্রেমের খাতিরে। তোমার অন্তরের ভালোবাসা পাবার জন্য, অন্তরে চশমা বিস্তৃত থাকা সত্ত্বেও আমি রাজি না হয়ে পারছি না।
ইউজিনি সোল্লাসে বলে উঠল-সাবাস! এই তো চাই।
নিছক একটা আই-গ্লাস হিসেবেই আজ রাতে আমি এটাকে গলায়, আমার বুকের ওপর ঝুলিয়ে রাখব। কাল ভোরে যখন তোমাকে স্ত্রী বলে সম্বোধন করার সৌভাগ্য হবে তখন থেকে আমৃত্যু এ আই-গ্লাসটা আমার নাকের ওপরে অবস্থান করবে। ব্যস, পর মুহূর্তেই আলোচনার মোড় ঘুরে গেল। আগামীকালের আলোচনায় আমরা ডুবে গেলাম।
জানতে পারলাম, ট্যালবট নাকি আগামীকালই শহরে ফিরে আসছে। অনুমান করা যাচ্ছে, রাত দুটো নাগাদ গানের মজলিস ভাঙবে। তারপরেই গাড়ি নিয়ে আমরা বন্ধুবরের খোঁজে যাব।
