কেন? আমি তো আপত্তিকর কোনো কথা বলছি না।
তবে?
বলছি এমন সাততাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যাওয়াটা কি সঙ্গত হবে, আপনি বলুন?
অসঙ্গত? কেন? এতে অসঙ্গতের কী-ই বা থাকতে পারে?
আমি বলতে চাচ্ছি, ব্যাপারটা কেবলমাত্র অসঙ্গতই নয়, নিতান্তই অন্যায় করা হবে বলেই তো আমি মনে করছি। একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখলেই আপনিও হয়তো আমার কথায় সায় না দিয়ে পারবেন না।
ম্যাডাম ল্যানাডে মিষ্টিস্বরেই বুকে কাঁটা বেঁধানো কথাগুলো হাসিমুখে বলে গেল।
আমার বুকটা ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেলেও তার যুক্তির কাছে হার না মেনে পারলামই না।
আরও আছে, আমি যে নিতান্তই একজন অবিবেচক এবং মাথায় বুদ্ধি তেমন কিছু নেই, ম্যাডাম তা-ও আমাকে না শুনিয়ে ছাড়ল না।
কিন্তু আমারই বা দোষ-ত্রুটি কোথায়, বুঝবই বা কী করে? আসলে ম্যাডাম ল্যানাডে-র প্রকৃত পরিচয় কি, তার ভবিষ্যতই বা কি, তার আত্মীয় পরিজনরাই বা কেমন আর তার সামাজিক খ্যাতি-অখ্যাতিই বা কতটুকু–এসবের বিন্দুবিসর্গও কি আমার জানা আছে ছাই?
শেষপর্যন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্যাডাম বললেন–তাই বলছিলাম কি, বিয়ের ব্যাপারটা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখবেন। এ মুহূর্তে যাকে ভালোবাসা বলে আমরা মাতোয়ারা হয়ে পড়েছি, তা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আলেয়ার আলোতে পরিণত হয়েও যেতে পারে।
প্রকৃতির বুকে যখন সন্ধ্যার আলো-আঁধারীর খেলা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই আমার স্বর্গের অন্সেরা, আমার মন্মোহিনী দেবী ম্যাডাম কথাগুলো বলে নিজেকে ধীরে ধীরে শামুকের মতোই গুটিয়ে নিল। যেন নিজের মধ্যেই নিজে আত্মগোপন করল।
আর আমি? আমি লাগাম টেনে রেখে নিজেকে সাধ্যমত সামলে রেখে সত্যিকারের একজন প্রেমিকের মতোই তার প্রতিটা প্রশ্নের এক এক করে উত্তর দিয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হলো।
আমি যা-কিছু তাকে বলেছিলাম, তাতে বারবার বুঝাতে চেষ্টা করেছি, আমার প্রেমের গভীরতা অপরিসীম, অনন্য সাধারণ নিষ্ঠা, সতোর অভাব লেশমাত্র নেই আর আবেগও অপরিমেয়।
আমার মন-ময়ূরী রূপসি তন্বী যুবতি ইউজিনি কিন্তু স্বর্গের দেবীর মতো ঝকঝকে চকচকে দাঁতগুলো আধো বের করে আর আধো ঢেকে রেখে হাসতে হাসতে ছবিটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিল।
ছবিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মধুঝরা কন্ঠে বলল–এটা আপনার কাছেই রেখে দিন। তারপর ঠোঁটের কোণে মনে দোলা-লাগানো হাসির ঝিলিক ফুটিয়ে তুলে বলল–আপনি যা জানতে অত্যুৎসাহী. তার উত্তর ছবিটার পিছন দিকে স্পষ্টভাষায় লেখা রয়েছে।
আমি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার হাত থেকে ফটো নিলাম। কিন্তু অতুগ্র আগ্রহের সঙ্গে ফটোটাকে ঘুরিয়ে তার পিছন দিককার লেখাটা পড়ার চেষ্টা করতে লাগলাম।
আমার অবস্থা দেখে ম্যাডাম বললেন–বৃথা চেষ্টা। অন্ধকারে পড়তে পারবেন না। বাড়িতে গিয়ে আলোর সামনে ভালো করে পড়ে নেবেন।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালাম। আমার আগ্রহ ও কৌতূহলের আধিক্য লক্ষ্য করে ম্যাডামই উদ্ভুত কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গিয়ে বললেন–এখানে কি লেখা আছে জানার জন্য খুবই উকণ্ঠাবোধ করছেন, তাই না?
আমি গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করলাম–হুম।
ম্যাডাম পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনে, মুখে দুষ্টুমিভরা হাসির ছোপ ফুটিয়ে তুলে এবার বললেন–কি লেখা আছে ভেবে বড়ই উতলা হয়ে পড়েছেন, তাই না?
আমি ম্লানমুখে জবাব দিলাম–আপনার কথাটা যে মিথ্যে নয়, তা আর অস্বীকার করবই বা কি করে?
লেখা আছে, আজ রাতে আমার বাড়িতে এক সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।
আমি জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললাম–তাই বুঝি?
হ্যাঁ।
বহু জ্ঞানী-গুণী–সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির আগমন ঘটবে, এই তো?
আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ছবিটার পিছনে এ-কথাই লিখে দিয়েছি।
এবার আমার গোমড়ামুখে সত্যি সত্যি এক অবর্ণনীয় হাসির ঝিলিক খেলে গেল।
পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনেই ম্যাডাম বলে চললেন–আমার বন্ধু সেখানে উপস্থিত থাকবে।
আমি হঠাৎ মিইয়ে গিয়ে বলে উঠলাম–তাদের মাঝখানে আমি… আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ম্যাডাম বলে উঠলেন–আরে ভাই, এমন বিমর্ষ হয়ে পড়ার কি আছে। আপনি যাতে সবার মাঝে অপ্রস্তুত হয়ে না যান, সে চিন্তাও আমি করে রেখেছি।
আমি তার কথার তাৎপর্যটুকু ধরতে না পেরে চোখে-মুখে জিজ্ঞাসার ছাপ এঁকে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সে এবার বলল–সবার সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে আমার একজন পুরনো বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেব। আলাপ-পরিচয় জমে গেলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন না, সময় কি করে কেটে যাচ্ছে। সব শেষে আমার কাছে থেকে যথাসময়ে সংগীতানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রতিশ্রুতি পেয়ে তবেই থামলেন।
আমার ভালোলাগা ম্যাডাম ইউজিনি, হাতে হাত ধরে নিজের বাসস্থলে নিয়ে গেলেন। বাড়িটা সত্যি প্রাসাদোপম। সুবিশাল হলঘরটা অতিথি অভ্যাগতদের সমাগমে গমগম্ করছে। যথাসময়ে সংগীতানুষ্ঠান শুরু হলো। মধুর সংগীত, আনন্দ উচ্ছ্বাস আর হৈ-হুঁল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে সন্ধ্যাটা কাটতে লাগল।
এক সময় আমার মধুমিতা ইউজিনি পিয়ানোর আসনটা ছেড়ে আমার পাশে, একেবারে গা ঘেঁষে বসল। আমি পুলকিত হয়েছিলাম খুবই। কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, যখনই কোনো কথা বলি তখনই কাঁপা কাঁপা স্বর আমার কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে আসে। আমার তখনকার উদ্দেশ্য আর পরিস্থিতিই যে এর কারণ, বুঝতে এতটুকুও অসুবিধা হয়নি।
