না, মিথ্যা রাগ করে ফায়দাও তো কিছু নেই। তার বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ করলেই বা কে আমাকে প্রবোধ বাক্যে সান্ত্বনা দিতে আসবে?
কিন্তু আমি যে খুব বদমেজাজি আর একরোখা চরিত্রের মানুষ। বলতে গেলে এসব গুণ আমার বহুদিনের, রক্তের সঙ্গে মিশে রয়েছে। এসব তো আর কোনোদিনই যাবার নয়।
আমি একবার যা-কিছু করব বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই, তা শেষ করে তবেই আমার স্বস্তি। আর এতকাল তো এর ফল হাতেনাতেই পেয়ে গেছি। এবারও দেখতে চাই পরিণামে কি দাঁড়ায়।
আমি শেষপর্যন্ত সাহসে ভর করে ঝুলেই পড়লাম। এ রকমভাবে আমাদের, মানে ম্যাডাম আর আমার মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়ে গেল।
এবার ভবিষ্যত কর্তব্য স্থির করতে গিয়ে ভাবলাম, এরপর যদি আর পা-বাড়াই, যদি আরও এক ধাপ এগোই, আশা করা যাচ্ছে সহৃদয়া ম্যাডাম ল্যানাড অবশ্যই সেটাকে অশিষ্ট আর অশোভন জ্ঞান করবে না। আমি অন্তত এটাই বিশ্বাস করছি।
আর ম্যাডামের বাড়ির ঠিকানাটা জেনে যাওয়ার পর থেকে আমি গোপন স্থান থেকে খুবই সন্তর্পণে তার গতিবিধির ওপর নজর রাখতে আরম্ভ করলাম।
আমি দেখতে পেলাম, আমার স্বপ্নের রানি প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির সামনের পার্কটায় বেড়াতে যায়। দীর্ঘসময় ধরে পার্কের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত মনের আনন্দে হাঁটাচলা করে। অবশ্য একজননিগ্রো পরিচারক সর্বদা সঙ্গে সঙ্গে থাকে।
আমি মনে মনে পরিকল্পনা করে ফেললাম, গাছপালার ফাঁকে, সন্ধ্যার হালকা আলোর মনোরম পরিবেশে তার সানিধ্য লাভের মাধ্যমে মন-প্রাণ পুলকানন্দে কানায় কানায় ভরিয়ে তুলব।
আর আমি একরম পরিকল্পনাও করে ফেললাম, এমন হাবভাব করে তার সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করব, যাতে মনে হয় আমাদের আলাপ-পরিচয়–ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের।
শেষপর্যন্ত পরিকল্পনা মাফিকই কাজ করলাম। ম্যাডাম ল্যানাড কিন্তু সত্যিকারের প্যারিসবাদীদের মতোই চমৎকার উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিল।
সে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ঝট করে আমার ধান্ধাটা বুঝে ফেলল। ঠোঁটের কোণ দুটোতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলে ছোট্ট-নিটোল দুটো হাত করমর্দনের জন্য আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
ব্যাপারটা নজরে পড়তেই নিগ্রো ভৃত্যটা না-দেখি, না-দেখি করে অন্যদিকে সড়ে পড়ল। ব্যস, আর কোনো সমস্যাই আমাদের রইল না। আর কে ঠেকায় আমাদের। আমাদের উভয়ের বুক-ভরা প্রেমের জোয়ার মুখের ভাষার মধ্যে বেরিয়ে আসতে লাগল। আমরা প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে পড়লাম। এমন ভাবাপ্লুত হয়ে পড়লাম যে, কি। বলব আর কি করব হঠাৎ করে গুছিয়ে ওঠাই উভয়ের ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।
একটা ব্যাপার আমার নজরে পড়ল, আমার মনময়ূরী ম্যাডাম ল্যানাডে ইংরেজিতে কথা বলতে খুবই অ-পটু। চিঠিটা লেখার সময় ভাষায় যে-গতিটুকুও ছিল, কথা বলার ক্ষেত্রে তা-ও দেখা গেল না।
অনন্যোপায় হয়েই আমাদের বাক্যলাপকে ইংরেজি থেকে ফরাসি ভাষায় নিয়ে যেতেই হলো। অতএব ফরাসি ভাষায়ই কথাবার্তা চলতে লাগল।
সত্যি কথা বলতে কি, আমার মুখ দিয়ে অনবরত খই ফুটতে থাকলেও মিষ্টি মধুর বাছা-বাছা প্রেমের শব্দগুলো ঘাটতি পড়েনি। আবার অভাবনীয় আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে পড়লেও বাপটুতায় এতটুকু শৈথিল্য আসতে দেইনি। মোদ্দা কথা, আমার বুকে আগ্রহ-উৎসাহের জোয়ার বয়ে চললেও লাগাম টেনে রেখে, সতর্কতার সঙ্গে দেবী ল্যানাডের সঙ্গে বাক্যালাপ চালিয়ে যেতে লাগলাম। তাই তো বিয়ের প্রসঙ্গটা পাড়তে আমার জিভটা অবাধ্যতা করেনি, আড়ষ্ট হয়ে পড়েনি এতটুকুও।
তবে এও কিন্তু মিথ্যা নয়। আমার কথাবার্তায় অস্বাভাবিক অস্থিরতাটুকু কিন্তু মাডামের নজর এড়ায়নি। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
ম্যাডাম ল্যানাডে কথা প্রসঙ্গে আদিকালের সামাজিক লৌকিকতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করল। সে অন্তরের অন্তঃস্থলে বহু সংখ্যক সুখকে জোর করে দাবিয়ে রেখেছে আর সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাবার পর সেই সুখ যখন আর সুখ থাকে নাই। মিলনের পথ ছেড়ে সে লৌকিকতায় এসে দাঁড়িয়েছে, এই সেই চিরাচরিত সামাজিক রীতিনীতি।
আর এও শুনলাম, আমি নাকি খুবই বোকা-হাঁদার মতো ম্যাডাম ল্যানাডের কথা ইয়ারদোস্তদের কাছে ফলাও করে বলে বেরিয়েছি।
শুধু কি বলা-ই? তার সঙ্গে পরিচিত হতে, সঙ্গ-সুখ লাভ করার জন্য আমি যে প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছি, তা-ও নাকি আর এ-তল্লাটের কারোই অজানা নেই– জানতে পেরে গেছে।
আর এই যে পার্কে আমাদের দেখা হল, কথাবার্তা হলো এটাও কি আর কারো কাছে গোপন থাকবে? অবশ্যই না, সকাল হতে না হতেই কথাটা এ-তল্লাটের সবার মধ্যে চাউর হয়ে যাবে, কানাকানি, ফিসফিসানি শুরু হয়ে যাবে।
ম্যাডাম এ পর্যন্ত বলেই বিশেষ একটা ভঙ্গিতে লাল হয়ে ওঠা মুখটাকে ঘুরিয়ে প্রসঙ্গটাকে সম্পূর্ণ অন্য একটা প্রসঙ্গে নিয়ে চলে গেল। যে প্রসঙ্গে সব মেয়ের মুখই স্বাভাবিকভাবেই রক্তিম হয়ে ওঠে। ম্যাডাম ল্যানাডে একটু বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই আমার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল–কাজটা কি ঠিক হবে বলে আপনি মনে করছেন?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম–কোন কাজ? আপনি কোন কাজের ইঙ্গিত দিচ্ছেন?
বিয়ের কথা, আপনি যে বিয়ের প্রসঙ্গ পাড়তে চাচ্ছেন, তা আমি ধরেই নিয়েছি। সে কথা।
