আমার মন্মোহিনী নির্ভেজাল ফরাসি মহিলার মতোই অন্তরের অন্তরতম কোণের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে, মুক্তির তাড়নায় স্বতস্ফূর্তভাবেই চালিত হয়েছে, বিচলিত হয়েছে প্রকৃতির বেগে। পৃথিবীর প্রচলিত রীতিনীতি তোয়াক্কা করেনি।
আর আমি এও ভালোভাবেই লক্ষ্য করলাম, আমার প্রস্তাবে সে ক্ষুণ্ণ তো হয় ইনি, প্রতিবাদের নামে হুলুস্থুলও বাঁধায়নি। আবার এমন অন্ধকার গহ্বরেও আত্মগোপন করেনি। মোদ্দাকথা, আমি যা আশঙ্কা করেছিলাম, তার আবরণে সে সবকিছুই তার মধ্যে প্রকাশ না পাওয়ায় আমি তাতে সামান্য হলেও অবাকই হয়েছি। এমনকি, আমার চিঠিটাকে প্রত্যাখ্যান–ফিরিয়েও দেয়নি।
আমি অবাক হলাম যখন দেখলাম, সে ক্ষুব্ধ না হয়ে বরং উলটো একটা উত্তর লিখে আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আর তা লিখেছে নিজেরই সুন্দর আর তুলতুলে নরম আঙুলগুলো দিয়েই।
আমার আকাক্ষিত, দেবীমূর্তির লেখা চিঠিটার বক্তব্য এরকম–
মি. সিম্পসন, আপনার দেশের ভাষা আমার ভালো রপ্ত নেই, আর এ অপূর্ব ভাষা আমি লিখতে না পারার জন্য আশা করি মার্জনা করবেন। এই তো সবে, সেদিনই এদেশের মাটিতে প্রথম পা দিলাম। সাহিত্যচর্চা করার সময় সুযোগ যে পাইনি, আশা করি বুঝতেই পারছেন।
মি. সিম্পসন, অশিষ্টতার কারণে প্রথমেই মার্জনা চেয়ে নিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি, যা সত্যি তা বুঝে ফেলেছেন। এর বেশি আর কী-ই বলার থাকতে পারে, বলুন? আমি কি আপনার সঙ্গে বাক্যালাপ করার জন্য অস্থিরতা বোধ করছি না?
ইতি
ইউজিনি ল্যানাড
চিঠিটার প্রতিটা ছত্রেই আমি তার সহৃদয়তার পরিচয় পেলাম। সেটা প্রথমবার পাঠ করেই আমি যে কী মুগ্ধ হয়েছি, তা ভাষার মাধ্যমে কারো মধ্যে ধারণা-সঞ্চার করা সম্ভব নয়, আবার বলেও কাউকে বুঝানো যাবে না।
চিঠিটা একবার মাত্র পাঠকের মনের আকস্মিক আবেগ-উচ্ছ্বাসটুকু সামলাতে না পেরে অন্তত হাজারবার সেটাকে চুম্বন করলাম। কেবলমাত্র এটুকুতেই আমি থামলাম না। তারপরও লাগামছাড়া বাড়াবাড়ি করে ফেললাম। কিন্তু সেটা যে কি ধরনের, এখন আর তা স্মৃতিতে আনতে পারছি না।
ইতিমধ্যে এতকিছু কাণ্ড ঘটে গেল তবু বন্ধু ট্যালবট এখনও বেপাত্তা।
আমি যে অভিন্নহৃদয় ট্যলবটের জন্য কী নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতা বোধ করছি, যন্ত্রণায় ছটফট করছি তার একটা ভগ্নাংশও যদি সে উপলব্ধি করত তবে সে উভ্রান্তের মতো ছুটে না এসে কিছুতেই দূরে থাকতে পারত না। আমার এ প্রত্যয়টুকু অবশ্যই আছে যে, সমবেদনা প্রকাশ করার জন্য তাকে আমার কাছে ছুটে আসতেই হত।
সবচেয়ে বড় কথা, আমার বন্ধুর স্বভাব-চরিত্র তো আর আমার অজানা নয়। কেউ যদি কোনোরকম সমস্যায় পড়ে তবে সে ব্যস্ত হয়ে ছুটে যায়, যে কোন মূল্য দিয়ে তাকে রক্ষা করে।
অথচ আজ অবধি বন্ধু ট্যালবটের ফেরার নামগন্ধও নেই।
আমিনিদারুণ অস্থিরতার মধ্যে অপেক্ষা করে করে শেষপর্যন্ত নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই তাকে একটা চিঠি লিখলাম।
আমি চিঠিটা পাঠাবার পর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। তার জবাবও পেয়ে গেলাম। সে লিখেছে, খুবই জরুরি একটা কাজের ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়ায় ফিরতে দেরি হচ্ছে। সব শেষে এও লিখেছে, আর তেমন দেরি হবে না, শিগগিরই ফিরতে পারবে বলে বিশ্বাস করে।
চিঠিটা শেষ করার ঠিক আগে সে লিখেছে, আমি যেন দ্রুত গাড়ি না চালাই, স্নায়ুবিক উত্তেজনার শিকার না হয়ে পড়ি আর স্নায়ু-শীতল রাখার উপযুক্ত যেসব বই টই বাজারে পাওয়া যায়, সেসব যেন মন দিয়ে পড়ি এবং উপদেশ-টুপদেশ মন দিয়ে পড়ে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করি।
আর মদ্যপানের ব্যাপারে তার উপদেশ হচ্ছে, আমি যেন হগ মদের চেয়ে কড়া মদ স্পর্শও না করি।
আরও আছে, আমি যেন সর্বদা নিজেকে প্রশমিত রাখি। এর জন্য উগ্রদর্শনের সাক্কণা-বাণীই আমার ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগি।
অপদার্থ! আহাম্মক কোথাকার! নিজের ফিরে আসার সমস্যা তো থাকতেই পারে। মানুষ কখন, কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে, তা সব সময় আগেভাগে জানতে পারেন। বন্ধু ট্যালবটের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভালো কথা, সে যদি কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে গিয়ে ফিরে আসতে না-ই পারে তবে অন্তত একটা পরিচয়পত্র লিখেও তো পাঠিয়ে দিতে পারত। নিরেট আহাম্মকই যদি সে না হয়ে থাকে তবে সে নিজেই তো বুদ্ধি খরচ করে অবশ্যই কাজটা করত।
অস্থিরতার কারনে আমি এবার বন্ধুর বাড়ির ঠিকানায় একটা চিঠি লিখলাম। চিঠির মূল বক্তব্য, সে যেন বেশ সুন্দর করে একটা পরিচয়পত্র লিখে আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়।
কিন্তু আমার লেখা চিঠিটা ফিরে আবার আমার হাতেই এসে পড়ল। চিঠিটা যেভাবে পাঠিয়েছিলাম ঠিক সেভাবেই আবার সেটা আমার হাতেই ফিরে এলো।
আমার চিঠিটার সঙ্গে তার ভৃত্যের একটা চিঠিও এলো। সে অশুদ্ধ ভাষায় চিঠিটা লিখেছে। আর বানান ভুলও অজস্র। চিঠির বক্তব্য, আমার বন্ধুবর ট্যালবট এখন কোথায় আছে, সে সম্বন্ধে কিছুই সে জানে না। যাবার সময় ঠিকানাটা রেখে যায়নি; এমনকি পরেও ঠিকানাসহ চিঠি পাঠায়নি।
ট্যালবাটের ভৃত্য খামের গায়ে লেখা ঠিকানাটা দেখেই বুঝতে পেরেছে, আমি এটা পাঠিয়েছি। তাই খামটার মুখ ছিঁড়ে চিঠি পড়ার দরকার নেই মনে করেই সেটাকে সরাসরি ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। পাঠক-পাঠিকা, আশা করি সহজেই অনুমান করতে পারছেন, এ ঘটনার পর বন্ধুবর ট্যালবট যাতে তার প্রিয় ভৃত্যটাকে সঙ্গে করে দ্রুত নরকে গমন করে, সে চিন্তাই মনে মনে দারুণভাবে করেছিলাম।
