বন্ধুবর ট্যালবটের প্রসঙ্গটা এখনকার মতো ধামাচাপা দিয়ে বরং আমার আকস্মিক অসম সাহসিকতার দুঃসাহসিকতা প্রসঙ্গটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
একদিন আমার দীর্ঘ প্রচেষ্টা আর হন্যে হয়ে রূপসি ম্যাডাম ল্যানাডের সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা তো হলো। মানে এক প্রমোদকক্ষে তার দেখা পেলাম। পরস্পরের মধ্যে চাওয়াচাওয়ী–দৃষ্টি বিনিময়ও হলো। ব্যস, আর যাবে কোথায়! সে মুহূর্ত থেকেই ভয়ঙ্কর এক দুশ্চিন্তা আমার মাথায় আশ্রয় নিল।
আমার আকস্মিক দুশ্চিন্তার কারণ কি, জানতে খুবই ইচ্ছা করছে, তাই না? তবে বলেই ফেলছি, শুনুন–
আমার আকাঙ্ক্ষিতা মনময়ূরী রূপসি ম্যাডাম ল্যানাডে প্যারিস শহরের বাসিন্দা। যেখানেই সে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। অচিরেই সেখানে ফিরে যাবার চিন্তাও নাকি করে ফেলেছে। সে তার স্থায়ী বাসস্থলে ফিরে যাবে, এতে আর অবাক হবারই বা কি থাকতে পারে।
কিন্তু আমার সমস্যা যে অন্য জায়গায়। আমি ভাবচি বন্ধু ট্যালবটের কথা। সে ফিরবে পনের দিন পরে, এরই মধ্যে যদি আমি প্যারিসের উদ্দেশ্য পাড়ি জমাই, তবে? তবে তো আমার আশায়, আমার বাড়া-ভাতে ছাই পড়বে! আর কোনোদিনই হয়তো আমার স্বপ্নের রানির সঙ্গে আলাপ পরিচয় করার সুযোগ পাব না।
যাক, হাত গুটিয়েনিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে তো আর আমার চলবে না। ম্যাডাম ল্যানাডের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের করার উদ্যোগ আয়োজন আমাকেই করতে হবে। তাই অনন্যোপায় হয়ে গভীর ভাবনা-চিন্তার পর পরিকল্পনার একটা জুতসই খসড়া তৈরি করে ফেললাম।
আমি প্রমোদ-ভবনটা থেকে ম্যাডামকে সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করে তার বাড়ি পর্যন্ত গেলাম। দূরত্ব বজায় রেখে এবং সাধ্যমত গোপন অন্তরাল দিয়ে যে পথ পাড়ি দিয়েছি, তা বলাই বাহুল্য। যা-ই হোক, তার বসত-বাড়িটা আমি কৌশলে চিনে নিলাম।
সে রাতটা বিশ্রাম করেই কাটালাম। পরদিন কাকডাকা ভোরেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। কাগজ-কলম নিয়ে খস্ খস্ করে ইয়া লম্বা একটা চিঠি লিখে ফেললাম। প্রেমপত্রে সচরাচর ব্যবহার করা এরকম বাছাবাছা শব্দ ব্যবহার করে জ্বালাময়ী একটা প্রেমপত্র লিখে ফেললাম। চিঠিটার মূল্য বক্তব্য, আমার মানসিক পরিস্থিতি প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যক্ত করে তাকে প্রেম নিবেদন করা।
সকালেই প্রেমপত্রটাকে জায়গামত পাঠিয়ে দিলাম। সত্যি বলছি, বুকে যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে খোলাখুলিই চিঠিটা লিখেছিলাম। আর একই রকম সাহসকিতার সঙ্গে এর শব্দগুলোও বেছেছিলাম। তার আবেগ-উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে প্রেমপত্রটা লিখেছিলাম।
আর এও বলে রাখছি, প্রেম নিবেদন করতে গিয়ে আমার কথা কিছুই লুকাইনি। আমার দোষ-ত্রুটি, প্রচণ্ড চারিত্রিক দুর্বলতার কথাও লুকাছাপা করিনি।
আর এও লিখেছি, প্রথম দর্শনের মুহূর্তে তার চারদিকে যে অবর্ণনীয় রোমাঞ্চ ভিড় করেছিল, তার বিবরণও সাধ্যমত প্রাঞ্জল ও প্রাণস্পর্শী ভাষাতেই ব্যক্ত করেছি।
শুধু কি এ-ই? কবির মনপছন্দ বাছাবাছা শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে ব্যক্ত করেছি। তাকে প্রথম দর্শনের মুহূর্তে এক ঝলক চাহনির মাধ্যমে যে চার চোখের মধুর মিলন ঘটেছিল, তার মাধুর্যতাও যেন বাদ না পড়ে, সেদিক সতর্ক দৃষ্টি রেখেছি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লেখনির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে কসুর করিনি এতটুকুও।
আরও আছে, বুকে সাহস সঞ্চয় করে, ভাগ্য ঠুকে খোলাখুলিভাবেই বলেছি আমার প্রথম দর্শনেই প্রেমসাগরে হাবুডাবু খাওয়ার কথা।
সবশেষে লিখতে ভুললাম না, আমার ধৃষ্টতা দেখে ম্যাডামের অন্তরে যেন ক্রোধের সঞ্চার না ঘটে আর তিনি যেননিজগুণে আমাকে মার্জনা করে দেন।
আর? লিখেছি প্রেমের আগুনে প্রতিনিয়ত এমনই খাক হচ্ছি, যার ফলে আমি চিঠি না লিখি পারলাম না।
আর এও আমাকে লিখতেই হয়েছে শুনেছি, ম্যাডাম নাকি এ-শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার আগে কি তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের মাধ্যমে আমার অশান্ত মনকে শান্ত করার সুযোগ পাবই না?
চিঠিটার একদম শেষের দিকে আমার হঠাৎ-ই যেন মাথায় এসে গেল। আমার আর্থিক সঙ্গতির কথাও তাকে জানিয়ে দিতে ছাড়লাম না। আমি কোনো দিক থেকেই কারো হাতের ফাঁক দিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো পাত্র নই। আর অগাধ ধন-সম্পত্তির মালিকও বটে।
মন-প্রাণ তো ম্যাডাম ল্যানাডেকে সঁপে দিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছি। এখন শুধু প্রতীক্ষায় আছি, তিনি যদি আমাকে হাতে ধরে কাছে টেনে নেন। আমার বুকের জ্বলন্ত আগুনে শান্তি-বারি সিঞ্চন করে শীতল করেন।
চিঠিটা তো যথাস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের অশান্ত মনকে যৎকিঞ্চিৎ হলেও শান্ত করা সম্ভব হলো বটে।
এবার শুরু হলো কেবলই প্রতীক্ষা–প্রতীক্ষার দুর্বিষহ যন্ত্রণায় দগ্ধে মরা।
আমার চিঠি লেখা বৃথা গেল না। উত্তর এলো। যেন দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে অধীর প্রতীক্ষার পর আমার চিঠিটার উত্তর পেলাম।
হ্যাঁ, আমার চিঠির জবাব সত্যি এল। ব্যাপারটা রীতিমত রোমান্টিকতায় ভরপুর, আশা করি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এরকম উক্তি কেন করছি? রূপ সৌন্দর্যের আঁকর, স্বর্গের অপ্সরা আর আমার অন্তরতমা ধনবতী ম্যাডাম ল্যানাডের কাছ থেকে আমার ধৃষ্টতাপূর্ণ চিঠির জবাব পাওয়ায় আমার মন-প্রাণ এক অনাবিল আনন্দের জোয়ারে ভেসে উথাল-পাথাল করতে লাগল।
সত্যি স্বীকার না করলে সে রূপসি তন্বীর প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে অবিচার করা হবে বলেই আমার বিশ্বাস। তার রূপ যেমন মনোলোভা তেমনি তার মনটাও ফুলের মতোই পবিত্র–স্বচ্ছ। কেউ যদি তার পবিত্র-সুন্দর মনটাকে মরিচিকা বলে বর্ননা করে, আর কেউ না হোক, আমি অন্তত তীব্র প্রতিবাদ করবই করব।
