কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এ মুহূর্তে ব্যাপারটা সম্বন্ধে তো কিছু করারও দেখছি না।
বিষিয়ে ওটা মনটাকে কোনোরকমে সামলে সুমলে নিয়ে গম্ভীরমুখে পথ চলতে লাগলাম।
বন্ধুবর ট্যালবট বেইমানি করলেও আমার পক্ষে কিন্তু স্বর্গের অপ্সরা ম্যাডাম লানাডকে এত সহজে মন থেকে মুছে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়–কিছুতেই নয়। বরং ফল দাঁড়াল অদ্ভুত চেনা অচেনা কাউ দেখলেই ম্যাডাম-এর ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম।
জানতে পারলাম, তার নামটা অনেকেই শুনেছে বটে, কিন্তু খুব কম লোকেরই তাকে চোখের সামনে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কারণ, মাত্র কসপ্তাহ আগে সে শহরে এসে বসবাস করছে। এরই মধ্যে তার রূপের প্রশংসা লোকের, বিশেষ করে যুবকদের মুখে-মুখে ঘুওে বেড়াতে শুরু করেছে। ইদানিং ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে, চার-পাঁচটা যুবক একত্রিত হলেই ম্যাডাম ল্যানাডেই তাদের একমাত্র আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু মাত্র জনা কয়েকই তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, আলাপ পরিচয় করতে পেরেছেন। আর এ জনা কয়েক আমার পরিচিত তো নয়ই তাদের নামও কোনোদিন শুনেছি বলে মনে হচ্ছে না। অতএব তাদের খুঁজে বের করে আমার প্রাণপ্রতিমার খোঁজ পাওয়া সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
শেষপর্যন্ত হতাশায় জর্জরিত হয়ে বিকেলে তিনজন প্রাণের দোস্তের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছি, এমন সময় উপায়টা হাতের মুঠোর মধ্যে চলে এলো।
বন্ধুদের মধ্যে থেকে একজন হঠাৎ বলে উঠল–ওই, ওই যে, তোর দেবী ম্যাডাম ল্যানাড যাচ্ছে। ওই যে, ওই দেখ।
পাশ থেকে আর একজন সবিস্ময়ে বলে উঠল–আরে বাবা! আশ্চর্য রূপের জৌরুস! সত্যি স্বর্গের অপ্সরা যেন মর্ত্যভূমিতে নেমে এসেছে! আর হা করে তার দিকে তাকিয়ে থেকেই অধিকতর বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠল–অপ্সরা-টপ্সরা কিনা বলতে পারব না। অপ্সরা না হলেওনির্ঘাৎ আকাশ থেকে এক পরী নেমে এসেছে।
আর তৃতীয়জন চোখ দুটো কপালে তুলে নিৰ্ণিমেষ চোখে তার দিকে তাকিয়েই রইল। হাসিহাসি মুখ করা ছাড়া একটা শব্দও সে মুখ দিয়ে বের করতে পারল না
আমি এক ঝটকায় ঘাড় ঘুরিয়ে সে দিকে তাকালাম। দেখলাম, খোলা একটা গাড়ি আমাদের দিকে আসছে। খুবই ধীরগতিতে হলেও সেটা প্রায় আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। আমি অপলক চোখে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম, চমৎকার ভঙ্গিতে খোলা গাড়িটা আমার দেবী, আমার প্রাণপ্রতিমা ম্যাডাম ল্যানাড বসে। আপন মনে বলে উঠলাম, গত সন্ধ্যায় এ-চোখ ধাঁধানো রূপরাশিই তো আমার চোখে চমক লাগিয়ে দিয়েছিল। আর এরই দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে, এরই সৌন্দর্য সুধা আকণ্ঠ পান করেই পুলকানন্দে ডুবেছিলাম।
আরও দেখলাম, আমার দেবী মূর্তির পাশে বসে রয়েছে অল্পবয়সী সে মেয়েটো, যে বক্সে তার পাশে বসেই গীতিনাট্য দেখায় মেতে ছিল।
আমি পাশে বসে থাকা মেয়েটার মুখের ওপর চোখ দুটো বুলিয়ে নিয়ে নিঃসন্দেহ বন্ধু তিনজনের মধ্য থেকে একজন শেষমেশ বলল, এও কম সুন্দরী নয়। এরা এত রূপ পেল কোত্থেকে! এসে দেখছি, মেয়ে দুজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, কে কাকে টেক্কা দেবে। যার দিকেই তাকাই, চোখ রীতিমত ট্যারা হয়ে যায়!
কোনো উপায়ই হাতের কাছে পেলাম না। ট্যালবট ফিরে আসা অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায়ই দেখছি না। সে ফিরে এলে তার দৌলতে যদি ভাগ্য খোলে, এটুকুই এখন আমার একমাত্র আশা ভরসা।
পথের হদিস না পেলেও আমি কিন্তু হতাশ হয়ে নিশ্চন্তভাবে বসে থাকলাম না। বরং বলা চলে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো তাকে হাতের নাগারে মধ্যে পাওয়ার মওকা খুঁজতে লাগলাম।
আমি কর্তব্য সম্পাদনে সামান্যতম ত্রুটি রাখলাম না। আনন্দ ফুর্তির যতগুলো সম্ভাব্য জায়গা শহরময় ছড়িয়ে রয়েছে, এক এক করে সবগুলোতে ঢু মারতে লেগে গেলাম। আমি নিজে অন্তত নিঃসন্দেহ, আমার নিষ্ঠার এতটুকু অভাব নেই।
হন্যে হয়ে তার খোঁজে ছুটোছুটি করার ফল একদিন সত্যি সত্যি পেয়ে গেলাম। আমি হাতে-নাতে প্রমাণ পেয়ে গেলাম, কোনো কাজে নিষ্ঠা ও পরিশ্রম সহাবস্থান কররে তার ফল একদিন-না-একদিন পাওয়া যাবেই। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হলো না। আমি সত্যি সত্যি একদিন আমার দেবীর দেখা পেয়ে গেলাম। তবে দিন পনেরো নিরবচ্ছিন্ন ও নিরলস চেষ্টা চালাবার পর।
আমার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। রূপসি তন্বী ম্যাডাম ল্যানাডের দেখা পেয়ে গেলাম। মুখোমুখিই দেখা হলো আমাদের।
দৃষ্টি বিনিময়ের ফলে আমার মধ্যে এমন এক অব্যক্ত রোমাঞ্চভাব হঠাৎ জেগে উঠল যে, আমি যেন সম্বিৎ হারিয়ে ফেললাম। আর এও খুবই সত্য, সে মুহূর্তে আমি কেন যে মূৰ্ছা যাইনি, নিজেকে কোনোরকমে সামাল নিতে পেরেছিলাম, তা আমার নিজের কাছেই যারপরনাই বিস্ময়ের ব্যাপার।
আর এও সত্য যে, এই দীর্ঘ পনেরটা দিন আমি ট্যালবটের খোঁজ-খবর নিতেও এতটুকু ত্রুটি রাখিনি।
আমি বন্ধুবর ট্যালবটের বাড়ি গিয়ে তার পরিচারকটার কাছে তার খোঁজ নিয়েছি। তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি, বন্ধুর নতুন কোনো খবর এসেছে কিনা। বলা তো যায়, হঠাৎ কোনো-না-কোনো বিশেষ জরুরি কাজের তাগিদে সে পূর্বনির্ধারিত সময়েই বাড়ি ফিরে আসতেও পারে। এরকম প্রত্যাশা বুকে নিয়ে আমি প্রতিদিন অন্তত একবার করে তার বাড়িতে হানা দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়েই ফিরে আসতে হয়েছে।
