শেষপর্যন্ত আমাকে হতাশই হতে হলো। ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। অনন্যোপায় হয়ে বাড়ির পথই আমাকে ধরতে হলো।
পথ চলতে চলতে বিষণ্ণ মনে নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্যে পরবর্তী কর্তব্য সম্বন্ধে ভাবতে ভাবতে মনস্থ করে ফেললাম, আগামীকালই ট্যালবটের সাহায্যে রূপসি তন্বী ম্যাডাম ল্যানাডের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করব। ব্যস, তারপরই তার সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করব। না, নিদারুণ অস্থিরতার শিকার হয়ে আর কিছু ভাবতে পারলাম না। ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম বাড়ির পথে।
নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্যে আমার বিদ্রি রাত কাটল।
সকালটাওনিদারুণ অস্বস্তির মধ্যেই কাটাতে হলো। সে যে কী ছটফটানি, তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। আমার কাছে সময় যেন বোঝা হয়ে দাঁড়াল। একটা মিনিট যেন এক-একটা ঘণ্টা মনে হতে লাগল। সে দিনই জীবনে প্রথম অনুভব করলাম, অসহিষ্ণুতা কী ভয়ঙ্কর সমস্যা।
নিদারুণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দুপুর পর্যন্ত কোনোরকমে কাটিয়ে দিলাম। শেষপর্যন্ত দুপুর একটায় সে বাঞ্ছিত মুহূর্তটা এগিয়ে এলো। শামুকের মতোই ধীর গতিতে সময় কেটে তবেই বাঞ্ছিত মুহূর্তটায় পৌঁছতে পারলাম। জীবন থাকলে যন্ত্রণাও কম-বেশি থাকবেই। আবার সব যন্ত্রণারই এক সময় না এক সময় শেষ হয়ই। আমার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি। আমার যন্ত্রণা বলতে প্রতীক্ষা-যন্ত্রণা নিদারুণ অস্থিরতার যন্ত্রণা। আমার যন্ত্রণারও এক সময় অবসান ঘটল। দেওয়াল ঘড়িটার ওপর চোখ বুলিয়ে দেখলাম, একটা বাজে।
মুহূর্তের মধ্যেই ঢং করে একটা ধ্বনি হলো। ঘণ্টা-ধ্বনিটা ঘরময় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। প্রতিধ্বনিটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই আমি ভিরের মধ্যে ঢুকে গেলাম।
হাতের কাছেই ট্যালবটের এক ভৃত্যকে পেয়ে গেলাম। তার কাছে আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ট্যালবটের খোঁজ করলাম।
সে বলল সাহেব তো একটু আগেই বেরিয়ে গেছেন। আমি বিষণ্ণ মুখে বললাম–বেরিয়ে গেছে! হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার কারণ?
তা তো বলতে পারব না। কর্তার ব্যাপার স্যাপার আমরা, ভৃত্যরা জানব কী করে, বলুন?
সে কখন ফিরবে, বলে গেছে কিছু?
না, তেমন কিছুই বলে যাননি।
ব্যাপারটা আমার কাছে বিশেষ সুবিধার মনে হলো না। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে ভেবে নিয়ে বেশ একটু গম্ভীর স্বরেই বললাম–অসম্ভব! এটা হতেই পারে না। ট্যালবট কিছুতেই বেরিয়ে যেতে পারে না–বেরিয়ে সে যায়নি। কিন্তু ব্যাপারটা কি, আমি জানতে চাই।
হঠাৎ ঘাবড়ে গিয়ে মুখ কাচুমাচু করে ভৃত্যটা জবাব দিল কর্তা, এর মধ্যে আবার ব্যাপার স্যাপারের প্রশ্ন ওঠে কি করে, মাথায় যাচ্ছে না তো! বিশ্বাস করুন, ব্যাপার কিছুই নয়।
কিন্তু–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে বলে উঠল–সকালে কোনরকমে জলখাবার খেয়েই তিনি ঘোড়ায় চেপে চলে গেছেন। সত্যি কথা বলছি, আমাকে ডেকে বলে গেলেন, এস এস-এর কাছে যাচ্ছি। কেন যে যাচ্ছেন তা কি আমাকে বলে যাবেন, নাকি আমার জিজ্ঞেস করা উচিত, আপনিই বলুন?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার শুকনো গলায় বললাম–কবে ফিরবে, কিছু বলে গেছে। কী?
হ্যাঁ, তা অবশ্য বলে গেছেন!
কবে?
বলে গেছেন, দিন সাতেক শহরের বাইরে কাটিয়ে তবে ফিরবেন।
রাগে-দুঃখে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাঁপতে লাগল। সাতদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার মতো ম্যাডামের সঙ্গে আলাপ পরিচয়ের এমন অপূর্ব সুযোগ হাতের মুঠোয় পেয়েও মুহূর্তে এমন করে ভেস্তে গেল! হতচ্ছাড়া ট্যলবটটা আর বেড়াতে যাওয়ার সময় পেল না! শেষপর্যন্ত বেছে বেছে এ সময়টাকেই উপযুক্ত জ্ঞান করল! আমার আশা-আকাঙ্ক্ষায় ছাই পড়ায় রাগে আমার মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল।
মোক্ষম একটা জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হলাম। কিন্তু পারলাম না। অবাধ্য জিভটা বেইমানী করল।
কোনোরকমে মনের ক্ষোভ মনেই চেপে রেখে ট্যালবটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
পথ চলতে চলতে একটা কথাই আমার মাথায় বার বার চক্কর মারতে লাগল, কিভাবে ট্যালবটের চৌদ্দ-পুরুষকে নরকের দক্ষিণ দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া যায়। হতচ্ছাড়াটা এমন করে আমার এমন একটা মোক্ষম সুযোগ, এমন জবরদূস একটা পরিকল্পনা, হেলায় ভাসিয়ে দিল যার ফলে আমার মন থেকে জমাটবাধা ক্ষোভটুকুকে কিছুতেই ঝেড়ে মুছে ফেলতে পারছিলাম না। রূপসি তন্বী যুবতির মুখটার কথা মনে পড়তেই আমি যেন আরও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলাম।
দীর্ঘ ভাবনা-চিন্তার পর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম। আমার গীতিনাট্যের পোকা বন্ধু ট্যালবট রঙ্গমঞ্চের মন-মাতানো দৃশ্য দেখতে দেখতেই আমার সঙ্গে কথা বলেছিল, আমাকে কথা দিয়েছিল, আমার প্রাণ-প্রতিমা রূপসি ম্যাডামের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দেবে। কথা দেওয়ার সময় তার মন-প্রাণ রঙ্গমঞ্চের মন মাতানো দৃশ্যের মধ্যেই ডুবেছিল। পরমুহূর্তেই রঙ্গমঞ্চের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে মেরে দেয়। ব্যস, সে অন্যজগতের বাসিন্দা হয়ে পড়ল। তারপর বাড়ি ফিরেও হয়তো গীতিনাট্যটার সাফল্য ও ব্যর্থতার কথা ভাবতে বসেছে। অতএব আমাকে দেওয়া সামান্য প্রতিশ্রুতিটার কথা মন থেকে মুছে যাওয়াই স্বাভাবিক।
তবে এটাও মিথ্যে নয়, কথা দিয়ে ট্যালবট অনায়াসেই কথার খেলাপ করতে বড়ই ওস্তাদ। আসলে কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর মুহূর্তেই সেটা ভুলে যাওয়া তার বহুদিনেরই অভ্যাস–স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই আমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্বাভাবিক কারণেই তার মন থেকে মুছে গেছে।
