রূপসি লাবণ্যময়ী অকস্মাৎ রক্তিম হয়ে উঠল। তার কান অবধি রক্তাভ হয়ে পড়ল। গাল দুটোর রক্তিম ছোপ আরও অনেক, অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
আমি অপলক চোখে তাকিয়েই রইলাম। লক্ষ্য করলাম, খুবই সতর্কতার সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে চারদিক ভালোভাবে দেখে নিল।
আমি তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বসে রইলাম। তাকে পুলকিতই মনে হলো। আমার দুঃসাহসিক কাজটা যে কারোই নজরে পড়েনি, সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হয়ে সে পাশের ভদ্রলোকের গায়ে প্রায় হেলান দিয়ে বসল–স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
আমার ভেতরে তখন যে কী অসহনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হলো তা আর কহতব্য নয়। একটু আগে যে অবর্ণনীয় অশোভন আচরণই কেবল নয়, অসঙ্গত আচরণ করেছি সে অপরাধ-জ্বালায় দগ্ধ হতে লাগলাম। ধরেই নিলাম, এবারই কেলেঙ্কারি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। ব্যাপারটা চাউর হলো বলে। আর মুহূর্তের মধ্যেই হল-ভর্তি লোকের সামনে আমাকে মান-সম্মান খোয়াতে হবে। মান-ইজ্জত কিছুই আর থাকবে না।
ব্যস, কাল সকাল হলেই পিস্তল হাতে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামতে হবে। কী কেলেঙ্কারীই করে বসেছি।
পিস্তল আর দ্বন্দ্বযুদ্ধের আতঙ্কটা আমার মগজে অনবরত চক্কর মারতে লাগল।
আমি যেন হাঁট ছেড়ে বাঁচলাম। সত্যি কথা বলতে কি, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ালেও বুঝি মানুষ এতটা স্বস্তি পায় না। যখন দেখলাম, ম্যাডাম ল্যানাডে তার পাশে বসে থাকা লোকটার হাতে গীতিনাট্যটার অনুষ্ঠানসূচিটা গুঁজে দিল, তখন আমার বুকের জমাট-বাঁধা আতঙ্কটা কেটে গেল–খুবই আশ্বস্ত হলাম।
আর? সে আর একটা কথাও ভদ্রলোকটাকে বলল না। যাক, এ যাত্রায় তবে অব্যাহতি পেয়ে গেলাম।
কিন্তু এর পরের ঘটনা শুনলে আপনারা অন্তত কিছুটা হলেও বুঝে নিতে পারবেন, আমার সে মুহূর্তের গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাওয়া বিষয়বোধ, আমার যারপরনাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া হাল আর আমার মনের প্রলাপ বকার মতো উৎকণ্ঠা, কি পরিমাণে আমাকে কাহিল করে দিয়েছিল।
রূপসি তন্বী ম্যাডাম ল্যানাড পাশের ভদ্রলোকের হাতে গীতিনাট্যের অনুষ্ঠান সূচীটা গুঁজে দিয়ে ঝট করে চারদিকে চোখের মণি দুটোকে বুলিয়ে নিল। নিশ্চিন্ত হল, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। না, তার ধারে-কাছে কেউ নেই, তার দিকে কেউ গোপনে নজরও রাখছে না।
ব্যস, এবার সে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে অত্যুজ্জ্বল চোখের মণি দুটোকে ফিরিয়ে আমার মুখের ওপর স্থির নিবদ্ধ করল। তারপর ছোট্ট করে হেসে, দু-দুবার খুবই
স্পষ্টভাবে ঘাড় নেড়ে আমার সে দুঃসাহসিক কাজে সম্মতি দিয়ে দিল।
আমার বুকের ভেতরে উল্লাসের জোয়ার বয়ে চলল। বল্গাহীন আনন্দে আমি যে আত্মহারা হয়ে পড়িনি, দুহাত দুলে ধেই-ধেই করে নাচানাচিতে মেতে যাইনি সেটা আমার কাছেই অদ্ভুত কাণ্ড বোধ হচ্ছিল।
আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমার মনটা সে মুহূর্তে ময়ূরের মতো নাচন-কোদন শুরু করেছিল। মাত্রাতিরিক্ত আনন্দে মানুষ নাকি উন্মাদ দশাপ্রাপ্ত হয়ে পড়ে। সে মুহূর্তে আমার হালও ঠিক তাই হলো। আমি প্রেমে পড়ে গেছি–পাগল বনে গেছি।
আমার তো এরকমই মনে হল–এটাই আমার জীবনের প্রথম প্রেম। একেই তো স্বর্গীয় প্রেম আখ্যা দেওয়া হয়–সত্যি অভাবনীয় আর বর্ণনাতীতও বটে।
প্রথম দর্শনে প্রেম কথাটা অনেকের মুখেই শুনেছিলাম বটে। এখন নিজেকে দিয়ে তা মর্মে-মর্মে উপলব্ধি করছি! কথায় বলে, প্রেম জীবনে দুবার আসে না।
তার দিক থেকে সে সম্মতি পেয়েছি, এতে আর সন্দেহের তিলমাত্রও অবকাশও নেই–থাকার কথাও নয়। প্রেমের বদলে প্রেম-ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা জানাবার এটাই তো রীতি।
হ্যাঁ, কাজ হয়েছে, আমার দেবী ম্যাডাম ল্যানাডেও আমারই মতো প্রেম-সাগরে খাবি খাচ্ছে। আমার প্রেমে সে মাতোয়ারা হয়ে পড়েছে, সন্দেহ নেই। সে যদি আমার প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত না-ই হয় তবে হলভর্তি লোকের সামনে এমন বে পরোয়াভাবে আমার ইঙ্গিতে সাড়া দিত? অবশ্যই না। সে কিছুতেই আমার মতো লোক-নিন্দার ভয়কে অগ্রাহ্য করে মাথা হেলিয়ে সায় দিতে উৎসাহি হত না।
হাজারো টুকরো-টুকরো আজেবাজে চিন্তা আমার মাথায় ভিড় জমাল। নিদারুণ অস্থিরতার শিকার হয়ে আমি যেন খাবি খেয়ে চলেছি। ঠিক তখনই রঙ্গমঞ্চের পর্দা পড়ে গেল। যবনিকা পতন হলো।
দর্শকদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। সবাইনিজনিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কে, কার আগে প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বাইরে বেরোবে, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গেল আর সে সঙ্গে এমন হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। যেন প্রেক্ষাগৃহের দেওয়ালগুলো ভেঙে যাওয়ার যোগাড় হলো।
আমি মুহূর্তের জন্য বন্ধুদের ট্যালবটের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, আমার দিকে তার নজর নেই। ব্যস, চুপিচুপি তার সান্নিধ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আমার আকাঙ্ক্ষিতা মনময়ূরী ম্যাডাম ল্যানাডের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা চালাতে লাগলাম।
সে মুহূর্তে তার যতটা কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়া যায়। আর কিছু না হোক একটিবার কাছ থেকে তার স্বর্গীয় রূপ সৌন্দর্য চাক্ষুষ করে চোখ আর মনকে তৃপ্ত করা।
কিন্তু হায়! এ কী কঠিন গেরো বাঁধল রে বাবা! দলে দলে কাতারে কাতারে মানুষ সঙ্কীর্ণ স্থানটুকুতে এমন গুঁতোগুতি জুড়ে দিয়েছে, যার ফলে জনস্রোতের বিপরীত দিকে দু-চার পা এগিয়ে যাওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। ম্যাডাম ল্যানাডের স্পর্শসুখ লাভ করা তো দূরের ব্যাপার, তার পোশাকের একটা কোণাও স্পর্শ করতে পারলাম না।
