তবে এও সত্য যে, সমাজের রীতিনীতি ভাঙার ঔদ্ধত্য সে পেল কি করে?
সমাজের একেবারে ওপর তলার মানুষের মধ্যে এরকম কোনোকিছুর পরিচয় যদি থেকে থাকে তবে অন্য কথা–আমার অন্তত জানা নেই।
ব্যাপারটা আমার নজর এড়ালো না, দূরবীণের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আমার দেহ দেখে নিয়ে তৃপ্ত হয়ে, সে চোখ থেকে যন্ত্রটা নামিয়ে নিল।
কিন্তু সে আর কতক্ষণের জন্যই বা? কয়েক মুহূর্ত পরেই সে আবার কি ভেবে দূরবীণটা চোখে লাগিয়ে আমার দেহ সৌষ্ঠব দেখতে লাগল। এবার আর দু-এক মিনিট নয়–দীর্ঘসময় ধরেই সে রূপসি ললনা দূরবীণটা চোখে লাগিয়েই রাখল।
আমেরিকার রঙ্গালয়ে কোনো রূপসি তন্বী যুবতি যদি কোনো সুন্দরকান্তি পুরুষের দিকে দূরবীণের মাধ্যমে দীর্ঘসময় ধরে তাকিয়েই থাকে তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে চঞ্চল্য জাগবে, কোনো সন্দেহই নেই।
আমেরিকায় এসব ব্যাপার-স্যাপার নিতান্তই অস্বাভাবিক জ্ঞান করা হয়। তাই আমার মন-ময়ূরীর কাণ্ডটা দেখে দর্শকদের মধ্যে চাঞ্চল্য লক্ষিত হলো। আর সে সঙ্গে গুণাগুণানিও অবশ্য শুরু হলো।
আমি রূপসির দিকে তাকালাম। তাকে এতটুকুও বিলিত মনে হলো না। কোনোরকম অপ্রতিভ-অপ্রস্তুত হয়েছে বলেও ভাবতে পারলাম না। আগের মতোই শান্ত-সুন্দর-স্বাভাবিক দেখলাম তাকে।
ম্যাডামের ভাব দেখে মনে হল, তার অন্তরের অন্তঃস্থলে জমে ওঠা কৌতূহল ইতিমধ্যেই নিবৃত্ত হয়ে গেছে। হয়তো বা এজন্য সে চোখের সামনে থেকে দূরবীণটা নামিয়ে আবার জায়গামত চালান করে দিল। এবার আবার রঙ্গমঞ্চের নাট্যানুষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি ফেরাল।
আমিও নিতান্ত অসভ্যের মতোই তার মাথার পিছন দিকটার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম। সত্যি আমি যেন কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে বসেছি। কিন্তু হায়! আমার আকাক্ষিত দেবীর মুখটাকে আর দেখতে পাচ্ছি না। মন-প্রাণ আবারও বিষিয়ে উঠল।
আর আমি এও লক্ষ্য করলাম, আমার দেবী–সৌন্দর্যের আধার মেয়েটা মঞ্চের দিকে ফিরে রয়েছে বটে, কিন্তু আড়চোখে আমার অসভ্যতার দিকে সর্বক্ষণ নজর রেখে চলেছে। আমি কি করছি, চোখের কোণ দিয়ে সে সাধ্যমত দেখছে।
স্বর্গের অপ্সরাতুল্য সুন্দরী কোনো মেয়ে যদি কোনো পুরুষের দিকে আড়চোখে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাকায় তবে অন্য পাঁচটা লোক যেমন বেহাল হয়ে পড়ে, আমারও ঠিক তেমনই হয়ে গিয়েছিল।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ওই মিনিট কয়েকের মধ্যেই আমি এমন বিহ্বল হয়ে পড়লাম যে নিজেকেই হারিয়ে বসলাম।
আমি একেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠার আগুনে জ্বলে-পুড়ে খাক হচ্ছিলাম, তারপর এমন ডাগর-ডাগর চোখে লুকিয়ে-চুরিয়ে তাকানো–অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার।
এ সময়টুকুর মধ্যে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ল। সত্যি আমি আর আমার মধ্যে রইলাম না।
আমার একান্ত আকক্ষিত ম্যাডাম ন্যালাডের পাশে এক ভদ্রলোক মঞ্চের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রয়েছেন ম্যাডাম তার কাঁধে ছোট্ট করে একটা টোকা দিয়ে নিজের দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। প্রায় তার কানের কাছে মুখ নিয়ে কি যেন বলল। উভয়ের মধ্যে কথাবার্তা হলো অনেকক্ষণ ধরে। তারা কি বলাবলি করছে, দূর থেকে। শুনতে না পেলেও প্রসঙ্গ যে আমি বুঝতে অসুবিধা হলো না।
আমার দেবীমূর্তি কথা শেষ করে আবার মঞ্চের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে রইল। আমার ফুসফুস নিঙড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
তার ব্যাপার-স্যাপার দেখে মনে হলো বেশ কয়েক মিনিট ধরে তার চোখ ও মনকে মঞ্চের দৃশ্যই পুরো আকৃষ্ট করে রাখল।
একটু পরেই আবার একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্ত ঘটল।
আমার আকাঙ্ক্ষিতা ম্যাডাম আবার আমার দিকে প্রথমে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, পরমুহূর্তেই সরাসরি আমার দিকে ফিরে বসল।
আর পকেট থেকে দূরবীণটা বের করে আগের মতোই সেটার মুখ আমার দিকে ফিরিয়ে চোখের সামনে ধরল। আমার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সে কিন্তু প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের গুণগুণা নিতে মোটে এতটুকুও দ্বিধাগ্রস্ত হলো না।
আমি সে মুখে লক্ষ্য করলাম, গভীর প্রশান্তি আর অভাবনীয় সংযমটুকু দিব্যি ধরে রেখেছে।
সত্যি বলছি, তার মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ভাবভঙ্গি দেখে আমি যারপরনাই অবাকই হলাম–একটু আগে ঠিক যেমনটা হয়েছিলাম।
আমার মধ্যে একটু-একটু করে উত্তেজনার সঞ্চার হতে হতে যেন এক সময় প্রবল উত্তেজনায় জরাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। এমনটা না হলেই বরং অবাক হতে হত। কারন, স্বর্গের দেবীর মতো রূপ-লাবণ্য যার সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, তার কাছ থেকে এমন অভাবনীয় সাড়া পেয়ে আমি বাস্তবিকই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লাম। সত্যি তো আমি যা প্রত্যাশা করতে পারিনি তা না চাইতেই পেয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হবার মতো ব্যাপারই তো বটে।
রূপসি তন্বী ম্যাডাম ল্যাসাড়ে বারবার আমার দিকে তাকানোর ফলে বিস্ময়কর সাড়া পাওয়ায় আমি দমে তো গেলামই না বরং বুকের আগুন যেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। আমার বুকে প্রেমের জোয়ার বয়ে যেতে লাগল।
বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়লাম।
হায়! এ কী বেহাল অবস্থা হলো আমার! অদূরে অবস্থানরত রূপসি ম্যাডাম ছাড়া আর সবকিছু যেন আমার চোখের সামনে থেকে নিঃশেষে মিলিয়ে গেল।
আমি তক্কে তক্কে ছিলাম। প্রেক্ষাগৃহের সবাই যখন মঞ্চের জমাট অভিনয় দেখতে মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছে তখন সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে আমার এতটুকুও ভুল-চুক হলো না। আমি টান হয়ে বসে পড়লাম। রূপসির চোখে চোখ রাখলাম। মুচকি হেসে, আলতো করে ঘাড় কাৎ করে দুম করে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বসলাম। কিন্তু কিভাবে আমি উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ করলাম, তা অনুসন্ধিৎসু নজরে লক্ষ্য না করলে, উপলব্ধি করাই সম্ভব নয়। আর কোনোক্রমে একবার লক্ষ্য করলে তার অর্থ বুঝতে পারবে না, এমন লোকের সংখ্যা খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না।
