সমস্ত মন-প্রাণ, আগেও অবশ্য আমি উপলব্ধি করেছিলাম আমার প্রাণ-প্রেয়সী রূপের বিচারে বাস্তবিকই অনন্যা। এখন নিমেষহীন নয়নে তার সম্পূর্ণ মুখটা চাক্ষুষ করে সে সত্যতার প্রমাণ পেলাম।
বন্ধুবর ট্যালবটের মুখ থেকে শোনার আগেই মনে-প্রাণে জেনে গিয়েছিলাম, তার মতো রূপ-সৌন্দর্যের আঁকর এ-তল্লাটের শুধু নয়, সারা শহরে দ্বিতীয় আর একজন নেই, পৃথিবীতেও মিলবে কি না সন্দেহ যথেষ্টই রয়েছে।
তবুও অন্তরের গোপন বন্দরে কী যেন একটা অব্যাখ্যাত ব্যাপার বারবার ঘুরপাক খেতে লাগল।
দীর্ঘসময় ধরে রূপসির মুখাবয়টা অনুসন্ধিৎসু নয়নে নিরীক্ষণ করে, আপন মনে চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম, মুখের বিষণ্ণতার ছাপটুকু, অভাবনীয় গাম্ভীর্যটুকু, আর ক্লান্তির চিহ্নটুকু হয়তো বা মুখমণ্ডলের উদ্ভিন্ন যৌবনোচিত লাবণ্যকে কম-বেশি ম্লান করে দিয়েছে। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, তার অনস্বীকার্য সত্যটা আমার মনকে
অনবরত কাঁটার মতো বিদ্ধ করতে লাগল। অসহ্য!
পরমুহূর্তেই তার স্মিতহাস্য, কোমলতা নমনীয়তা, সম্রাজ্ঞাসুলভ গাম্ভীর্য আর আবরণ আমাকে উদ্দীপিত করতে লাগল। আমার মন-প্রাণকে বিমুগ্ধ আর রোমাঞ্চে কানায় কানায় ভরিয়ে তুলতে লাগল। আর আমার আগ্রহ-উদ্দীপনা যে উত্তরোত্তর কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে লাগল, ভাষায় ব্যক্ত করা সাধ্যাতীত।
আমি সে অফুরন্ত উৎসাহ নিয়ে রূপ সৌন্দর্য-সুধা পান করে চলেছি, তা আমার মন-ময়ূরী আমার নিষ্পলক চোখ দুটোর দিকে বার কয়েক তাকিয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে পড়ল। ব্যাপারটা বুঝতে পারায় তার মধ্যে মুহূর্তের জন্য কম্পনের সৃষ্টিও হলো।
সে কেবলমাত্র একবারই নয়, আড়চোখে বারবার আমার দিকে তাকিয়ে আমার কাণ্ডকারখানার দিকে নজর রাখতেও ভুলল না।
আমার পিপাসা, আমার আগ্রহ আর উদ্দীপনা তখন চরমে উঠে গেছে। অতএব সে কি ভাবছে, আমার সম্বন্ধে তার মনে কোন ভাবনায় উদয় হয়েছে আর ব্রাপারটা আমার অনুকূল, নাকি প্রতিকূলতার দিকে ধেয়ে চলেছে, সে সব নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় বা মানসিকতা কোনোটাই আমার ছিল না।
আচমকা, একেবারে, হঠাৎ-ই মুখটা পাশের দিকে ফিরিয়ে নিল আমার ভালো লাগার রূপসি তম্বী যুবতিটা।
আমার কপাল ফেটে গেল। এমন রূপের সৌন্দর্য দেখে চোখ ও মনকে তৃপ্ত করার সুযোগ থেকে আমি নির্মমভাবে বঞ্চিত হলাম। ফলে তার মাথার পিছন দিককার খোদাই করা অংশটুকুই আবার আমি দেখতে লাগলাম।
কয়েক মুহূর্ত পরেই রূপসি মেয়েটা আবার ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। বোধহয় পরীক্ষা করে দেখে নিল, আমি আগের মতোই তার দিকে অপলক চোখে, লালসা-মাখানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছি কি না।
আমি একটু বিচলিত হলেও দুচোখের তারায় গভীর উৎসাহ নিয়ে তখনও তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
আমার নির্লজ্জ ভাবটুকু চাক্ষুষ করা মাত্র সে এক ঝটকায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। চকিতে তার শুভ্র সুন্দর গাল দুটো যে রক্তাভ হয়ে উঠল। মনে হলো মুহূর্তে তার শরীরের সবটুকু রক্ত গাল দুটোতে আশ্রয় নিয়েছে। ডাগর ডাগর চোখ দুটো চাঞ্চল্যের ছাপটুকুও আমার নজর এড়াল না। সব মিলিয়ে মনে পুলকের সঞ্চারই ঘটল।
কিন্তু পরবর্তী অভাবনীয় কাণ্ডটা দেখে আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। মনে করতে পারেন হঠাৎ, একেবারে হঠাৎ-ই আমার বিস্ময় তুঙ্গে উঠে গেল।
সত্যি বলছি, সে যখন ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল তখনও আমি এতটা অবাক হইনি।
আমার এ-আকস্মিক বিস্ময়ের কারণ কি, তাই না? হ্যাঁ, কারণ তো অবশ্যই আছে। কারণ না থাকলে তো কার্য সম্ভব নয়। কারণটা তবে বলেই ফেলি–আমি তখনই বিস্ময়ের ঘোরে ডুবে গেলাম যখন দেখলাম, আমার ভালো-লাগা মেয়েটা হেঁচকা টানে কোটের পকেট থেকে একটা দূরবীণ বের করে হঠাৎ সেটাকে চোখে ধরে আমার দিকে তার মুখটা তুলে ধরল।
চাকা ঘুরিয়ে ফোকাস ঠিক করে নিল। তারপর সেটাকে আমার মুখের ওপর স্থির নিবদ্ধ রেখেনিবিড়ভাবে তাকিয়ে রইল। দু-এক মুহূর্ত মাত্র নয়, বেশ কয়েক মিনিট ধরেই দূরবীণের মুখটাকে আমার মুখের ওপর একই রকমভাবে স্থির রাখল।
এবার কিন্তু আর লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা নয়। আমার মন-ময়ূরী ডাবল আই-গ্লাসের মাধ্যমে খোলাখুলিভাবে আমাকে দেখে চলেছে। ইস! সে মুহূর্তে আমার বুকের ভেতরে যে কী অব্যক্ত খুশির জোয়ার বয়ে যেতে লাগল, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
আমার বুকের ভেতর উথাল-পাথাল হতে থাকলেও অবাকও হয়েছিলাম যথেষ্টই। আমার পায়ের কাছে, একেবারে হাতের নাগালের মধ্যে বজ্রপাত হলেও আমি এমন বিস্ময়ের সমুদ্রে পড়ে অসহায়ভাবে হাবুডুবু খেতাম না।
কি ভাবছেন, আমি নিতান্ত প্রত্যাশিত ব্যাপারটায় ক্ষুব্ধ হয়েছি? রাগে আমার শরীর জ্বলে যাচ্ছিল? মোটেই না। বরং ভাবতে পারেন, আমার মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়াই ঘটে চলছিল। আরে না-না, ক্ষোভ বা বিরক্তির তো প্রশ্নই উঠতে পারে না।
সত্যি বলছি, আমার একেবারে মনের কথা–অন্য কোনো মেয়ে যদি এভাবে দূরবীণের ভিতর দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত, অবশ্যই ক্ষোভে ফেটে পড়ার যোগাড় হতাম। হয়তো চোখ কটমট করে বলেই ফেলতাম–এটা হচ্ছে কি, শুনি? এটা কোন দেশি ভদ্রতা। কিন্তু তা আর আমার পক্ষে বলা হয়ে উঠল না। কারণ, এমন এক অনন্যাকে এ-কথা বলা কি করে সম্ভব? আমার পক্ষে তো নয়ই। কিন্তু তার কাণ্ডটা যে বুক-কাঁপানো, এতে কোনো সন্দেহই নেই।
