আমার মধ্যে এমন অভাবনীয় আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ কি? কারণ খুবই স্বাভাবিক। আমি যে এতক্ষণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম, ঘুমের ঘোরে স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করছিলাম সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে এবার আমি জাগ্রত চেতনায় ফিরে আসার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমি নিজেকে সামলে সুমলে বুকে সাহস সঞ্চয় করে নিলাম। এবার সাহসে ভর করে ধীরপায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
সামনের দিকে দু-তিন পা এগোতে না এগোতেই আমার গলা দিয়ে বুক ফাটা আর্তস্বর বেরিয়ে এলো। আমার বিকট আর্তনাদে চারদিক কেঁপে ওঠার জোগাড় হল। হাত দুটো পিঠ দিয়ে চোখ দুটোকে কচলে নিলাম আবার! আবার আগেকার মতো
বুকের ধুককুড়ানি শুরু হয়ে গেল। নখ দিয়ে নিজের শরীরেই সাধ্যমত বল প্রয়োগ করে। চিমটি কাটলাম। কাঁপা কাঁপা পায়ে কোনোরকমে আরও কয়েক পা এগিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কুল কুল শব্দ কানে ভেসে আসতে লাগল। নিচু হয়ে, বার বার এদিক-ওদিক হেলে নিঃসন্দেহ হলাম, কুল কুল ধ্বনিটার উৎস আর কিছু নয়, পর্বতের গা-বেয়ে নেমে-আসা একটা ঝর্ণা।
আমি গুটি গুটি হেঁটে ঝর্ণাটার একেবারে গা-ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়ালাম, কোমর বাঁকিয়ে ঝর্ণাটার ওপর ঝুঁকে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে হাত ভরে ঠাণ্ডা পানি তুলে তুলে চোখ-মুখে, কানে ও কপালে দিতে লাগলাম।
ঠাণ্ডা পানির ছোঁয়া পেয়ে আমার শরীর কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে পেল। মনের ঘোরও ক্রমে কেটে যেতে লাগল। অচিরেই আমার দেহ-মনের অস্বস্তি কেটে যাওয়ায় আমি একজন সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বনে গেলাম। আমি উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। না, আমার মধ্যে আর তিলমাত্র দ্বিধাও অবশিষ্ট নেই। আমি যেন সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষ।
এবার আমার আবার নতুন করে হাঁটা শুরু করার পালা। অজানা অচেনা পথে, ধীর-স্থির-শান্ত পদক্ষেপে আমি আবার চলতে শুরু করলাম। আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই। এ হাঁটার যেন আর বিরাম নেই, শেষ নেই।
আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। পা দুটো যেন বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইছে। নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই আমি পথের ধারের একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়লাম।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাছের পাতার ছায়া পড়ল সবুজ ঘাসের ওপরে। আমি অপলক চোখে টুকরো টুকরো ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছায়ার আকৃতি আমার মধ্যে বিস্ময়ের সঞ্চার করল। মনের দ্বিধা কাটাতে গিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে ওপরের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, যা অনুমান করেছিলাম ঠিক তা-ই। আমি একটা তালগাছের তলায় বসে।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুতগতিতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বসে আরাম আয়েশ করে নষ্ট করার মতো যতেষ্ট সময় আমার হাতে নেই। স্বপ্ন দেখার মতো সময় তো অবশ্যই নেই। আমি লক্ষ্য করলাম, দেখলাম, বুঝতেও পারলাম স্পষ্টই। আমার ইন্দ্রিয়গুলো এখনও আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি, বরং বশেই আছে। আর সেগুলোই আমার সামনে, অন্তরের অন্তঃস্থলের সম্পূর্ণ নতুন একটা অনুভূতির জগতের দরজা খুলে দিল।
অনেকক্ষণ পর নিজের সম্বন্ধে ভাববার মতো অবকাশ ও মানসিক অবস্থা ফিরে পেলাম। একেবারে মুহূর্তের মধ্যেই যেন গরমটা অসহ্য বোধ হতে লাগল। এতক্ষণ গরম বা ঠাণ্ডা কোনো কিছুই অনুভব করিনি।
মন চাঙা-করা সুগন্ধ বাতাস বাহিত হয়ে আমার নাকে এসে লাগতে লাগল। আর বর্ষার ভরা নদীর শান্ত স্রোতের মতো চাপা একটা কুল কুল ধ্বনি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। আর তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে অগণিত মানুষের গুণগুণানি। এ যেন এক সম্পূর্ণ নতুনতর অনুভূতি।
আমি যখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে সে গুণগুনানি শুনছি ঠিক সে সময়েই সেখান থেকে দমকা একটা বাতাসের যাদুকাঠি ছুটে এসে যেন ঘন কুয়াশার আস্তরণটাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। চারিদিক একেবারে স্বচ্ছ। কুয়াশা বা অন্ধকারের লেশমাত্রও নেই।
আমি যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। অনুসন্ধিৎসু নজরে চারদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, আমি যেন সুউচ্চ পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে সামনের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ওপর চোখের মণি দুটো বুলিয়ে চলেছি। আর প্রান্তরটার বুক চিড়ে আকাবাঁকা পথে হেলে দুলে বয়ে চলেছে বিশাল একটা নদী। আর নদীটার গা-ঘেঁষে অবস্থান করছে প্রাচ্য ধরনের একটা নগর। আমার আরব্য উপন্যাসের পাতায় যেরকম নগরের বিবরণ দেখতে পাই, ঠিক সে-রকম কোনো নগর অবশ্যই নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের।
আমি তখন শহরটা থেকে বেশ দূরে এবং অনেকটা উঁচুতে অবস্থান করছিলাম। তাই শহরটার বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট ও বাগান প্রভৃতি সবকিছুকে পটে আঁকা ছবির মতোই আমার মনে হতে লাগল।
শহরটার অসংখ্য রাস্তাগুলো বেশ চওড়া। তবে সদর রাস্তার তুলনায় ছোট-বড় ও আঁকাবাঁকা গলির সংখ্যাই বেশি।
আর পথে পথে মানুষ যেন একেবারে গিজগিজ করছে, অনবরত মানুষের মিছিল চলেছে।
পথের ধারে সারিবদ্ধভাবে একের পর এক বাড়ি মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর তাদের বারান্দা, গাড়ি-বারান্দা, আকাশচুম্বি মিনার আর মনলোভা কারুকার্যমণ্ডিত জানালাগুলো যে কোনো সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষের বিস্ময় উৎপাদন করতে বাধ্য।
শহরটার এখানে-ওখানে বাজার তো রয়েছেই, আর সুসজ্জিত দোকানপটেরও অভাব নেই। দোকানগুলোতে কতরকম জিনিসপত্র যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তার । ইয়ত্তা নেই। দোকানে দোকানে দেখা যাচ্ছে কাঁচের আলমারিতে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পান্না, হীরা, মণি, মুক্তার অলঙ্কারাদি। কোনোটিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বহুমূল্য মসলিন আর রেশমিবস্তু আবার কোনোটিতে বা শোভা পাচ্ছে চকচকে ঝকঝকে ছুরি-কাঁচি ও অন্যান্য ও অত্যাবশ্যক অস্ত্রপাতি। আরও কত কী যে দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না।
