বেশ কিছুটা সময় বিষণ্ণ মনে, মুখ গোমড়া করে কাটাবার পর মনস্থির করলাম, বন্ধুকে আমার সমস্যা,নিদারুণ অস্থিরতা বলে কোনো মতলব পাওয়া যায় কি না দেখা যাক। গোড়ার দিকে আমার অসহায় অবস্থার কথা তার কাছে ব্যক্ত করতে পারলাম না। বরং চেষ্টা করে নিজেকে সামলে-সুমলে রেখে, স্বাভাবিক কণ্ঠেই তাকে বললাম–
বন্ধু ট্যালবট, একটা অনুরোধ করব, রাখবে?
সে মঞ্চের হুর,পরী, নর্তকীদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বলল–কী! কীসের কথা বলছ?
তোমার অপেরা গ্লাসটা আমাকে মিনিট কয়েকের জন্য ধার দেবে? সে সচকিত হয়ে আমার দিকে মুখ ফেরাল। কপালের চামড়ায় পর পর কয়েকটা ভাজ এঁকে বলল–অপেরা গ্লাস!
হ্যাঁ, তোমার অপেরা গ্লাসটা আমাকে ধার দাও।
কিন্তু ও বস্তু আমি কোথায় পাব যে, তোমাকে দেব? আরে ধ্যুৎ! ওসব আমার কাছে নেই। কথাটা বিরক্তিভরে আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়েই আবার চটপট মঞ্চের দিকে তাকাল।
আমি কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নই। মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়ে টিকতে না পেরে আমি তার কাঁধে মৃদু চাপ দিতেই ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে সে অধিকতর অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করল।
আমি তবু দমলাম না। হাতটা তার কাঁধের ওপর রেখেই কাতর মিনতি জানালাম–বন্ধু, আমার কথাটা আগে ধৈর্য ধরে শোন, তারপর আমার অসহায়তার কথা বুঝে শুনে যা ভালো মনে কর, করবে।
সে আগের মতোই অধৈর্য ও বিতৃষ্ণার সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রায় খেঁকিয়ে উঠল– কী? কী বলতে চাচ্ছ, ঝটপট বলে ফেল।
অসহিষ্ণু হয়ো না। শোন, মাথা ঠাণ্ডা করে আমার কথাটা শোন–স্টেজ বক্সটা কী চোখে পড়ছে?
সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকাল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম–আরে, না-না, ওটা নয়, ওটা নয়, ওই যে পাশেরটা। ধ্যুৎ! দেখছ না, ওর চেয়ে রূপসি তষী যুবতিটা কেমন বক্সটা আলো করে বসে রয়েছে!
রূপসি তো অবশ্যই! খুবই সুন্দরী। বাস্তবিকই তার রূপের আভা রীতিমত চোখ দুটোকে ঝলসে দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে।
রূপসি পরিচয়, মানে সে কে, জানো?
তা-ও বলা দরকার?
প্লিজ বন্ধু, তার সম্বন্ধে যদি কিছু জেনেই থাক, আমাকে বল।
ক্যাডাম ল্যানাডে ল্যানাডে। বাস্তবিকই স্বনামধন্যা এক নারী। সম্প্রতিকালে ম্যাডাম ল্যানাডের মতো রূপসি তন্বী যুবতিয় ধারে-কাছে দ্বিতীয় কেউ নেই।
আমি চোখে-মুখে অত্যুগ্র আগ্রহের ছাপ এঁকে তার মুখের কথাগুলো গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম।
বন্ধুবর ট্যালবট পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনে আবার বলতে আরম্ভ করল–আরও আছে সবাই স্বনামধন্যা এ রূপসির রূপ-লাবণ্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অগাধ ধন সম্পত্তির মালিক। তার ওপর বিধবা। মনের মতো বর পাকড়াও করার উদ্দেশ্যে প্যারিস নগরী থেকে সবে এসে এখানে ঘাঁটি গেড়েছে।
তোমার কথা তো দেখা যাচ্ছে, রূপসির সঙ্গে পরিচয় আছে, তাই না?
অবশ্যই! পরিচয় খাতির তো অবশ্যই আছে,
তার হাতটা চেপে ধরে অনুরোধ করে বললাম–ভাই, তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে? প্রথম দর্শনেই আমি কুপোকাৎ–
সে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল–তুমি তার সঙ্গে পরিচয় করতে আগ্রহি?
অবশ্যই! বলো তুমি পরিচয় করিয়ে দেবে কি না?
ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই সে বেশ একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই বলল– এ আর বেশি কথা কী–।
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি সোল্লাসে বলে উঠলাম–তবে তুমি অবশ্যই তার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছ, কী বলে?
অবশ্যই, অবশ্যই! বললামই তো, আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপারই না বন্ধু।
নিশ্চন্ত হলাম!
কবে, কখন পরিচয় করতে চাচ্ছ, বলো?
কাল–কালই!
ভালো কথা, তাই হবে। কাল কখন?
দুপুরে! দুপুর একটায় অসুবিধা হবে?
কিছুমাত্রও না। এবার বলো কাল দুপুরে তোমার সঙ্গে কোথায় আমার দেখা হবে?
কোথায়? আমি ঠিক একটায় বি-তে তোমার সঙ্গে দেখা করব।
সে আমার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল–ঠিক আছে, তা-ই হবে।
তবে পাকা-কথা হয়ে গেল, কী বলে?
হ্যাঁ, একেবারে পাকা-কথা। এবার আর একটা কথাও না বলে লক্ষী ছেলের মতো মুখে কলুপ এঁটে বসে থাক।
আমি আশ্বস্ত হয়ে বললাম ঠিক আছে। এই আমি মুখে কলুপ এঁটে দিলাম। আর তোমাকে বিরক্ত করব না। তুমি নিশ্চিন্তে নাটক দেখ।
আমি বন্ধু ট্যালবটকে কথা দিলাম বটে, আর টু-শব্দটিও করব না। কিন্তু আমি যে নিদারুণ অস্থিরতার শিকার হয়ে পড়েছি। রূপসি তন্বী যুবতিটা আমার মন-প্রাণ জুড়ে নিয়েছে। তার রূপের পোকা যে আমার মাথার ভেতরে নিবচ্ছিন্নভাবে কিলবিল করেই চলেছে। আমাকে মুখ বন্ধ করে স্বস্তিতে থাকতে দেবে কেন? অস্থিরতার শিকার হয়ে আর বার-কয়েক তাকে এটা-ওটা জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না।
কিন্তু তার দিক থেকে কোনো জবাব না পেয়ে নিজেকে সামলে-সুমলে নিতেই হলো। সে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিল না। কেবলমাত্র হা-হুঁ অস্ফুট শব্দ উচ্চারণ করে বিরক্তি প্রকাশ করল।
বন্ধুবর অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত মঞ্চের দিকে মন-প্রাণ সঁপে তন্ময় হয়ে বসে রইল। আর আমি? নিদারুণ অস্থিরতার শিকার হয়ে অনবরত ছটফট করতে লাগলাম। আমার নাটক দেখা অনেক আগেই শিকেয় উঠে গেছে।
যখন বন্ধু ট্যালবটের দিক থেকে আমার অসংখ্য প্রশ্নের একটারও জবাব পেলাম
তখন অনন্যোপায় হয়েই তার দিক থেকে চোখ ও মন তুলে নিয়ে সে রূপসি ললনা ম্যাডাম ল্যানাডের ওপর স্থাপন করলাম। দীর্ঘসময় নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর, এক সময় আমার ভাগ্য খুলে গেল। তার মুখের সামনের দিকটাও স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। সত্যিকারের রূপসি। অসাধারণ লাবণ্যময়ী।
