আমার কিন্তু তখনও সে অপরূপার মুখবয়ব দেখার সৌভাগ্য হয়নি। না দেখেই আমি এমন অবিশ্বাস্য রকম বেহাল হয়ে পড়েছি। মর্মান্তিক অবস্থায় পড়ে হাবুডুবু খেয়ে চলেছি, বলাই ভালো।
আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে এরকম ভাবনার উদয় যে হয়নি, তাও নয়। সে মুখে চমৎকৃত হওয়ার মতো সৌন্দর্য যদি না চাক্ষুষ করি। তবুও আমি প্রথম দর্শনে মনের গভীরে জেগে ওঠা প্রেমে আমি যে হাবুডুবু খাচ্ছি তাতে তিলমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
প্রেম! প্রেমের যাদুকরি শক্তি অভাবনীয়। সে যে কোনো প্রতিকূল শক্তি অগ্রাহ্য করে উদ্ভ্রান্তের মতো ভালো-লাগা পাত্রীর কাছে ছুটে যায়। লোক বলে বটে, মহাশক্তি দিয়ে ইচ্ছা অনিচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু সে মুহূর্তে আমি এ-সত্যতা কিছুমাত্র উপলব্ধি করতে পারলাম না। কি করেই বা পারব? আমি যে নিজস্ব যাবতীয় সত্তাকে নিঃশেষে হারিয়ে ফেলেছি। এ পরিস্থিতিতে কী করে যে লাগাম টেনে ধরে মন-প্রাণকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব তা আমার জানা নেই। আমি যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছি।
রূপসি ললনা। রূপ-সৌন্দর্যের আঁকর, উদ্ভিন্ন যৌবনা, মন-প্রেয়সী অনন্যা সৌন্দর্য-সুধা আমি যেন নিজের অজান্তেই পান করে চললাম।
আমি যখন প্রেমের মদিরা আকণ্ঠ পান করে নেশায় বিভোর হয়ে রয়েছি ঠিক তখনই রঙ্গালয়ে হঠাৎ-ই হে-হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। চারদিক থেকেচিল্লচিল্লি শুরু হয়ে গেল।
হৈ-হট্টগোল কানে যেতেই আমি যেন আচমকা আত্মস্থসম্বিৎ ফিরে পেলাম।
প্রেমের দেবতা যেন মুহূর্তে আমার প্রতি সদয় হলেন। আমার ভালো-লাগা সে রূপসি লালনা হৈ-হট্টগোল শুনে ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধারণা নেওয়ার জন্য আচমকা মুখ ফেরাল।
ব্যস, আমি তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো মেলে তার দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম, তার সম্পূর্ণ মুখাবয়ব বহু আখাঙ্ক্ষিত মুখাবয়ব।
উফ! ই! কী যে রূপের আঁকরের আগল মুহূর্তে আমার চোখের সামনে হাট হয়ে খুলে গেল; কোন্ শব্দের ব্যবহারে তার বর্ণনা দেব, ভেবে পাচ্ছি না। আর তা কি করেই বা দেব? আমার সবকিছু যে কেমন গোলমাল–অত্যাশ্চর্যভাবে এলোমেলো। হয়ে গেল।
আমি এতক্ষণ সে রূপ-সৌন্দর্যের আঁকরের ভাবনায় আত্মমগ্ন ছিলাম। এ-মুখ যে তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি সুন্দও, বর্ণনার অতীত।
তবু সে মুখাবয়বে এমনকিছু একটার উপস্থিতি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল যা আমাকে হতাশ, হ্যাঁ, হতাশই করে দিল। কোন অদৃশ্য হাত যেন আচমকা আমার বুকের ভেতরে দুম্ করে হাতুড়ির আঘাত হেনে বসল। কিন্তু সেটা যে কী? আমার মন-প্রাণ মুহূর্তে কেন এমন বিষিয়ে উঠল তা আমি বলতে পারব না। আমার পক্ষে বর্ননা করা সম্ভব নয়–কিছুতেই নয়।
বিষিয়ে আর হতাশ শব্দ দুটো ব্যবহার করলাম সত্য। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে এ-শব্দ দুটো আদৌ যথার্থ নয়।
আমার ভেতরের উথলে ওঠা ভাবাবেগ চোখের পলকে থিতিয়ে কোন গভীরে চলে গেল। বলতে পারব না। মুহূর্তেই এক অবর্ণনীয় প্রশান্তিতে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল কানায় কানায় ভরে উঠল। আমার যাবতীয় সত্তাকে মোহমুগ্ধ, আবিষ্ট করে রেখে দিল। মনে হলো আমি যেন এখানে নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোনো লোকে অবস্থান করছি।
তার মুখাবয়বের সঙ্গে একমাত্র ম্যাডোনার মুখের সঙ্গেই তুলনা চলতে পারে। সে মুখ ঘিরে গিন্নিসূলভ গাম্ভীর্যই আমার অন্তরের আলোড়নকে যেন মুহূর্তের মধ্যেই উচ্ছ্বাসহীন করে তুলল। তা সত্ত্বেও আমি বলব, একমাত্র এজন্যই আমার মনের প্রশান্তি ঘটতে পারেনি।
আমি স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম, কোনো-না-কোনো রহস্য এর পিছনে কাজ করে চলেছে।
সে রূপসির মুখাবয়বে আমি এমনকিছু একটা প্রত্যক্ষ করেছিলাম, যা আমাকে সামান্য বিচলিত করল বটে, কিন্তু আমার আগ্রহ-উৎসাহকে চরমে পৌঁছে দিয়েছিল। এরকম পরিস্থিতিতে চরম কিছু করে ফেলার প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আমার মধ্যেও প্রবণতা তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল, অস্বীকার করব না।
আমার মনময়ূরী রূপসি তম্বী যুবতি যদি বক্সে একা থাকত, তবে আমি এক লাফে তার কাছে হাজির হতাম। হাজার বাধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করে তার রূপ-লাবণ্য, তার সঙ্গ-সুখ প্রাণভরে উপভোগ করতাম।
না, তার সঙ্গলাভ সম্ভব হয়নি। কারণ, তাকে সঙ্গদান করছিল এক ভদ্রলোক আর রূপসি মহিলা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি করলাম, আমার ভালো-লাগা রূপসি তম্বীর চেয়ে তার বয়স একটু বেশিই হবে। আর রূপ-লাবণ্যের দিক থেকেও কিছু না কিছু পিছিয়েই রয়েছে।
অস্থিরচিত্ত আমি মুহূর্তের মধ্যেই মাথায় হাজার খানেক মতলব এঁটে ফেললাম। আমার প্রথম কাজ হবে, একটু বেশি বয়স্কা মেয়েটার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করা। কিন্তু কিভাবে আমার মতলবটাকে বাস্তববায়িত করা সম্ভব? তা যদি না-ও হয়, তবে কিভাবে আমার স্বর্গের অপ্সরাকে আরও কাছে, আরও স্পষ্টভাবে দেখে মন আর চোখ দুটোকে এর চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি হলেও তৃপ্ত করতে পারব?
হঠাৎ মাথায় এলো, নিজের বক্সটা ছেড়ে রূপসির বক্সের কাছাকাছি একটা বক্সে চলে গেলেও কিছুটা অন্তত সুবিধা হত। কিন্তু সে উপায় ছিল না। কারণ, প্রেক্ষাগৃহে তিল ধারণের জায়গাটুকুও যে খালি ছিল না।
তারপরই যে চিন্তা মাথায় এলো, সামাজিক রীতিনীতি, সে গুড়েও বালি দিয়েছে রেখেছে। দূরবীণের কথা বলতে চাচ্ছি। যন্ত্রটা চোখে লাগানো মাত্র আইনের পৃষ্ঠপোষকরা অতর্কিতে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পিঠের চামড়া গুটিয়ে ফেলবে, সন্দেহ নেই। তাই যন্ত্রটা সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও সেটা আমার পকেটে ছিলও না তাই মুষড়ে পড়ে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না।
