আচমকা মঞ্চে নাটকের নায়িকার দিকে যেই দৃষ্টি ফেরাতে যাচ্ছি, ঠিক সে মুহূর্তেই একটা মূর্তি আমার দৃষ্টিকে চুম্বকের মতো আটকে ফেলল।
বেশ কয়েকটা প্রাইভেট বক্সে সে মূর্তিটাকে অদ্ভুত মনোলোভা ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! এতক্ষণ এমন একটা রূপের আকর আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। আমার তো অন্তত এমনটা হবার কথা নয়!
বলতে লজ্জা নেই, যদি হাজার বছরও পৃথিবীতে টিকে থাকি, অপরূপা দৃষ্টিনন্দন মূর্তিটাকে এক মুহূর্তের জন্যও মন থেকে মুছে ফেলতে পারব না। যার দিকে তীব্র আবেগ-উচ্ছ্বাসে আমি অপলক চোখে তাকিয়ে ছিলাম।
রূপের আভায় চোখ ঝলসে দেয়ার ক্ষমতা রাখে এমন এক অনন্যা নারী-মূর্তি জীবনে আর কোনোদিনই দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
সে মুহূর্তে আমার একটা কথাই বারবার মনে হয়েছিল, স্বর্গের অপ্সরাদের তৈরির রূপ অবশিষ্ট সৌন্দর্যটুকু নিয়ে এসে স্টুঝি নারী-মূর্তিটার গায়ে লেপে দেওয়া হয়েছিল। নইলে একটামাত্র দেহে এত রূপ-সৌন্দর্য এসে ভিড় করল কোথা থেকে?
চমৎকার! অপূর্ব! অনন্যা! মনোলোভা সে নারী-মূর্তির মুখটা তখন মঞ্চের দিকে ফেরানো ছিল। তাই মুখটা পুরোপুরি দেখা সম্ভব হলো না।
রূপসি তন্বী যুবতির অনন্য দেহসৌষ্ঠবের মধ্যে একটা যাদু ছিল, সন্দেহ নেই। নারীর সৌন্দর্যের এ-যাদুশক্তি চিরদিনই আমাকে এক অভাবনীয় শক্তিতে আকর্ষণ করেছে। এ ক্ষমতা যেন ডাইনীদের ক্ষমতা। একে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বা। মানসিকতা কোনোটাই আমার নেই।
কিন্তু সে সন্ধ্যায়, নাট্যশালার ভিড়ে মধ্যে যা দেখলাম, তাকে আমার স্বপ্নের, আমার কল্পনার মোহিনী মূর্তি যেন সাক্ষাৎ মূর্তিমতি হয়ে আমার চোখ, আমার মন প্রাণ জুড়ে বসে রয়েছে।
কিন্তু হায়! সে যে বক্সের মধ্যে বসে। তাই তো তার সম্পূর্ণ অবয়ব আমার দৃষ্টিগোচর হলো না, হবার কথাও নয়। কিন্তু এমন অত্যাশ্চর্য-অদ্ভুত কৌশলে বক্সটা তৈরি করা হয়েছে যে, তার পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত কোনোকিছুই আমার দৃষ্টিগোচর না হওয়ার মতো ছিল না।
আমার সে অপরূপার উচ্চতা ছিল মাঝারি। অনবদ্য তার দেহসৌষ্ঠব। সুস্পষ্ট দেহরেখা। উন্নত বক্ষদ্বয় সমুন্নত মনোলোভা, মাথার পিছনের দিকটাই কেবলমাত্র নজরে আসছিল, তা-ও একটা বড় ভগ্নাংশই ছিল টুপির আড়ালে। হায়! গ্রীক পুরাণে বর্ণিত সাইকিং, যার মাথার গড়ন, টুপি দিয়ে তার সৌন্দর্য আর কতটুকুই বা ঢেকে ঢুকে রাখা সম্ভব? বরং মাথার শোভাকে আরও অনেকাংশেই বাড়িয়ে দিয়েছে।
রূপসির ডানবাহুটা চমৎকারভাবে বক্সের রেলিংয়ের ওপর দিয়ে পাতার মতো ঝুলছে। আমার শরীরের সব কয়টা স্নায়ু একই সঙ্গে ঝনঝা নিয়ে উঠল। শিরা উপশিরায় রক্তের গতি গেল বেড়ে। আমার সর্বাঙ্গ বারবার শিউরে শিউরে উঠতে লাগল।
আর তার বাহুর ওপরের দিকটা সম্প্রতিকালের ফ্যাশন অনুযায়ী, ঢিলেঢালা বস্ত্রে আচ্ছাদিত। হাতার বস্ত্রখণ্ডটা কনুইয়ের সামান্যনিচু অবধি নেমে এসেছে। মিহি বস্ত্রখণ্ডে তৈরি অন্তর্বাসটা উঁকি-ঝুঁকি মেরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মহামূল্য হীরার আঙটি টা আঙুলে আবদ্ধ থেকে ঝকমক করছে। আর তার গহনার বিবরণ না ই বা দিলাম। আর তার রুচিবোধ? সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে।
পুরো আঘঘণ্টা! আধঘণ্টার জন্য আমি যেন পুরোপুরি পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল-নিথর হয়ে পড়েছিলাম। পাথরের মতো নিশ্চল অবস্থায় বসে অপলক চোখে সে অপরূপা মূর্তির দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
আধঘণ্টা। হ্যাঁ, সে আধঘণ্টার মধ্যেই আমি মর্মে মর্মে অনুভব করলাম, শরীরের প্রতিটা স্নায়ুর দ্বারা অনুভব করলাম। প্রথম ভালোবাসা কাকে বলে আর তার আকর্ষণ কতই না তীব্র!
বিশ্বাস করুন, জীবনে বহু অপরূপার সান্নিধ্য লাভ করতে আমি সক্ষম হয়েছি– তাদের মুল্লুকের সেরা সুন্দরী আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তা সত্ত্বেও তাদের কেউ কারো রূপের জৌলুসে, লেলিহান আগুনের শিখায় পতঙ্গের মতো জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার মতো আমার সমস্ত সত্তাকে উদভ্রান্ত করে তোলেনি।
আকর্ষণ! নিদারুণ আকর্ষণ! চুম্বক যেমন লোহাকে তীব্রবেগে আকর্ষণ করে, নিজের বুকে টেনে নিতে চায় ঠিক তেমনই তার মায়া-কাজল মাখানো স্বপ্নালু ডাগর ডাগর চোখ দুটো যেন দুর্নিবার আকর্ষণে আমাকে কাছে টানার জন্য বদ্ধপরিকর।
দুটো আত্মাকে যেন অদৃশ্য এক যাদু-ডোরে বেঁধে নিয়েছে। মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে, সে রূপসির আর আমার পবিত্র আত্মা।
তার আর রূপের অভাবনীয় অত্যাশ্চর্য শক্তির কাছে আমার দৃষ্টিশক্তি যেন মুহূর্তে নিজস্বতা হারিয়ে ফেলেছে। আমার পক্ষে চোখ ফেরানোই দায় হয়ে পড়েছে; অন্য কথা–অন্য কোনোকিছু ভাববার ক্ষমতা, অন্য যাবতীয় অনুভূতি অনেক আগেই আমার মধ্য থেকে নিঃশেষে লোপ পেয়ে গেছে।
মানবীরূপে স্বর্গের দেবীতুল্য সে মূর্তি আমার মনের মন্দির জুড়ে অবস্থান করছে।
আমি যেন জেগে নেই, স্বপ্নের ঘোরে অচেতন অবস্থায় কেবলমাত্র এটুকুই। উপলব্ধি করতে লাগলাম, আমি বদ্ধউন্মাদের মতো প্রেম-সাগরের গভীরে ডুবে যাচ্ছি। সেখান থেকে আর কোনোদিনই ফিওে আসা সম্ভব হবে না। তার অবর্ণনীয় মোহ আমার আমার সত্তাকে তো অনেক, অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে। আমি নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে পড়েছি।
