সত্যি কথা বলতে কি, আমার পূর্বসূরীদের নামগুলোতে অদ্ভুত রকমের একটা কাকতালীয় ব্যাপার এসে গেছে। সে কী? ব্যাপারটা হচ্ছে, প্যারিস নগরের মি. ফ্রয়সার্ট ছিলেন আমার বাবা। আমার মা যখন পনেরো বছরের কিশোরী তখন আমার বাবা তাকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসেন।
বিয়ের আগে আমার মায়ের নাম ছিল ক্রয় সার্ট–কুমারী ক্রয় সার্ট। ব্যাঙ্কার ক্ৰয়সার্ট ছিলেন তাঁর বাবা। তিনি ছিলেন তার বড় মেয়ে।
ব্যাংকার ক্রয়সার্ট ষোলো বছরের এক রূপসি কুমারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিল ভিক্টর ভয়সার্ট। তিনিও ছিলেন তার বাবার বড় মেয়ে।
কী অভাবনীয় একেবারেই অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ভেবে দেখুন তো ভাই, মর্সিয়ে ভয় সার্ট যাকে বিয়ে করে ঘর বেঁধে ছিলেন তার নাম ছিল কুমারী ময়সার্ট। এক্ষেত্রে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বয়ষ খুব কমই ছিল। নাবালিকা তো অবশ্যই, খুকিও বলা চলে, তাই না?
আর তার মা? তিনিও মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন। ম্যাডাম ময়সার্ট ছিল তার নাম।
ফরাসি দেশে এরকম কম বয়সে বিয়ের প্রচলন রয়েছে। অন্য সব ঘটনার কথা আলোচনা না-ই বা করলাম। এ ঘঠনাটার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ময়সার্ট, ভয়সার্ট, ক্ৰয়সার্ট আর ফ্ৰয়সার্টরা বংশগতির ধারা বহন করছেন।
আইন, আইনের কচকচানির ফলে আমি সিম্পসন নামটা আমি নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি। নিজের পৈত্রিক নাম পদবী পাল্টে এ নামটা গ্রহণ করতে আমি মোটেই ভেতর থেকে উৎসাহ পাইনি। বরং বলা চলে নতুন নামটা গ্রহণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমার দিক থেকে প্রবল আপত্তিই ছিল।
আমার আপত্তিটা যে একেবারে অমূলক ছিল এমন কথা বলা যায় না। কারণ ঝুটমুট একটা নামধারণ করে উত্তরাধিকারী বনে বিষয় সম্পত্তির মালিকানা লাভ করতে হবে? পিতৃদত্ত নামটা জলাঞ্জলি দিয়ে ধনকুবের বনে যাওয়া? অসম্ভব। এমন সম্পত্তির মুখে হাজার বার ঝাটা মারি।
মনস্থির করেই ফেললাম কিছুতেই নাম বদলাব না। দরকার এমন সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে। সত্যি বলছি, মনের সঙ্গে এমন লড়াইও আমাকে দিনের পর দিন করতে হয়েছে। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি, দম বন্ধ হয়ে আসার যোগাড়।
ধ্যুৎ! আমার ভাগ্য গুণে, ঈশ্বরের করুণা আমি সে বিষয় সম্পত্তি লাভ করেছি তার পরিমাণও তো নিতান্ত কম নয়। সত্যি কথা বলতে কি, তার পরিমাণ খুবই বেশি।
আমার শারীরিক শক্তি সামর্থ্যও নেহাৎ কম নয় শক্ত সমর্থ। পৃথিবীর অন্তত শতকরা নব্বই জন লোক অবশ্যই এক বাক্যে স্বীকার করে নেবে, আমি দেখতে শুনতে রীতিমত সুন্দর। আর মুখশ্রীর তো তুলনাই য় না। উচ্চতাও কম নয়–পাঁচফুট এগারো ইঞ্চি।
আমার মাথার চুল কালো, কোঁকড়ানোও বটে। নাকের গড়ন তাকিয়ে দেখার মতোই বটে। চোখ দুটো ধূসর, আড় ডাগর ডাগর, তবে দুর্বল। দৃষ্টি শক্তির এমন দুর্বলতা আমাকে সর্বদাই বিব্রত করেছে, স্বীকার না করে উপায় নেই। প্রতিকার করার জন্য হরেক রকম ব্যবস্থাও যে করিনি তাও নয়। কিন্তু তেমন কিছু ফয়দা হয়নি। শেষমেশ চশমা পরতেও বাদ দেইনি। তবে এওতো সত্য যে, দেহ-মনে যখন আমার যৌবনের জোয়ার বয়ে চলছিল তখন এসব জিনিস অন্য পাঁচটা যুবকের মতো আমিও বরদাস্ত করতে পারিনি। যৌবনে এসব জিনিস মুখশ্রীকে একেবারেই নষ্ট করে দেয়। মুখটাকে কিম্ভুতকিমারকা করে দেয়। তাই আমি কোনোদিনই এসব বাহ্যিক ব্যবহার্য দ্রব্যাদির ব্যবহার বরদাস্ত করিনি। তাই দুর্বলতা কাটাবার সহায়ক বস্তুগুলো আমাকে বর্জন করতেই হলো।
তা ছাড়া, বকধার্মিকের মতো নাকের ডগায় চশমা চাপালে আসল যে বয়স তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি বলেই মনে হয়। তাই আমার মতে চশমার মতো বাজে জিনিস আর হয় না।
আর আর গ্লাস? এটা প্রকৃতপক্ষে ফুটেয়ে তোলে যাকে এক কথায় বিতিকিচ্ছিরি ছাড়া আর কোন শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাই অবধি এ বস্তু দুটোকে আমি সতর্কতার সঙ্গে বর্জন করে চলেছি।
নিজের চেহারা ছবি আর পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে এত করে ঘ্যানর ঘ্যানর করা বাড়াবাড়িই হয়ে যাচ্ছে, স্বীকার করছি। নিজেকে গুরুত্ব একটু বেশিই দিয়ে দিয়েছি, তাই না?
যাক কে, নিজের কথার ইতি করার আগে শুধুমাত্র এটুকই বলব যে, আমি স্বাভাবের দিক দিয়ে একটু দৃঢ়চেতা, বে-পরোয়া, একনিষ্ঠ আর অত্যুৎসাহীও বটে। আর জীবনভর খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে পঞ্চমুখে মেয়েদের গুণকীর্তন করে এসেছি।
জন্মের মধ্যে কর্ম করেছিলাম, এক সন্ধ্যায় পিউ থিয়েটারে একটা বক্স ভাড়া করে নাটকটাটক দেখেছিলাম। মি. ট্যালবট নামে আমার এক দোস্ত সঙ্গে ছিল। একটা নামকরা গীতিনাট্য মঞ্চে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। নামজাদা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রেক্ষাগৃহে ভিড়ও হয়েছিল গাদাগাদি।
আমার এ বন্ধুবর পাক্কা দুটো ঘণ্টা অপলক দৃষ্টিতে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইল। গান বাজনা তার প্রাণ বললেও অত্যুক্তি হয় না। আর গীতিনাট্য হলে তো কথাই নেই। একটা টিকিটের বিনিময়ে গায়ের জামা খুলে দিতেও দ্বিধা করবে না
আমিও তার পাশে বসে দর্শকদের চেহারা আর পোশাক পরিচ্ছদ দেখেই পুরো দুটো ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। মজা না পাওয়ার তো কথাই নয়। কারণ, সবাই তো। সম্ভ্রান্ত পরিবারের রূপসি মহিলা। তাদের রূপ সৌন্দর্যে চোখ ও মনকে তৃপ্ত করে এক সময় দৃষ্টি ফিরিয়ে মঞ্চের নৃত্যনাট্য দেখতে লাগলাম।
